Saturday, July 18, 2026

রাসুল (সা:) এর রাতের নামায/সালাত

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

৬. রাতের নামায

রসূলুল্লাহ (সঃ) রাতের নামাযে কেরাআত লম্বা এবং ছোট করতেন। কখনও তিনি অনেক লম্বা কেরাআত পড়তেন। আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) বলেন, 'আমি এক রাতে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে নামায পড়েছি। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকায় আমি একটা খারাপ ইচ্ছা পোষণ করি। খারাপ ইচ্ছাটি কি ছিল-এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমি বসে পড়া এবং রসূলুল্লাহর সাথে নামায ত্যাগ করার ইচ্ছা করি।(বোখারী, মুসলিম)

হোযাইফা বিন ইয়ামান বলেন, আমি এক রাত্রে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে নামায পড়ি। তিনি সূরা বাকারা দিয়ে নামায শুরু করেন। আমি ধারণা করি যে, হয়তো একশত আয়াতের মাথায় তিনি রুকুতে যাবেন। কিন্তু না, তিনি কেরাআত অব্যাহত রাখেন। আমি ধারণা করি, হয়তো সূরাটি তিনি দুই রাকআতে পড়বেন। কিন্তু না, তিনি কেরাআত পড়া অব্যাহত রাখেন। তখন আমার ধারণা হয় যে, হয়তো সূরাটি শেষ করে রুকুতে যাবেন। কিন্তু না,

তিনি সূরা নিসা শুরু করে তা শেষ করলেন। তারপর সূরা আলে-ইমরান শুরু করে তাও শেষ করেন।(তিনি সূরা আলে-ইমরানের আগে সূরা নিসা পড়েছেন। এর দ্বারা প্রমাণ হয় যে, কোরআনের সূরার ক্রমিক ধারা লংঘন করা জায়েয) তিনি আস্তে আস্তে এবং সাধারণভাবে কেরাআত পড়েন। যখন তাসবীহ পাঠের আয়াত আসে, তখন তাসবীহ পড়েন, চাওয়ার আয়াত আসলে প্রার্থনা করেন এবং আশ্রয়ের আয়াত আসলে আশ্রয় চান।

তারপর তিনি রুকু করেন।(মুসলিম, নাসাঈ)

তিনি একরাতে ৭টি লম্বা সূরা পাঠ করেন, অথচ তখন তিনি অসুস্থ ছিলেন।(আবু ইয়া'লী। হাকেম ও আল্লামা যাহাবী একে সহীহ হাদীস বলেছেন। ৭টি লম্বা, সূরা হচ্ছে-বাকারা, আলে-ইমরান, নিসা, মায়েদাহ, আনআ'ম, আ'রাফ এবং তাওবাহ)

তিনি কখনও প্রত্যেক রাকআতে একটি করে উপরোল্লিখিত সূরা পড়তেন।(আবু দাউদ, নাসাঈ-সনদ বিশুদ্ধ)

তিনি এক রাতে কখনও পুরো কোরআন পড়েছেন বলে জানা যায় না।(মুসলিম, আবু দাউদ)

বরং তিনি আবদুল্লাহ বিন আমরের জন্য তাতে সম্মতি দেননি। আবদুল্লাহ বিন আমর বলেছেন, আমি-প্রত্যেক মাসে কোরআন খতম করি। আমি বলি যে, আমার আরও শক্তি আছে। (অর্থাৎ আমি আরও বেশী পড়তে পারি।) রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, তাহলে ২০ রাতে এক খতম কর। আবদুল্লাহ বলেন, আমি আরও বেশী পড়ার শক্তি রাখি। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, তাহলে ৭ রাতে এক খতম কর, এর বেশী নয়।(বোখারী, মুসলিম) (অর্থাৎ ৭ দিনের কম সময়ে কোরআন খতম কর না)

তারপর তিনি তাকে ৫ দিনের মধ্যে কোরআন খতমের অনুমতি দিয়েছেন।(নাসাঈ, তিরমিযী)

এরপর তাকে তিন দিনের মধ্যে কোরআন খতমের অনুমতি দিয়েছেন।(বোখারী, আহমদ)

তিনদিনের কম সময়ে কোরআন খতম করতে তিনি তাকে নিষেধ করেছেন।(সুনানে দারেমী, সুনান সাঈদ বিন মানসুর-সনদ বিশুদ্ধ) তিনি এর কারণ বর্ণনা করে বলেন: যে ব্যক্তি তিন দিনের কমে কোরআন খতম করে, সে কোরআন বুঝতে পারে না।(আহমদ-সনদ সহীহ)

অন্য আরেক বর্ণনায় এসেছে, তিনি তাকে বলেছেন, সে ব্যক্তি কোরআন বুঝতে পারে না, যে তিন দিনের কম সময়ে কোরআন খতম করে।(দারেমী। তিরমিযী এটিকে সহীহ বলেছেন)

রসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে আরো বলেন, সকল ইবাদতকারীর রয়েছে হিম্মত ও তৎপরতা( হিম্মত ও তৎপরতা বলতে বুঝায় সেই তেজীভাব, যা মুসলমানরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার জন্য প্রদর্শন করে। এই তেজীভাবের অপর অর্থ হল, নেক আমল করা এবং স্থায়ীভাবে তা করতে থাকা যে পর্যন্ত না আল্লাহর সাথে সাক্ষাত হয়। তাই রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহর কাছে প্রিয়তম আমল হচ্ছে স্থায়ী আমল-যদিও সেটা কম হোক না কেন) এবং প্রত্যেক হিম্মত ও তৎপরতার জন্য রয়েছে সময় বা যুগ সন্ধিক্ষণ। হয় তিনি সুন্নতে, না হয় বেদআতের দিকে মোড় নেবেন। যার কাল-সন্ধিক্ষণ সুন্নতের বিপরীত জিনিসের প্রতি মোড় নেয়, সে ধ্বংস হবে।(আহমদ, ইবনু হিব্বান)

সে কারণে রসূলুল্লাহ (সঃ) তিন দিনের কম সময়ে কোরআন শরীফ খতম করতেন না।(ইবনু, সা'দ, ১ম খন্ড ৩৭৬ পৃঃ, আখলাকুন্নবী-আবুশ্ শেখ ২৮১ পৃঃ)

তিনি বলতেন, যে ব্যক্তি রাতে দুইশত আয়াত পড়ে, তাকে একনিষ্ঠ মোখলেস আনুগত্যকারীদের মধ্যে পরিগণিত করা হয়।(দারেমী, হাকেম। আল্লামা যাহাবী হাদীসটিকে ঠিক বলেছেন)

রসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক রাতের নামাযে সূরা বনী ইসরাঈল এবং সূরা যুমার পাঠ করতেন।(আহমদ, ইবনে নসর-সনদ সহীহ)

তিনি আরও বলতেন, যে ব্যক্তি রাতে একশত আয়াত পড়বে, তাকে গাফেলদের মধ্যে লেখা হবে না।(দারেমী, হাকেম এবং আল্লামা যাহাবী একে সহীহ বলেছেন)

তিনি কখনও প্রত্যেক রাকআতে ৫০ আয়াত কিংবা আরও বেশী পড়তেন।(বোখারী, আবু দাউদ) আবার কখনও সূরা মোয্যাম্মেল (নং ৭৩, আয়াত সংখ্যা ২০) পরিমাণ কেরাআতে পড়তেন।(আহমদ, আবু দাউদ, সনদ সহীহ) তিনি কখনও পুরো রাত জেগে নামায পড়তেন না। (মুসলিম, আবু দাউদ। এই হাদীস সহ অন্যান্য হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সর্বদা বা অধিকাংশ সময় পুরো রাত জাগা মাকরূহ। কেননা, তা উত্তম হলে রসূলুল্লাহ (সঃ) ছাড়তেন না। তিনি হচ্ছেন উত্তম আদর্শ ও চরিত্র। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) ৪০ বছর ব্যাপী ইশার উযু দিয়ে ফজর পড়েছেন বলে যে মিথ্যা ঘটনা বর্ণিত আছে, তা বিশ্বাস করা ঠিক নয়। আল্লামা ফিরোযাবাদী 'আর রাদ্দ আ'লাল মো'তারেদ' গ্রন্থের ১ম খন্ডের ৪৪ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, এটা ইমাম আবু হানীফার সম্মানের প্রতি ক্ষতিকর প্রকাশ্য মিথ্যা। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) প্রতি নামাযের জন্য নতুন উযু করা উত্তম তাই সেটা অবশ্যই করে থাকবেন) 

তবে কদাচিত পুরো রাত পড়েছেন।

বর্ণিত আছে, আবদুল্লাহ বিন খাব্বাব আল-আরত বদরের যুদ্ধে রসূলুল্লাহর সাথে অংশগ্রহণ করেন এবং রসূলুল্লাহকে সারা রাতভর নামায পড়তেন দেখেন। সোবহে সাদেক পর্যন্ত তিনি নামায পড়েছেন। তিনি নামায থেকে সালাম ফিরালেন। খাব্বাব জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রসূল, আমার মা-বাপ আপনার জন্য উৎসর্গ হোক, আপনি এই রাতে এমন নামায পড়লেন যা ইতিপূর্বে আর কখনও দেখিনি। তিনি উত্তরে বলেন, হাঁ, এটা ছিল আশা ও ভয়ের নামায, আমি আমার রবের কাছে তিনটি জিনিস চেয়েছি। তিনি দু'টো দিয়েছেন এবং একটি নিষেধ করেছেন। আমি চেয়েছি যে, আমার উম্মাতকে যেন অন্যান্য জাতির মত ধ্বংস করা না হয়। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, যেন দুর্ভিক্ষ দিয়ে ধ্বংস করা না হয়। এই দোআ আল্লাহ মনযুর করেছেন। আমি আমার রবের কাছে আমাদের উপর নিজেরা ছাড়া অন্য জাতিকে বিজয়ী না করার প্রার্থনা জানিয়েছি। তিনি ঐ দোআও মনযুর করেছেন। আমি আরও দোআ করেছি, আমাদের মধ্যে যেন বিভক্তি না হয়। তিনি তা কবুল করেননি।( নাসাঈ, আহমদ, তাবারানী। তিরমিযী এটিকে সহীহ হাদীস বলেছেন)

এক রাতে তিনি বারবার ভোর পর্যন্ত শুধু নিম্নোক্ত আয়াতটি পড়ে রুকু, সাজদাহ ও দোআ করতে থাকেন। আয়াতটি হল:

إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ

الْحَكِيمُ

অর্থ: 'তুমি যদি তাদেরকে শাস্তি দাও, তবে তারা তো তোমারই বান্দাহ, আর যদি তাদেরকে ক্ষমা কর, নিঃসন্দেহে তুমি শক্তিশালী ও বিজ্ঞ।'

(সূরা মায়েদাহ-১১৮)

ভোর হলে আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! সারা রাত ভোর না হওয়া পর্যন্ত আপনি শুধু এই একটি মাত্র আয়াত পড়ে রুকু, সাজদাহ এবং দোআ করলেন, অথচ আল্লাহ আপনাকে পুরো কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন। আমাদের মধ্যে কেউ এরকম করলে আমরা তাকে পাকড়াও করতাম। রসূলুল্লাহ (সঃ) জওয়াবে বললেন, আমি আল্লাহর কাছে আমার উম্মতের সুপারিশ প্রার্থনা করেছি, তিনি তা মনযুর করেছেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করে না, সে ইন্‌শাআল্লাহ আমার সুপারিশ লাভকরবে।(নাসাঈ, ইবনু খোযায়মাহ, আহমদ, ইবনু নসর। হাকেম ও আল্লামা যাহাবী একে সহীহ বলেছেন)

এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমার এক প্রতিবেশী রাতে নামায পড়েন। তবে তিনি তাতে সূরা ইখলাস ছাড়া আর কোন সূরা পড়েন না। তিনি বারবার কেবলমাত্র ঐ সূরাটিই পড়েন এবং আর কোন সূরা পড়েন না। প্রশ্নকর্তা সূরা ইখলাসকে যেন অপর্যাপ্ত বিবেচনা করে ঐ প্রশ্ন করেন। নবী (সঃ) বললেন, আল্লাহর কসম, এটা কোরআনের এক-তৃতীয়াংশ।(বোখারী, আহমদ)

0 comments:

Post a Comment

Thanks for your comments.