Tuesday, July 14, 2026

নামাজে,নামাযে/সালাতে তাকবীর

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে


তাকবীর

রসূলুল্লাহ (সঃ) আল্লাহু আকবার বলে নামায শুরু করতেন। ( মুসলিম, ইবনে মাজাহ। নিয়্যত করার জন্যে তিনি কখনও نَوَيْتُ أَنْ أَصلي .) তিনি ভুল নামায আদায়কারী ব্যক্তিকেও অনুরূপ করার আদেশ দিয়েছিলেন। তিনি তাকে ইত্যাদি বলতেন না। বরং তা সর্বসম্মতভাবে বেদআত। শুধু এতটুকু মতভেদ যে, তা বেদআতে হাসানাহ, না সাইয়্যেআহ। আমরা বলবো, ইবাদতের মধ্যে সকল বেদআত গোমরাহী। হাদীস তাই বলে।

বলেছেন, 'কোনো ব্যক্তির নামায ওযু শেষে 'আল্লাহু আকবার' বলে শুরু না করলে তা সম্পন্ন হয় না' (সহীহ সনদ সহকারে তাবারানী এ হাদীস বর্ণনা করেছেন।)

রসূলুল্লাহ (সঃ) আরো বলেছেন, নামাযের চাবি হচ্ছে পবিত্রতা অর্জন। তাকবীর দ্বারা নামাযের বাইরের বৈধ কাজগুলোকে নামাযে হারাম করা হয় এবং সালাম ফিরানোর মাধ্যমে নামাযের বাইরের বৈধ কাজগুলোকে হালাল করা হয়। (আবু দাউদ, তিরমিযী, হাকেম, আল্লামা যাহাবী এ হাদীসকে বিশুদ্ধ বলেছেন)

তিনি তাকবীর বড়ো করে উচ্চারণ করতেন, পেছনের লোকেরাও তা শুনতে পেত। (আহমদ, হাকেম এবং আল্লামা যাহাবী এ হাদীসকে সহীহ বলেছেন)

তিনি যখন অসুস্থ অবস্থায় নামায পড়ান, তখন আবু বকর (রাঃ) তাঁর তাকবীরের শব্দ বড়ো করে লোকদেরকে শুনান। (মুসলিম ও নাসাঈ)

রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, ইমাম যখন আল্লাহু আকবার বলেন, তখন তোমরাও আল্লাহু আকবার বল। (আহমদ। বায়হাকী সহীহ সনদ সহকারে বর্ণনা করেছেন)

নামাজে/নামাযে/সালাতে নিয়ত

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

নিয়্যত 

ইমাম নববী রাওযাতুত তালেবীন বইতে লিখেছেন, নিয়্যত হল ইচ্ছা বা সংকল্প। নামাযের সময় মুসল্লীর মনে নামাযের যে পরিচিতি ও গুণাবলী ভেসে আসে তাই নিয়্যত। যেমন, যোহর, ফরয ইত্যাদি। প্রথম তাকবীরের সাথে ঐ সংকল্প সংশ্লিষ্ট থাকতে হবে।

রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, 'সকল আমল নিয়্যতের সাথে জড়িত। সকল ব্যক্তি তাই পাবে যা সে নিয়্যত করে। ( বোখারী, মুসলিম)

কবরের দিকে মুখ করে নামায পড়া

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

কবরের দিকে মুখ করে নামায পড়া


রসূলুল্লাহ (সঃ) কবরের দিকে মুখ করে নামায পড়তে নিষেধ করেছেন।

তিনি বলেছেন, 'তোমরা কবরের দিকে মুখ করে নামায পড়বে না এবং কবরের উপর বসবে না।' (মুসলিম, আবু দাউদ, ইবনু খোযায়মাহ)

সালাতে/নামাজে সুতরাহ (আড়াল) ও এর অপরিহার্যতা

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

সুতরাহ (আড়াল) ও এর অপরিহার্যতা

রসূলুল্লাহ (সঃ) সুতরার কাছে দাঁড়াতেন। দেয়াল থেকে তিনি তিন হাত দূরে দাঁড়াতেন। (বোখারী, আহমদ)

তাঁর সাজদা ও দেয়ালের মাঝে একটি ভেড়া পারাপারের জায়গা থাকত। (বোখারী ও মুসলিম)

রসূলুল্লাহ (স) বলতেন, সুতরার দিক ছাড়া অন্যদিকে ফিরে নামায পড়বে না এবং তোমার নামাযের সামনে দিয়ে কাউকে অতিক্রম করতে দেবে না। কেউ অস্বীকার করলে তুমি তার সাথে লড়বে। তার সঙ্গে একজন সাথী রয়েছে।(ইবনু খোযায়মাহ)

রসূলুল্লাহ (সঃ) আরো বলেছেন, কেউ যদি সুতরার দিকে মুখ করে নামায পড়ে, সে যেন সুতরার নিকটবর্তী হয় এবং শয়তানকে নিজ নামায অতিক্রম করার সুযোগ না দেয়। (আবু দাউদ, বায্যার, পৃঃ ৪৫, হাকেম। ইমাম যাহাবী ও নববী একে সহীহ হাদীস বলেছেন)

রসূলুল্লাহ (সঃ) কখনও কখনও মসজিদের খুঁটিকে সামনে রেখে নামাষ পড়েছেন। (ছোট-বড়ো সকল মসজিদে সুত্রার পেছনে নামায পড়ার জন্য ইমাম আহমদ উৎসাহিত করেছেন। এটাই যথার্থ। মাসায়েল আন ইমাম আহমদ: ইবনু হামি, ১ম খন্ড: ৬৬ পৃঃ)

রসূলুল্লাহ (সঃ) 'আড়ালবিহীন খোলা মাঠে নামায পড়ার সময় সামনে যুদ্ধাস্ত্র দাঁড় করিয়ে সেই দিকে মুখ করে নামায পড়তেন এবং লোকেরা তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করতেন। (বোখারী, মুসলিম ও ইবনু মাজাহ) কোন কোন সময় তিনি সওয়ারীকে সামনে রেখে তার পেছনে নামায পড়েছেন। (বোখারী, আহমদ) তবে উটের আস্তাবলে নামায পড়ার অনুমতি নেই। বরং রসূলুল্লাহ (সঃ) তা করতে নিষেধ করেছেন। (বোখারী, আহমদ) কখনও কখনও তিনি সওয়ারীর আসনকে সুতরাহ বানিয়ে সেদিকে ফিরে নামায পড়েছেন। (মুসলিম, ইবনু খোযায়মাহ, আহমদ)

রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, তোমাদের কেউ যদি নিজের সামনে সওয়ারীর আসনের পেছনের কাঠের অনুরূপ একটা কিছু রেখে নামায পড়ে, তাহলে তার সামনে দিয়ে কি অতিক্রম করল এ বিষয়ে তার কোনো পরোয়া নেই। (মুসলিম, আবু দাউদ) তিনি কখনও কখনও গাছের দিকে মুখ করে নামায পড়েছেন। (নাসাঈ, আহমদ) তিনি কখনও খাটের দিকে ফিরে নামায পড়েছেন এবং আয়েশা (রাঃ) নিজ চাদর মুড়ি দিয়ে খাটে শোয়া ছিলেন। (বোখারী, মুসলিম, আবু ইয়ালী)

রসূলুল্লাহ (সঃ) সুতরাহ ও নিজের মাঝখানে কোনো কিছুকে অতিক্রম করতে দিতেন না। কোন ভেড়া-বকরী তাঁর নামাযের সামনে দিয়ে পার হতে চাইলে তিনি ভেড়া-বকরীর আগেই দ্রুত দেয়ালের সাথে পেট লাগিয়ে গা ঘেঁষে দাঁড়াতেন এবং ভেড়া-বকরী তার পেছন দিয়ে পেরিয়ে যেত। (ইবনু খোযায়মাহ, তাবারানী, হাকেম, আযযাহাবী)

একবার রসূলুল্লাহ (সঃ) ফরয নামায পড়ার সময় নিজ হাত একসাথে মিলান। তাঁর নামায শেষে সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল! নামাযে কি কিছু ঘটেছে? তিনি বলেন, না। তবে শয়তান আমার সামনে দিয়ে অতিক্রম করতে চাচ্ছিল। আমি তার গলা চেপে ধরি এবং আমার হাতে তার জিহ্বার শীতলতা অনুভব করি। আল্লাহর কসম, যদি এ ব্যাপারে আমার ভাই নবী সোলায়মান (আঃ) আমার অগ্রগামী না হতেন, তাহলে আমি তাকে মসজিদের একটি খুটির সাথে বেঁধে রাখতাম এবং মদীনার শিশুরা তাকে দেখার জন্য চক্কর লাগাত। কেউ যদি চায় যে, কেবলা ও তার মাঝে কোনো অন্তরায় সৃষ্টি না হোক, তাহলে সে যেন সক্ষম হলে অনুরূপ করে। (আহমদ, দার কোতনী এবং সহীহ সনদ সহকারে তাবারানীও বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি বোখারী মুসলিম ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে একদল সাহাবায়ে কেরাম থেকে বর্ণিত আছে। এই হাদীস কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে একটি দলীল। তারা জিন স্বীকার করে না। তাদের মতে, জিন বলতে মানুষকে বুঝানো হয়েছে)

রসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেন, কোনো ব্যক্তি লোকদেরকে আড়াল করার উদ্দেশ্যে সুতরার দিকে ফিরে নামায পড়ার সময় অন্য কোন ব্যক্তি তার সামনে দিয়ে অতিক্রম করতে চাইলে তাকে বুক দিয়ে প্রতিরোধ করবে। অন্য বর্ণনায় এসেছে, তাকে সাধ্যমত প্রতিহত করবে। আরেক বর্ণনায় এসেছে, তাকে দুইবার নিষেধ করতে হবে। যদি সে না মানে, তাহলে তার সাথে লড়াই করতে হবে। কারণ সে ব্যক্তি শয়তান। (বোখারী, মুসলিম, ইবনু খোযায়মাহ)

তিনি আরো বলেছেন, নামাযীর সামনে দিয়ে অতিক্রমকারী ব্যক্তি যদি জানত যে, তার পরিণতি কি, তাহলে নামাযীর সামনে দিয়ে অতিক্রম করার চাইতে তার জন্য ৪০ পর্যন্ত অপেক্ষা করা উত্তম। (বোখারী, মুসলিম, ইবনু খোযায়মাহ)

তিনি আরো বলেছেন, নামাযীর সামনে (এ হাদীসে ৪০ বলতে কি বুঝানো হয়েছে তা পরিষ্কার নয়। কেউ কেউ বলেছেন, এর অর্থ ৪০ দিন, বছর বা ওয়াক্ত ইত্যাদি-অনুবাদক)

সুত্রাহ না থাকলে যে জিনিস নামায ভঙ্গ করে

রসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেন, নামাযীর সামনে সুত্রাহ না থাকলে ঋতুবর্তী মহিলার (অর্থাৎ বালেগা মহিলা) অতিক্রম কিংবা গাধা ও কাল কুকুরের অতিক্রমের কারণে নামায ভঙ্গ হয়ে যায়। আবু যর জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রসূল! লাল কুকুরের তুলনায় কাল কুকুরের বিষয়টি এমন কেন? রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, কাল কুকুর শয়তান। (মুসলিম, আবু দাউদ, ইবনু খোযায়মাহ)

মিম্বরের উপর নামায আদায়

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

মিম্বরের উপর নামায আদায়

একবার রসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর নামায আদায় করেন। এক বর্ণনায় এসেছে, মিম্বরের ছিল তিনটি তাক বা সিঁড়ি। (তিন সিঁড়ি বিশিষ্ট মিম্বরই সুন্নত। বেশি সিড়ি নামাযের কাতারের জন্য অসুবিধে। এটি উমাইয়া আমলের বেদআত)

তিনি মিম্বরের উপর দাঁড়ান ও তাকবীর বলেন। লোকেরাও তাঁর পেছনে তাকবীর বলেন। তারপর তিনি মিম্বরের উপরই রুকুতে যান এবং রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ান। তারপর নীচে নেমে আসেন এবং মিম্বরের নীচের সিঁড়িতে সাজদা করেন। তারপর আবার মিম্বরের উপর উঠেন এবং প্রথম রাকআতের অনুরূপ নামায পড়েন। এইভাবে তিনি নামায শেষ করেন। তারপর লোকদের দিকে ফিরে বলেন, হে লোকেরা! আমি এরূপ করেছি যেন তোমরা আমাকে ভালভাবে অনুসরণ করতে পার এবং আমার নামায দেখে শিখতে পার। (বোখারী, মুসলিম)

জুতা সহকারে নামায পড়া ও অনুরূপ করার আদেশ

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

জুতা সহকারে নামায পড়া ও অনুরূপ করার আদেশ

রসূলুল্লাহ (সঃ) কখনও জুতা পায়ে এবং কখনও খালি পায়ে নামায পড়তেন। তিনি নিজ উম্মাহর জন্যও অনুরূপ করাকে বৈধ করে গেছেন। (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ। ইমাম তাহাবী বলেছেন, এটি মোতাওয়াতের হাদীস)

তিনি বলেছেন, তোমাদের কেউ নামায পড়লে সে যেন জুতা পরে থাকে কিংবা দুই পায়ের মাঝখানে তা খুলে রাখে। জুতা দিয়ে কাউকে যেন কষ্ট না দেয়। (আবু দাউদ, বায্যার)

তিনি কখনও জুতা সহকারে নামায পড়ার বিষয়ে তাকীদ দিতেন। তিনি বলেছেন: তোমরা ইহুদীদের বিরোধিতা কর, তারা জুতা ও চামড়ার মোযায় নামায পড়ে না। (আবু দাউদ, বায্যার)

কখনও তিনি নামাযের মধ্যেই দুই পায়ের জুতা খুলে নামায অব্যাহত রাখতেন। এমর্মে আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেনঃ

একদিন রসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে নিয়ে নামায পড়েন। তিনি নামাযে জুতা খুলে বামদিকে রাখেন। তা দেখে লোকেরাও জুতা খুলে ফেলল। তিনি নামায শেষে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কেন জুতা খুলে রেখেছ? তারা বলল, আপনাকে জুতা খুলতে দেখে আমরাও জুতা খুলে রেখেছি। তিনি বললেন, আমার কাছে জিবরীল (আঃ) আসেন এবং জুতায় অপবিত্রতার খবর দেন। তাই আমি তা খুলে রেখেছি। তোমরা মসজিদে আসলে নিজের জুতা দেখে নেবে। তাতে ময়লা থাকলে মুছে ফেলবে এবং জুতা সহকারেই নামায পড়বে। (আবু দাউদ, ইবনু খোযায়মাহ, হাকেম। ইমাম আযযাহাবী ও ইমাম নববীও একে বিশুদ্ধ হাদীস বলেছেন)

তিনি জুতা খুলে তা বাম পার্শ্বে রাখতেন। ( আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনু খোযায়মাহ)

তিনি বলতেন, তোমরা নামায পড়লে নিজ জুতা খুলে ডানে ও বামে রাখবে না যা অন্যের ডানে পড়তে পারে। তবে বামদিকে কেউ না থাকলে বামে রাখা যেতে পারে। অন্যথায় নিজের দুই পায়ের মাঝখানে রাখবে। (আবু দাউদ, ইবনু খোযায়মা, হাকেম)

রাত্রের নামাযে দাঁড়ানো ও বসা

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

রাত্রের নামাযে দাঁড়ানো ও বসা

রসূলুল্লাহ (সঃ) রাত্রে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে নামায পড়তেন। তিনি দীর্ঘ সময় বসেও নামায পড়তেন। তিনি দাঁড়িয়ে নামায পড়লে দাঁড়িয়ে রুকু দিতেন এবং বসে নামায পড়লে বসে রুকু দিতেন। (মুসলিম, আবু দাউদ)

কখনও তিনি বসে বসে নামায পড়লে কেরাআতও বসে বসেই পড়তেন।

কিন্তু যখন ৩০/৪০ আয়াত বাকী থাকত, তখন তিনি দাঁড়াতেন। তারপর রুকু ও সাজদা করতেন। দ্বিতীয় রাকআতেও তিনি অনুরূপ করতেন। (বোখারী, মুসলিম)

তিনি শেষ বয়সে বসে নফল নামায পড়েছেন। ইন্তিকালের এক বছর আগে তিনি বসে নফল নামায পড়েন। (মুসলিম, আহমদ)

রসূলুল্লাহ (সঃ) আসন-পিঁড়ি হয়ে এক পায়ের উপর অন্য পা আড়াআড়িভাবে স্থাপন করে বসতেন। ইংরেজিতে একে Cross-Legged বলে। (নাসাঈ, ইবনে খোযাইমাহ, হাকেম)

 



নৌকায় নামায

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

নৌকায় নামায

রসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নৌকায় নামায পড়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ডুবে যাওয়ার ভয় না থাকলে দাঁড়িয়ে নামায পড়। (বায্যার, দার কোতনী, হাকেম)

রসূলুল্লাহ (সঃ) শেষ বয়সে একটি লাঠির উপর ভর দিয়ে নামায পড়েছেন। (আবু দাউদ, হাকেম)

Monday, July 13, 2026

অসুস্থ লোকের বসে নামায পড়া

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

অসুস্থ লোকের বসে নামায পড়া

ইমরান বিন হোসাইন (রাঃ) বলেছেন, আমার ছিল অর্শ রোগ। আমি রসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রশ্ন করায় তিনি বলেন, দাঁড়িয়ে নামায পড়। যদি দাঁড়াতে সক্ষম না হও, তাহলে বসে নামায পড়। যদি তাও সম্ভব না হয়, তাহলে শুয়ে এক পাশে ফিরে নামায পড়বে। (বোখারী, আবু দাউদ, আহমদ। খাত্তাবী বলেছেন, ইমরানের হাদীসে ফরয নামায সম্পর্কে বলা হয়েছে কষ্ট হলেও দাঁড়িয়ে পড়তে পারলে ভাল। অন্যথায় বসে পড়া জায়েয থাকলেও তাতে সওয়াব অর্ধেক পাওয়া যাবে।)

তিনি আরো বলেন, আমি রসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বসে নামায পড়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করায় তিনি উত্তর দেন, দাঁড়িয়ে নামায পড়া উত্তম। বসে নামায পড়লে দাঁড়িয়ে নামায পড়ার অর্ধেক সওয়াব পাওয়া যায় এবং শুইয়ে নামায পড়লে বসে নামায পড়ার অর্ধেক সওয়াব পাওয়া যায়। (বোখারী, আবু দাউদ, আহমদ) এখানে রোগীর নামায সম্পর্কেই প্রশ্ন করা হয়েছে।

আনাস (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ (সঃ) কিছু রোগীর কাছে গেলেন যারা বসে বসে নামায আদায় করছিলেন। তিনি বলেন, বসে নামায পড়লে দাঁড়িয়ে নামায পড়ার অর্ধেক সওয়াব। (আহমদ ও ইবনে মাজাহ। সনদ বিশুদ্ধ)

রসূলুল্লাহ (সঃ) এক রোগীকে দেখতে যান। রোগীটি বালিশের উপর নামায পড়ছিলেন। তিনি বালিশটি ফেলে দেন। তারপর রোগীটি নামায পড়ার জন্য একটি কাঠ নেন। তিনি এবারও কাঠটি ফেলে দেন এবং বলেন, সক্ষম হলে মাটির উপর নামায পড়। নচেত ইশারা দ্বারা নামায পড় এবং রুকুর তুলনায় সাজদায় অধিকতর ঝুঁকে পড়। (তাবারানী, বায্যার, বায়হাকী। সনদ বিশুদ্ধ)

Sunday, July 12, 2026

সালাতে,নামাজে/নামাযে কেয়াম (দাঁড়ানো)

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

কেয়াম (দাঁড়ানো)

রসূলুল্লাহ (সঃ) আল্লাহর নিম্নোক্ত আদেশের ভিত্তিতে ফরয ও নফল নামায দাঁড়িয়ে পড়তেন। আল্লাহ বলেন:

وَقَوْمُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ

অর্থ: 'আল্লাহর সামনে অনুগত ও বিনীত হয়ে দাঁড়াও। (বাকারা: ২৩৮)

তিনি সফরে নফল ও সুন্নত নামায সওয়ারীর উপর বসে আদায় করতেন। তিনি যুদ্ধকালীন ভয়ের নামাযে উম্মাহর জন্য পায়ের উপর দাঁড়িয়ে কিংবা সওয়ারীর উপর বসে আদায়ের নিয়ম চালু করে গেছেন। আল্লাহ বলেছেন:

حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَى وَقَوْمُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ -فَإِنْ خِفْتُمْ فَرِجَالًا أَوْ رُكْبَانًا فَإِذَا أَمِنْتُمْ فَاذْكُرُوا اللَّهَ كَمَا عَلَّمَكُمْ مَّا لَمْ تَكُونُوا تَعْلَمُونَ .

অর্থঃ "তোমরা নামাযসমূহের পূর্ণ হেফাযত কর। বিশেষ করে মধ্যবর্তী ও উত্তম-উৎকৃষ্ট নামায। আল্লাহর সামনে অনুগত সেবকের ন্যায় দাঁড়াও। ভয়ের সময় পদাতিক কিংবা আরোহী অবস্থাতেই নামায পড়। তারপর নিরাপত্তা ফিরে আসলে আল্লাহকে সেই নিয়মে ডাক যেভাবে তিনি তোমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন, যা তোমরা জানতে না। (বাকারা: ২৩৮-২৩৯ আয়াত)

রসূলুল্লাহ (সঃ) মৃত্যুকালীন তাঁর রোগে বসে বসে নামায পড়েছেন।  (তিরমিযী, আহমদ)

আরেকবার অসুস্থ হয়ে তিনি বসে নামায পড়েছেন এবং লোকেরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নামায পড়েন। তারপর তিনি তাদেরকে বসার জন্য ইঙ্গিত দেন, তারা সবাই বসে পড়েন। নামায শেষে তিনি বলেন, তোমরা প্রথমে যা করেছিলে, তা পারস্য ও রোম সম্রাটদের নীতি। তারা বসে থাকে আর লোকেরা দাঁড়িয়ে থাকে। তোমরা এরূপ কর না। অনুসরণের জন্যই তোমাদের ইমাম নিযুক্ত করা হয়েছে। তিনি রুকু করলে তোমরা রুকু করবে, তিনি রুকু থেকে উঠলে তোমরা উঠবে এবং তিনি বসে নামায পড়লে তোমরাও সবাই বসে নামায পড়বে। (মুসলিম)


নামাজে/নামাযে/সালাতে কেবলার দিকে মুখ করে দাঁড়ানো

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
কেবলার দিকে মুখ করে দাঁড়ানো

রসূলুল্লাহ (সঃ) যখন ফরয, সুন্নত ও নফল নামায পড়তেন, তখন কাবার দিকে মুখ করে দাঁড়াতেন এবং অন্যদেরকেও কাবার দিকে মুখ করে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিতেন। তিনি ভুল নামায আদায়কারীকে লক্ষ্য করে বলেন, 'তুমি যখন নামাযের জন্য দাঁড়াবে, তখন কেবলামুখী হয়ে তাকবীর বলবে।  (বোখারী ও মুসলিম)

তিনি সফরে নিজ সওয়ারীর উপর বেজোড় নফল নামায পড়তেন এবং সওয়ারী পূর্ব ও পশ্চিমে যে দিকেই যেত, সেদিকে মুখ করেই নামায আদায় করতেন। (বোখারী ও মুসলিম)

এ বিষয়ে আল্লাহর কোরআন বলছেঃ

فَأَيْنَمَا تُوَلُّوا فَثَمَّ وَجْهُ اللَّهِ -

অর্থঃ "তোমরা যেদিকেই মুখ কর, সে দিকেই আল্লাহ আছেন।" (সূরা বাকারা, ১১৫ আয়াত।)

এছাড়াও তিনি সওয়ারীর উপর জোড় নফল নামাযও পড়তেন। তিনি যখন নফল নামায পড়তেন, তখন সওয়ারীর উপর কেবলামুখী হয়ে বসতেন এবং তাকবীর বলতেন। তারপর সওয়ারী যেদিকেই যেত তিনি নামায অব্যাহত রাখতেন। (আবু দাউদ, ইবনে হিব্বান।)

তিনি সওয়ারীর উপর মাথার ইশারায় রুকু ও সিজদাহ দিতেন। তিনি রুকুর তুলনায় সিজদায় অধিকতর নীচু হতেন। (আহমদ, তিরমিযী।)

তিনি ফরয নামায পড়ার ইচ্ছা করলে সওয়ারী থেকে নীচে নেমে কেবলামুখী হয়ে নামায আদায় করতেন। (বোখারী, মুসলিম।)

কঠিন ভয়কালীন নামাযে তিনি নিজ উম্মতের জন্য দাঁড়িয়ে সওয়ারীর উপর, কেবলা কিংবা অকেবলামুখী হয়ে নামায আদায়ের সুন্নত চালু করে গেছেন। (বোখারী ও মুসলিম।)

রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন:

'যখন তারা নামাযে এসে মিলিত হবে, তখন তাকবীর বলবে ও মাথা দ্বারা ইশারা করবে। (বায়হাকী।)

রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরো বলতেন, পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যখানে কেবলা। (তিরমিযী, হাকেম।)

জাবের (রাঃ) বলেছেন: আমরা একবার রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে এক অভিযানে বের হই। তখন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় আমরা কেবলা নির্ধারণের ব্যাপারে মতভেদ পোষণ করি। আমরা প্রত্যেকেই পৃথক পৃথকভাবে নামায আদায় করি। আমরা প্রত্যেকেই স্থানের পরিচিতির জন্য সামনে একটা দাগ কাটি। সকাল বেলায় আমরা যখন ঐ স্থান দেখি, তখন দেখতে পাই যে, আমরা কেবলার বিপরীত দিকে নামায পড়েছি। আমরা তা রসূলুল্লাহর কাছে বর্ণনা করি। তিনি আমাদেরকে পুনরায় নামায পড়ার আদেশ করেননি। বরং তিনি বলেন, তোমাদের নামায শুদ্ধ হয়েছে। (দারু কোতনী, হাকেম, বায়হাকী, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ও তাবারানী।)

রসূলুল্লাহ (সঃ) বায়তুল মাকদেসের দিকে মুখ করে নামায পড়েন। তখন কাবা শরীফকে কেবলা বানানো তার বাসনা ছিল। অথচ নীচের আয়াত নাযিল হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি বায়তুল মাকদেসের দিকে ফিরেই নামায পড়েন।

আয়াতটি হচ্ছে:

قَدْنَرَى تَقَلُّبَ وَجْهِكَ فِي السَّمَاءِ فَلَنُوَ لِيَنَّكَ قِبْلَةٌ تَرْضَاهَا فَوَلِّ وَجْهَكَ شَطْرَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ .

অর্থঃ "আমরা আকাশের দিকে বারবার তোমার ফিরে তাকানোকে দেখছি। এখন আমরা তোমার মুখ সেই কেবলার দিকেই ফিরিয়ে দিচ্ছি যা তুমি পছন্দ করো। সুতরাং মসজিদে হারামের দিকে মুখ ফিরাও। (সূরা আল-বাকারা: ১৪৪)

এই আয়াত নাযিলের পর তিনি কাবার দিকে মুখ করে নামায পড়া শুরু করেন। সকাল বেলায় কিছু লোক মসজিদে কুবায় নামায পড়াকালীন সময় একজন আগন্তুক বলেন, রাত্রে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর কাবাকে কেবলা বানিয়ে নামায পড়ার উদ্দেশ্যে কোরআনের আয়াত নাযিল হয়েছে। তাই তোমরা কাবার দিকে মুখ ফিরাও। এসময় তাদের মুখ ছিল সিরিয়াভিমুখী। তখন তারা কাবার দিকে ফিরে দাঁড়ান এবং ইমামও তাই করেন। (বোখারী, মুসলিম, আহমদ, তাবারানী।)



Saturday, July 11, 2026

একটি সন্দেহের জওয়াব

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

একটি সন্দেহের জওয়াব

দশ বছর পূর্বে লেখা আমার বই-এর এ ভূমিকা দ্বারা যুবক মোমেনদের মনে সাড়া জেগেছে। তাতে তাদেরকে ইসলামের নির্ভুল উৎস কোরআন ও হাদীসের দিকে ফিরে আসার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে দাওয়াত দেয়া হয়েছে। আল হামদু-লিল্লাহ্ এর ফলে হাদীসের উপর আমলকারী লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তারা এমর্মে অন্যদের কাছে পরিচিতিও হয়েছে। তা সত্ত্বেও আমি কিছু লোকের মধ্যে এ বিষয়ে অগ্রসর হওয়ার ব্যাপারে স্থবিরতা লক্ষ্য করেছি। এতে আর কি সন্দেহ থাকতে পারে, যেখানে আমি কোরআন, হাদীস ও ইমামদের বক্তব্যের বরাত দিয়ে প্রমাণ করেছি যে, সবাইকে কোরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু কিছু সংখ্যক অনুসারী তাদের অনুসৃত মোকাল্লাদ শেখদের বিভিন্ন কথা দ্বারা সংশয়ের আবর্তে দিন কাটাচ্ছেন। তাই আমি ঐ সকল সন্দেহ-সংশয়ের জওয়াব দেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। আশা করি এর ফলে তারা হাদীসের অনুসরণ করতে আরো বেশি অনুপ্রাণিত হবেন। এখন আমরা নিম্নোক্ত সন্দেহগুলোর জওয়াব দেবো:

১. কেউ কেউ বলেন, দীনী ব্যাপারে রসূলুল্লাহর জীবন ও চরিত্রের দিকে প্রত্যাবর্তন করা খুবই জরুরী। বিশেষ করে নামাযের মত বাধ্যতামূলক নিরেট ইবাদতসমূহে যেখানে ইজতিহাদ ও ব্যক্তিগত মতের কোনো স্থান নেই, সেক্ষেত্রে তা আরো বেশি প্রযোজ্য। কিন্তু আমরা কোনো মোকাল্লেদ (অনুসারী) আলেম ও শেখকে এ বিষয়ে আদেশ দিতে দেখি না বরং তারা মতভেদকে মেনে নেন। তাদের ধারণা এটা মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি কনসেশন বা রেয়াত। তারা নিম্নোক্ত হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করেন:

اخْتِلَافُ أُمَّتِي رَحْمَةً

অর্থ: 'আমার উম্মতের মধ্যকার মতভেদ রহমত স্বরূপ।' এই হাদীস আপনি যে পদ্ধতির দিকে আহ্বান জানান তার বিপরীত। এ ব্যাপারে আপনার জওয়াব কি?

এই প্রশ্নের দু'টি উত্তর আছে।

প্রথমত হাদীসটি সহীহ নয় বরং তা বাতিল এবং এর কোন ভিত্তি নেই। আল্লামা সাবকী বলেছেন: আমি এই হাদীসের কোনো সহীহ সনদ খুঁজে পাইনি। এমনকি এর কোনো দুর্বল ও মাওযু (মিথ্যা) সনদও নেই। অর্থাৎ এটি আদৌ হাদীস নয়।

এক্ষেত্রে আরো দু'টো হাদীস উল্লেখ করা হয়। সেগুলো হলঃ

. اخْتِلَافُ أَصْحَابِيْ لَكُمْ رَحْمَةٌ . أَصْحَابِي كَالنُّجُومِ فَبِأَيِّهِمْ اِقْتِدَيْتُمْ اهْتَدَيْتُمْ .

১. 'আমার সাহাবীদের মতপার্থক্য রহমত স্বরূপ।'

২. আমার সাহাবীরা তারার মত। তাদের যে কাউকে অনুসরণ করবে হেদায়াত লাভ করবে।'

এই দু'টো হাদীসই সহীহ নয়। প্রথমটা খুবই দুর্বল এবং দ্বিতীয়টা মাওযু বা অসত্য হাদীস। আমি এ বিষয়ে আমার 'সিলসিলাতুল আহাদীস আযযাঈফা ওয়াল মাওযুআহ' গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। (নম্বর যথাক্রমে ৫৮,৫৯, ৬১)

প্রথম হাদীসটি একদিকে দুর্বল, অন্যদিকে তা কোরআনের বিপরীত। কোরআন বলেছে তোমরা দীনী বিষয়ে মতভেদ কর না, বরং তাতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা কর। যেমন আল্লাহ বলেছেন:

وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا رِيْحَكُمْ (الانفال - (٤٦)

অর্থঃ "তোমরা ঝগড়া ও মতবিরোধ কর না, তাহলে তোমাদের শক্তি চলে যাবে ও তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে।" (সূরা আনফালঃ ৪৬)

وَلَا تَكُونُوا مِنَ الْمُشْرِكِينَ مِنَ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا

شِيَعًا كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ - (الروم - (۳۱ - ۳۲)

অর্থঃ "তোমরা ঐ সকল মোশরেকের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না যারা নিজেদের দীনকে শতধা বিচ্ছিন্ন করে বহু দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। প্রত্যেক দল নিজেদের কাছে যা আছে তা নিয়ে খুশী।' (সূরা রূম: ৩১-৩২)

আল্লাহ বলেন:

وَلَا يَزَالُوْنَ مُخْتَلِفِينَ إِلَّا مَنْ رَّحِمَ رَبُّكَ (هود - ۱۱۹۲۱۱۸)

অর্থঃ "আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ ছাড়া অন্যরা মতভেদ অব্যাহত রেখেছে। (সূরা হুদ: ১১৮-১১১)

যাদের উপর আল্লাহর রহমত হয়েছে, তারা মতভেদ করে না, বরং বাতিল পন্থীরাই মতভেদ করে। তাহলে কি করে ধারণা করা যায় যে, মতভেদ ও মতপার্থক্য দ্বারা রহমত আসবে?

এটা প্রমাণিত হল যে, বর্ণিত হাদীসগুলো সহীহ নয়, সনদ বা মূল বাক্য কোনটাই বিশুদ্ধ নয়। ৩৯ এটা দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, ইমামরা যে হাদীস ও কোরআন অনুসরণের নির্দেশ দিয়ে গেছেন, এতো দুর্বল শোবা-সন্দেহের কারণে তার উপর আমল করা থেকে বিরত থাকা জায়েয হবে না।

২. কেউ কেউ প্রশ্ন করেন দীনী বিষয়ে যদি মতপার্থক্য নিষিদ্ধ হয়, তাহলে সাহাবায়ে কেরাম ও পরবর্তীতে ইমামদের মতপার্থক্য সম্পর্কে কি জওয়াব আছে? তাদের মতভেদের সঙ্গে কি পরবর্তী লোকদের মতপার্থক্যের কোন ব্যবধান আছে?

এর জওয়াব হচ্ছে, হাঁ, উভয় দলের মতভেদের মধ্যে বিরাট পার্থক্য আছে। ঐ মত পার্থক্য দুই ভাবে বিবেচনা করতে হবে। একটি হচ্ছে, মতপার্থক্যের কারণ আর অন্যটি হচ্ছে তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব।

৩৯. কেউ ইচ্ছা করলে আমার উপরোক্ত গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা পড়তে পারেন।

সাহাবায়ে কেরামের মতপার্থক্য ছিল জরুরত ভিত্তিক এবং তাঁদের বুঝ-শক্তির স্বাভাবিক পার্থক্য। ইচ্ছাকৃত ভাবে তাঁরা মতপার্থক্য করেননি। তাঁদের যুগে আরো কিছু বিষয়ও এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল। প্রথমে মতভেদ দেখা দিলেও পরে তা দূর হয়ে গেছে। ৪০ ঐ জাতীয় মতপার্থক্য থেকে পুরো মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। তারা উপরে বর্ণিত আয়াতে নিন্দারযোগ্য নয় এবং তারা শাস্তিও পাবেন না। কেননা, শাস্তির জন্য যে ইচ্ছা ও পুনরাবৃত্তি দরকার তা তাদের বেলায় অনুপস্থিত।

পক্ষান্তরে, অনুসারী বা মোকাল্লেদদের মতভেদের ব্যাপারে গ্রহণযোগ্য কোনো ওযর নেই। তাদের কিছু সংখ্যকের জন্য কোরআন ও হাদীস থেকে এমন সুস্পষ্ট দলীল পেশ করা যায়, যা অন্য কোনো মাযহাবের মতকে সমর্থন করে। তা সত্ত্বেও যদি তা ভিন্ন মাযহাবের অজুহাতে ত্যাগ করে, তাহলে বুঝতে হবে তার কাছে মাযহাবটাই আসল কিংবা সেটাই একমাত্র দীন। যে দীন নবী করীম (সঃ) দুনিয়ায় নিয়ে এসেছেন এবং অন্যান্য মাযহাব ভিন্ন এবং বাতিল দীন। নাউযুবিল্লাহ।

মূলত এক মাযহাবের কোনো অনুসারী অন্য যে কোনো মাযহাব থেকে যা ইচ্ছা ও যতটুকু ইচ্ছা ততোটুকু গ্রহণ করতে পারে এবং নিজ মাযহাব থেকেও যতটুকু ইচ্ছা ততোটুকু ছাড়তে পারে। কেননা, সবটুকুই এবং সব মাযহাবই শরীআহ বা আল্লাহর আইন ভিত্তিক। তাতে কোনো অসুবিধে নেই। বাতিল হাদীসের উপর ভিত্তি করে মতভেদের উপর অর্থহীনভাবে অটল থাকার কোনো যুক্তি নেই। মতভেদের বিষয়ে অনেক ওলামায়ে কেরাম মন্তব্য করেছেন। তাদের মন্তব্যগুলো হচ্ছেঃ

ইবনুল কাসেম বলেছেন: আমি ইমাম মালেক এবং ইমাম লাইসকে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবায়ে কেরামের মতপার্থক্যের বিষয়ে আলোচনা করতে শুনেছি। তাঁরা বলেন, লোকেরা বলে, তাতে প্রশস্ততা ও উদারতা রয়েছে। আসলে সে রকম নয়। আসলে তা ছিল ভুল ও শুদ্ধ কাজ। (জামে বায়ানিল ইল্ম: ইবনু আবদিল বার, ২য় খন্ড, পৃঃ ৮১-৮২।)

আশহাব বলেন: ইমাম মালেককে প্রশ্ন করা হয়েছিল, যে ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্ভরযোগ্য (ছেকা) সাহাবায়ে কেরামের কাছ থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন তাতে কি প্রশস্ততা ও উদারতা আছে?

৪০. বিস্তারিত জানার জন্য ইবনু হাযমের 'ইহকাম ফী উসুলিল আহকাম' কিংবা শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলবীর 'হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা' অথবা তাঁর বিশেষ পুস্তিকা 'আকদুল জাইয়েদ ফী আহকামিল ইজতিহাদ ওয়াত তাকলীদ' দ্রষ্টব্য।

তিনি জওয়াবে বলেন, না। আল্লাহর কসম, যে পর্যন্ত না সঠিক হাদীস বর্ণনা করে। হক ও সত্য এক। দুটো বিপরীত কথা একই সময়ে কি করে হক হয়? হক ও সত্য একটাই। (ঐ, ২য় খন্ড, ৮২, ৮৮ ও ৮৯ পৃঃ।)

ইমাম শাফেঈ (রঃ)-এর সাথী মোযানী বলেন: সাহাবায়ে কেরাম

মতভেদ করেছেন, একে অপরকে ভুল বলেছেন, একজন আরেকজনের কথায় সন্দেহ পোষণ করে পরে তা পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে দেখেছেন। যদি তাঁদের সকলের সব কথা সঠিক হত, তাহলে তাঁরা অনুরূপ বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করতেন না।

উমার ফারুক (রাঃ) এক কাপড়ে নামায আদায়ের ব্যাপারে উবাই বিন

কা'ব ও আবদুল্লাহ বিন মাসউদের মতভেদের কারণে রাগ করেছিলেন। উবাই বলেছিলেন, এক কাপড়ে নামায আদায় করা সুন্দর ও উত্তম। আবদুল্লাহ বিন মাসউদ বলেন, তাতো করা যায় কিন্তু তাতে কাপড় খুব কম হয়ে যায়। তখন উমার (রাঃ) রাগ করে বেরিয়ে আসেন এবং বলেন, উবাই ঠিক কথাই বলেছে। তিনি ইবনে মাসউদের কথাকে এক্ষেত্রে বড়ো করে দেখেননি। তারপর তিনি বলেন, এখন থেকে আমি আর কাউকে মতভেদ করতে দেখলে তাকে এই এই করবো। (ঐ, ২য় খন্ড, ৮৩-৮৪ পৃঃ।)

এটা প্রমাণিত হয়ে গেলো যে, মতভেদ সকল মন্দের মূল, তা রহমত নয়। কিছু মতভেদের জন্য পাকড়াও করা হবে। যেমন চরমপন্থী মাযহাবের অনুসারী লোক। আর কিছু মতভেদ আছে যার জন্য পাকড়াও করা হবে না। যেমন, সাহাবায়ে কেরামের মতভেদ এবং ইমামদের মতপার্থক্য। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁদের দলভুক্ত করুন। সাহাবাদের মতপার্থক্য অন্ধ অনুসারীদের মতপার্থক্য থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাহাবায়ে কেরাম বাধ্য হয়ে মতভেদ পোষণ করেছেন। কিন্তু তাঁরা মতভেদকে অপছন্দ করতেন ও অস্বীকার করতেন এবং মতভেদ থেকে বাঁচার উপায় পেলে বেঁচে থাকতেন। কিন্তু অন্ধ অনুসারীরা (মোকাল্লেদ) তা থেকে বাঁচার উপায় থাকা সত্ত্বেও বেঁচে থাকেন না, ঐক্যবদ্ধ হন না, সেজন্য চেষ্টা করেন না। বরং মতভেদকে জিইয়ে রাখেন।

এই উভয়ের মধ্যে সুদূরপ্রসারী প্রভাবের পার্থক্য সুস্পষ্ট। শাখা-প্রশাখায় পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সাহাবায়ে কেরাম ঐক্য রক্ষার ব্যাপারে ছিলেন খুবই সতর্ক। তাঁরা অনৈক্য সৃষ্টিকারী কথা ও কাজ থেকে বহুদূরে অবস্থান করতেন। 

তাঁদের কেউ প্রকাশ্যে বিসমিল্লাহ পড়ার পক্ষে, কেউ বিপক্ষে। কেউ দুই হাত উত্তোলনকে (রাফয়ে ইয়াদাইন) উত্তম মনে করতেন, কেউ তা মনে করতেন না। কেউ স্ত্রীকে স্পর্শ করলে উযু ভেঙ্গে যায় মনে করতেন, আবার কেউ তা মনে করতেন না। তা সত্ত্বেও তাঁরা সবাই একই ইমামের পেছনে নামায পড়েছেন এবং কেউ মাযহাবী মতভেদের কারণে অপরের পেছনে নামায পড়া থেকে বিরত থাকতেন না।

কিন্তু মোকাল্লেদদের (অনুসারীদের) অবস্থা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। মতপার্থক্যের কারণে তারা ইসলামের দ্বিতীয় মহান রোকন নামাযের ব্যাপারেও ঐক্যবদ্ধ হতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা একই ইমামের পেছনে সবাই এক সঙ্গে নামায পড়তে অনিচ্ছুক। কেননা, তাদের দৃষ্টিতে ভিন্ন মাযহাবের অনুসারী ইমামের নামায বাতিল কিংবা কমপক্ষে মাকরূহ। আমরা এরকম বহু শুনেছি ও দেখেছি। ৪৪ কেন তা শুনব না? কোনো কোনো প্রখ্যাত মাযহাবের কিতাবে উক্ত নামাযকে বাতিল কিংবা মাকরূহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে, একই জামে মসজিদে চার মাযহাবের চারটি মেহরাব দেখা যায় এবং তাতে চারজন ইমাম একের পর এক নামায পড়ান। প্রত্যেক মাযহাবের লোকেরা যে মুহূর্তে নিজ ইমামের অপেক্ষা করছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে অন্য ইমাম দাঁড়িয়ে নামায আদায় করছেন।

শুধু তাই নয়, কোনো কোনো অন্ধ অনুসারী আরো কঠিন মতভেদও পোষণ করেন। তারা হানাফী মাযহাবের অনুসারীর সঙ্গে শাফেঈ মাযহাবের অনুসারীর বিয়ে-শাদী নিষেধ করেন। আবার কোনো কোনো মশহুর হানাফী শাফেঈ মাযহাবকে আহলে কিতাবের অনুরূপ মনে করে বিয়েকে জায়েয বলেছেন। (আল-বাহরুর রায়েক।)

এই ফতোয়া থেকে এরকম অর্থও বের করা হয় যে, শাফেঈ মাযহাবের কোনো পুরুষ হানাফী মাযহাবের কোনো মেয়েকে বিয়ে করতে পারবে না। যেমনটি আহলে কিতাবের সঙ্গে প্রযোজ্য।

বুদ্ধিমানের জন্যে পরবর্তী কালের আলেমদের মতভেদের কুফল বুঝার জন্য উপরোক্ত দুটি উদাহরণই যথেষ্ট। যদিও এরূপ আরো বহু উদাহরণ দেয়া যায়। অন্যদিকে আমাদের পূর্বসূরী ওলামায়ে কেরামের মতভেদের কারণে উম্মাহর উপর কোনো খারাপ প্রভাব পড়েনি। তাদের সামনে অনৈক্য ও বিভেদ

৪৪. 'মা লা ইয়াজুযু ফীহিল খেলাফ' গ্রন্থের ৮ম অধ্যায়, পৃঃ ৬৫-৭২ দ্রষ্টব্য। তাতে এ জাতীয় কিছু উদাহরণ আছে, যা জামেয়া আযহারের ওলামায়ে কেরাম থেকে সংঘটিত হয়েছে।

৪৫ সৃষ্টি না করার জন্য কোরআনের আয়াতগুলো পরিষ্কার ছিল। কিন্তু পরবর্তী যুগের ওলামায়ে কেরামের (মোতাআখিরীন) প্রেক্ষাপট তা নয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সহজ-সরল রাস্তার দিকে পথ প্রদর্শন করুন।

আফসোস! যদি তাদের মতভেদ শুধু প্রয়োজন ও বাধ্য হওয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকত এবং অন্য যে সব জাতির কাছে দাওয়াত পৌছানো দরকার সে পর্যন্ত যদি তা বিস্তার লাভ না করত, তাহলে কতইনা ভাল হত! অথচ তা বিভিন্ন দেশের কাফেরদের পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে। যে কারণে তারা আল্লাহর এই দীনে দলে দলে প্রবেশ করতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মোহাম্মদ আল গাযালী তাঁর 'জলাম মিনাল গারব' বই-এর পৃষ্ঠা নং ২০০-তে লিখেছেন: আমেরিকার প্রিনস্টোন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে একজন প্রশ্নকারী প্রশ্ন করেন যে, প্রাচ্যবিদ ও ইসলামবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই বলে থাকেন, মুসলমানরা বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে কোন্ শিক্ষা তুলে ধরছে এবং তারা কোন্ ইসলামের দিকে দাওয়াত দিচ্ছে? সেটা কি সুন্নীদের শিক্ষা, না শিয়াদের শিক্ষা? শিয়াদের মধ্যে তা ইমামিয়া সম্প্রদায়, না যায়েদিয়া সম্প্রদায়ের শিক্ষা? আবার তারা সবাই তাতেও শতধাবিভক্ত। তাদের মধ্যে একদল অগ্রসর চিন্তা-ভাবনা করে আর অন্যদল করে সেকেলে ও প্রাচীন চিন্তা-ভাবনা। মূল কথা, ইসলামের দাওয়াতদানকারীরা নিজেরা যেমন বিভ্রান্ত, তেমনি অন্যান্য লোকদেরকেও ইসলামের দাওয়াত দিয়ে বিভ্রান্ত করে তোলে।

আল্লামা সুলতান আল-মাসুমী তাঁর

هَدِيَةُ السُّلْطَانِ إِلَى مُسْلِمِي بِلَادِ جَابَانِ -

গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন, টোকিও এবং ওসাকার জাপানী নাগরিকেরা প্রশ্ন করেছেন, দীন ইসলামের তাৎপর্য কি? মাযহাবের মানে কি? কোনো লোক মুসলমান হলে, তার জন্য কি চার মাযহাবের এক মাযহাব অনুসরণ করা জরুরী, না জরুরী নয়?

সেখানে এনিয়ে বিরাট মতভেদ দেখা দিয়েছে এবং ঝগড়া-ঝাটিও হয়ে গেছে। যখন কিছু জাপানী লোক ইসলাম কবুল করতে প্রস্তুত হয়েছে, তখন তারা টোকিও ইসলামী সংস্থার কাছে যান। সেখানে কিছু সংখ্যক ভারতীয় মুসলমান তাদেরকে হানাফী মাযহাব অনুসরণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়ার জাভার কিছু মুসলমান তাদেরকে শাফেঈ মাযহাব অনুসরণের কথা বলেন। ইসলাম গ্রহণে জাপানী লোকেরা এসকল কথা শুনে ইসলাম কবুলের ব্যাপারে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে যান এবং মাযহাব তাদের ইসলাম গ্রহণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

৩.কেউ কেউ মনে করে, আমি লোকদের হাদীস অনুসরণ এবং ইমামদের হাদীস বিরোধী বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করার আহ্বানের মাধ্যমে তাদের ইজতিহাদ ও বক্তব্য সম্পূর্ণ ত্যাগ করার আমন্ত্রণ জানিয়েছি।

এই অভিযোগের উত্তরে আমি বলবো, এই অভিযোগ মোটেই সত্য নয়, বরং তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বাতিল। আমার আগের বক্তব্যই এ কথার উত্তম প্রমাণ। আমি যা ত্যাগ করার আহ্বান জানাই তা হচ্ছে মাযহাবকে দীন না বানানো এবং তাকে কোরআন ও সুন্নাহর স্থলাভিষিক্ত না করা। এমন যেন না করা হয় যে, বিরোধ দেখা দিলে, কিংবা নতুন মাসআলা তৈরি অথবা জরুরী মাসআলার প্রয়োজনে কোরআন ও হাদীসকে বাদ দিয়ে মাযহাবের দিকে প্রত্যাবর্তন করা হয়। বর্তমান যুগের ফকীহরা এরূপ করছেন এবং ব্যক্তিগত বিষয়, তালাক ও বিয়ে সহ বিভিন্ন বিষয়ে তারা নতুন নতুন মাসআলা তৈরি করছেন। এজন্য তারা ভুল-শুদ্ধ বুঝার জন্য কোরআন ও হাদীসের শরণাপন্ন হচ্ছেন না। তারা তথাকথিত 'মতভেদ রহমত' এই তত্ত্ব কিংবা অনুমতি (রোখসত), সহজ ও সুবিধার উপর ভিত্তি করে মাসআলা প্রণয়ন করেন। এ প্রসঙ্গে সোলাইমান আত্মাইমী কতই না সুন্দর বলেছেন:

'তুমি যদি সকল আলেমের রোখসত-অনুমতিকে গ্রহণ কর, তাহলে তোমার মধ্যে সকল মন্দের সমাহার ঘটবে।(ইবনে আবদুল বার, ২য় খন্ড, ৯১-৯২ পৃঃ।)

তিনি আরো বলেন, 'এটা ইজমা এবং এ ব্যাপারে কোনো মতভেদ আছে বলে আমার জানা নেই।'

ইমামদের কথার দিকে প্রত্যাবর্তন করা, সেগুলোর সাহায্য নেয়া এবং উপকৃত হওয়ার ব্যাপারে কোনো বাধা নেই। বিশেষ করে যে সব বিষয়ে কোরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট কোনো বক্তব্য নেই, সে সব ক্ষেত্রে তাঁদের বক্তব্য থেকে উপকৃত হওয়া যাবে। এমন কি অধিকতর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের জন্য কোরআন-হাদীসের বিভিন্ন বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানতে হবে। এতোটুকুকে আমরা অস্বীকার করি না। বরং তা করার জন্য আমরাও বলি এবং উৎসাহিত করি। এইভাবে ফায়দা গ্রহণ করা কাম্যও বটে। বিশেষ করে যারা কোরআন ও হাদীস মোতাবেক চলতে চায়, তারা অবশ্যই তাদের থেকে ফায়দা গ্রহণ করবে।

আল্লামা ইবনে আবদুল বার (রঃ) উক্ত গ্রন্থে বলেছেনঃ (২য় খন্ড, ১৭২ পৃঃ) 'প্রিয় ভাই, আপনার কর্তব্য হল মূলনীতির হেফাযত করা। জেনে রাখুন, যে ব্যক্তি হাদীস এবং কোরআনে বর্ণিত বিধানগলোর হেফাযত করে এবং ফকীহদের বক্তব্যের প্রতি নজর দেয়, সে এর মাধ্যমে নিজ ইজতিহাদকে সাহায্য করে। সে বিনা বিচার-বিশ্লেষণে কারোর আনুগত্য করে না এবং ইমামরা জ্ঞান-গবেষণা করে যা গ্রহণ করেছেন শুধু তার উপর সন্তুষ্ট থাকেন না। সে বুঝ-বিবেচনার ব্যাপারে তাদেরকে অনুসরণ করে, তাদের প্রচেষ্টা ও প্রদত্ত তথ্যের জন্য তাদের শুকরিয়া জ্ঞাপন করে, তাদের সিদ্ধান্ত সঠিক হলে সে জন্য তাদেরকে ধন্যবাদ জানায়। অবশ্য তাদের অধিকাংশ বক্তব্যই সঠিক। সে তাদের দোষ-ত্রুটি গোপন করে না, যেমন তারাও নিজেদের দোষ-ত্রুটি গোপন করে যাননি। এজাতীয় ব্যক্তিই আমাদের পূর্বসূরীদের মতো সঠিক অনুসারী, যথার্থ সহযোগী এবং রসূলুল্লাহর (সঃ) হাদীস ও সহাবায়ে কেরামের চরিত্রের আনুগত্যকারী। যে ব্যক্তি বিচার-বিশ্লেষণ করে না, হাদীসকে নিজ রায়ের দ্বারা প্রতিরোধ করে এবং নিজের পান্ডিত্যের কাছে থেকে পরাভূত করে, সে ব্যক্তি গোমরাহ ও অন্যদেরকে গোমরাহকারী। আর যে ব্যক্তি জ্ঞান ব্যতীত ফতোয়া দেয়, সে কঠিনতম অন্ধ ও অধিকতর গোমরাহ।'

৪. কোনো কোনো অনুসারীর (মোকাল্লেদের) কাছে এমন এক ধারণা চালু আছে, যা তাদেরকে সেই হাদীস অনুসরণের বাধা দেয়, যে হাদীসের বিপরীতে তাদের মাযহাবের মাসআলা রয়েছে। তাদের ধারণা হল, ঐ ক্ষেত্রে হাদীসের অনুসরণ মাযহাবের ইমামের ত্রুটির প্রমাণ। তাদের কাছে ঐ ত্রুটি অর্থ ইমামের সমালোচনা ও দোষ ধরা। যা একজন সাধারণ মুসলমানের ক্ষেত্রেও জায়েয নেই, তা কিভাবে তাদের মাযহাবের ইমামদের ক্ষেত্রে জায়েয হতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, এই ধারণা বাতিল। কেননা, এই ধারণার কারণে হাদীস থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া হয়। নচেত কি করে একজন বিবেকমান মুসলমান এ রকম বলতে পারে? স্বয়ং রসূলুল্লাহ (স) যেখানে বলেছেন:

إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ فَأَصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ وَإِذَا حَكَمَ

فَاجْتَهَدَ فَأَخْطَأَ فَلَهُ أَجْرٌ وَاحِدٌ (البخاري والمسلم)

অর্থ: 'বিচারক বিচারের পূর্বে ইজতিহাদ করে সঠিক রায়ে পৌঁছতে পারলে দু'টি বিনিময় পাবে। আর যদি ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছে, তাহলেও একটি বিনিময় পাবে। '(বোখারী ও মুসলিম।)

এ হাদীস ঐ জাতীয় অর্থকে নাকচ করে দেয় এবং একথা পরিষ্কার করে বলে দেয় যে, 'অমুকে ভুল করেছে' শরীয়তে এই কথার অর্থ হল 'অমুক একটি মাত্র বিনিময় লাভ করেছে।' যদি তিনি ভুল করেও একটি 'পুরস্কার পান, তাহলে কি করে তাঁকে সমালোচনা করা হল ও তাঁর দোষ ধরা হল? এ জাতীয় ধারণা ভ্রান্ত। তাই এথেকে মুক্ত হওয়া দরকার। নচেত এটাই মুসলমানদের জন্য সমালোচনা ও দোষের কারণ হবে। আমরা জানি যে, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈ, তাবয়ে তাবেঈ' ও মোজতাহিদ ইমামগণ একে অপরের ভুল ধরতেন এবং একে অপরের প্রশ্নের জওয়াব দিতেন। (ইমাম মোযানী, পৃঃ ৩৬ এবং হাফেয ইবনে রজব, পৃঃ ২৯।)

এখন কি বুদ্ধিমান কোনো ব্যক্তি বলবেন যে, তারা একে অপরের সাথে বিদ্বেষ পোষণ করেছেন? সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, রসূলুল্লাহ (সঃ) এক ব্যক্তির স্বপ্নের ব্যাখ্যার বিষয়ে হযরত আবু বকরের ভুল ধরেছিলেন। তিনি তাঁকে বলেন,

أَصْبَتَ بَعْضًا وَاخْطَأْتَ بَعْضًا (بخاری ومسلم)

অর্থ: 'তুমি কিছু অংশের সঠিক ব্যাখ্যা দিয়েছ আর কিছু অংশের ভুল ব্যাখ্যা করেছ।' তাই বলে কি রসূলুল্লাহ (সঃ) আবু বকরের সমালোচনা করেছেন বলতে হবে? কি আশ্চর্য ব্যাখ্যা তাদের? হাদীসের খেলাপ করলেও সম্মান দেখানোর নামে ভুলের উপর তাদের অনুসরণ করতে হবে?

ঐ ব্যক্তিরা ভুলে গেছে, তারা ঐ ধারণার কারণে যে মন্দ থেকে বাঁচতে চেয়েছিল, সে মন্দের মধ্যেই নিক্ষিপ্ত হয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি তাদেরকে প্রশ্ন করে, অনুসরণ যদি অনুসৃত ব্যক্তির সম্মানের প্রতীক হয় এবং তার বিরোধিতা যদি তার অসম্মান হয়, তাহলে তোমরা কি করে নিজেদের জন্য রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদীসের বিরোধিতাকে জায়েয এবং তাঁর অনুসরণ ত্যাগ করাকে বৈধ করলে? আনুগত্যের পরিবর্তনটা হল রসূল (সঃ) থেকে মাযহাবের ইমামের দিকে-যিনি মাসুম বা নিষ্পাপ নন। পক্ষান্তরে রসূল নিষ্পাপ। তাঁকে অসম্মান করা কি কুফরী নয়? ইমামের বিরোধিতা যদি অসম্মান হয়, তাহলে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরোধিতা তো আরো বড়ো ধরনের অসম্মান হওয়ার কথা। শুধু তাই নয়, তা কুফরীও বটে। তারা এই প্রশ্নের কোনো জওয়াব দিতে পারবে না। তারা শুধু এইটুকু বলবে যে, আমরা ইসলামের প্রতি গভীর আস্থার কারণে সুন্নাহ ত্যাগ করেছি এবং তিনি হাদীস বা সুন্নাহ সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত আছেন।

আমি এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত একটি জবাব দিতে চাই। আমার কথা হল, অনেক ইমাম আছেন যারা তোমাদের চাইতে অধিকতর হাদীস জানেন। যদি তোমাদের মাযহাবের বিপরীত কোন হাদীস তারা বলেন এবং ঐ সকল ইমামদের মধ্য থেকে যে কোন একজন তা গ্রহণও করেছেন তখন তা গ্রহণ করা জরুরী। কেননা, তোমাদের কথা এখানে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। হাদীসের অনুসারী ইমামের আনুগত্য হাদীস পরিত্যগকারী ইমামের চাইতে শ্রেষ্ঠ। এটা খুবই পরিষ্কার বিষয়।

আমি এখন বলতে পারি, আমার এই পুস্তকটি রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নামায সম্পর্কে সহীহ ও বিশুদ্ধ হাদীসের একটি সংকলন ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই তা ত্যাগ করার পক্ষে কোন ওযর চলে না। কেননা, তাতে এমন কিছু নেই যা ত্যাগ করার জন্য ওলামায়ে কেরামের মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর আল্লাহ তাদেরকে এ জাতীয় ঐক্য থেকে রক্ষা করুন। এ বইতে এমন কোনো মাসআলা নেই, যা কোন না কোনো মাযহাব গ্রহণ করেননি। যে বা যারা ঐ বিষয়ে বলেননি, তারা নির্দোষ এবং একটা পুরস্কার দ্বারা পুরস্কৃত। তখন তাদের কাছে ঐ সম্পর্কে কোনো হাদীস পৌঁছেনি অথবা এমনভাবে পৌঁছেছে, যা দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়নি কিংবা ওলামায়ে কেরামের কাছে স্বীকৃত কোনো ওযরের কারণে তারা তা গ্রহণ করতে পারেননি। তবে পরবর্তীতে যে সকল অনুসারীর কাছে তা পৌঁছেছে, তাদের কোনো ওযর গ্রহণযোগ্য নয়, বরং তাদের কর্তব্য হল হাদীস মেনে চলা। এ ভূমিকার এটাই উদ্দেশ্য।

আল্লাহ বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ أَمَنُوا اسْتَجِيبُو اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِهِ وَأَنَّهُ إِلَيْهِ تحْشَرُونَ - (الانفال - (٢٤)

অর্থঃ "হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের ডাকে সাড়া দাও। যখন রসূল তোমাদেরকে এমন জিনিসের দিকে ডাকে যা জীবন দান করবে। তোমরা জেনে রাখ, আল্লাহ বান্দাহ ও তার অন্তরের মাঝে অন্তরায় সৃষ্টি করেন এবং তার দিকেই তোমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে।" (সূরা আনফালঃ ২৪)

আল্লাহ সত্য বলেন এবং তিনি হেদায়াত দেন। তিনিই উত্তম পৃষ্ঠপোষক ও সাহায্যকারী। (মোহাম্মদ নাসেরুদ্দিন আলবানী, দামেস্ক ২৮/১০/১৩৮৯ হিঃ)


ইমামদের হাদীস বিরোধী বক্তব্যে ছাত্রদের ভূমিকা

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

ইমামদের হাদীস বিরোধী বক্তব্যে ছাত্রদের ভূমিকা

বিশুদ্ধ হাদীস অনুসরণের উদ্দেশ্যে অনেক ছাত্র নিজ ইমামদের সকল কথা গ্রহণ করেননি। তারা ইমামদের সহীহ হাদীস পরিপন্থী বহু বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন। এমন কি হানাফী মাযহাবের দুই ইমাম মোহাম্মদ ও আবু ইউসুফ নিজ ওস্তাদ আবু হানীফা (রঃ)-এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মতের ক্ষেত্রে ভিন্ন মত প্রদান করেছেন।

তারা তা বর্ণনা করার উদ্দেশ্যে বহু শাখা-প্রশাখা মাসআলা আলোচনা করেছেন। ৩৩ খ

৩১ গ. আমি বলি শুধু ক্ষমাপ্রাপ্তই নয় বরং পুরস্কৃতও। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ فَاصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ وَإِذَا حَكَمْ فَاجْتَهَدَ فَأَخْطَأَ فَلَهُ أَجْرٌ وَاحِدٌ .

অর্থঃ শাসক রায় দেয়ার সময় যদি ইজতিহাদ করে এবং সঠিক রায় দেয় তাহলে তার সওয়াব দ্বিগুণ হবে। আর যদি ইজতিহাদ করা সত্ত্বেও ভুল রায় দেয় তথাপি এক গুণ সওয়াব পাবে। (বোখারী ও মুসলিম)

৩২. ঈকাযুল হিসাম পৃঃ ৯৩।

৩৩. ক. আল-ফোলানী, পৃঃ ৯৯।

৩৩. খ. তিনি ইমাম শাফেয়ী'র আল-উম্মু কিতাবের টীকায় মুদ্রিত শাফেয়ী' ফেকহের প্রথম সংক্ষিপ্ত কিতাবে বলেছেন, আমি মোহাম্মদ বিন ইদরিস শাফেয়ী'র অবগতি সাপেক্ষে এই সংক্ষিপ্ত ফেকাহ রচনা করেছি। তাঁর এই কথার অর্থ হল শাফেয়ী (রঃ) তাঁর ইচ্ছাকে অনুমোদন করেছেন এবং তিনি অন্যের অন্ধ অনুসরণ করতে নিষেধ করেছেন যাতে করে প্রত্যেকেই নিজের দীনের প্রতি লক্ষ্য রাখে এবং নিজের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করে।

শাফেঈ মাযহাবের ইমাম মোযানীসহ অন্যান্য অনুসারীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। (আল-হাশিয়া-ইবনু আবেদীন, ১ম খন্ড, ৬২ পৃঃ। লক্ষ্মবী আন-নাফে' আল কবীর গ্রন্থের ৯৩ পৃঃ এটাকে ইমাম গাযযালীর বক্তব্য বলে উল্লেখ করেছেন।)

আমরা এই বিষয়ে আরো উদাহরণ দিলে আলোচনা দীর্ঘায়িত হবে এবং বিষয়বস্তুকে সংক্ষিপ্ত করার অভীষ্ট লক্ষ্য থেকে বিচ্যুতি ঘটবে। এজন্য আমরা মাত্র দু'টি উদাহরণ দিয়ে এ বিষয়ে আলোচনা শেষ করবো।

১. ইমাম মোহাম্মদ তাঁর মোআত্তা গ্রন্থের ১৫৮ পৃষ্ঠায় বলেছেন: আবু হানীফা (রঃ) এস্তেস্কার (বৃষ্টি প্রার্থনায়) নামায পড়ার পক্ষে মত প্রকাশ করেননি। কিন্তু আমাদের মত হল, ইমাম লোকদের নিয়ে জামাতে দুই রাক'আত নামায পড়বেন, তারপর দোআ করবেন ও নিজ চাদর উল্টিয়ে পরবেন।(৩৫. তিনি এ গ্রন্থে ২০টি মাসআলায় ইমাম আবু হানীফার সাথে দ্বিমতের কথা উল্লেখ-করেছেন। সেগুলো তাঁর গ্রন্থের নিম্নোক্ত পৃষ্ঠায় রয়েছে: ৪২, ৪৪, ১০৩, ১২০, ১৫৮, ১৬৯, ১৭২, ১৭৩, ২২৮, ২৩০, ২৪০, ২৪৪, ২৭৪, ২৭৫, ২৮৪, ৩১৪, ৩৩১, ৩৩৮, ৩৫৫, ৩৫৬।)

২. ইমাম মোহাম্মদের সাথী এবং ইমাম আবু ইউসুফের ছাত্র ইসাম বিন ইউসুফ আল-বালখী বহু বিষয়ে ইমাম আবু হানীফা (রঃ)-এর বিপরীত ফতোয়া দিয়েছেন। (আল ফাওয়ায়েদ আল বাহিয়‍্যাহ ফী তারাজিমিল হানাফিয়‍্যা: পৃঃ ১১৬।)

প্রথমে ইসামের দলীল জানা ছিল না। পরবর্তীতে দলীল জেনে তিনি বিপরীত ফতোয়া দিয়েছেন। (আল-বাহরুর রায়েক, ষষ্ঠ খন্ড, ৯৩ পৃঃ। রাসমুল মুফতী, ১ম খন্ড, পৃঃ ২৮।)

তাই তিনি রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু থেকে উঠার সময় দুই হাত উপরে উঠাতেন। (আল ফাওয়ায়েদ, পৃঃ ১১৬। এরপর তিনি মন্তব্য করেন, মযবুত দলীলের ভিত্তিতে ইমামের তাকলীদ ত্যাগ করলেও জাহেল লোকেরা সমালোচন করে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আল্লাহর কাছে রইল।)

এমনটি করার কথা রসূলুল্লাহ (সঃ) থেকে বহুসংখ্যক বর্ণনাকারী দ্বারা বিভিন্ন যুগে বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ এটি হাদীসে মোতাওয়াতের। ঐ হাদীসের উপর আমল করতে তার কোনো অসুবিধে হয়নি। যদিও তাঁর তিনজন ইমামই এর বিপরীত মত পোষণ করেছেন। সকল মুসলমানের উচিত হল চার ইমামসহ অন্যদের ব্যাপারে ঐ রকম সাক্ষ্য দান করা।

সারকথা: আমি আশা করবো মাযহাবের কোনো অন্ধ অনুসারী যেন এই বইয়ের বিষয়বস্তু সম্পর্কে সমালোচনা না করেন এবং তার নিজ মাযহাবের বিরোধী বলে এ বইতে বর্ণিত রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদীস থেকে উপকৃত 

হওয়ার চেষ্টা ত্যাগ না করেন। আমি আশা করবো তারা হাদীসের উপর আমলের জরুরত স্মরণ রাখবেন। মত-পার্থক্যের সময় আমাদেরকে হাদীসের দিকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

আল্লাহ বলেছেন: "তোমার রবের কসম, তারা কখনও ঈমানদার হবে না

যে পর্যন্ত না তোমাকে নিজেদের ঝগড়া-বিবাদের ফয়সালায় সালিস মানে, পরে তোমার ফয়সালার বিষয়ে নিজেদের অন্তরে কোনো দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সন্তুষ্টি সহকারে তোমার ফয়সালা মেনে না নেয়।" (সূরা নিসা: ৬৫)

আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আমাদের সবাইকে ঐ সকল লোকের অন্তর্ভুক্ত করেন, যাদের বিষয়ে আল্লাহ বলেছেন,

إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دَعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَنْ يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَأَوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ .

অর্থঃ "মুসলমানদেরকে যখন কোন বিষয়ে ফয়সালার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রসূলের দিকে আহ্বান করা হয়, তখন তো তাদের কথা এই হয় যে, আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম এবং তারাই সফলকাম।" (সূরা নূর: ৫১)

হাদীস অনুসরণের বিষয়ে ইমাম আবু হানীফা (রঃ), মালেক বিন আনাস (রঃ),ইমাম শাফেঈ (রঃ), ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রঃ) এর মতামত ও তাদের হাদীস বিরোধী বক্তব্য প্রত্যাখ্যান:

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

হাদীস অনুসরণের বিষয়ে ইমামদের মতামত ও তাদের হাদীস বিরোধী বক্তব্য প্রত্যাখ্যান:

এ বিষয়ে আমরা কিছু আলোচনাকে উপকারী মনে করি। সম্ভবত এর মধ্যে অনুসারীদের জন্য উপদেশ ও নসীহত থাকতে পারে। বরং যারা অন্ধ অনুসরণ করে এবং মাযহাবকে ও মাযহাবের বক্তব্যকে আসমানী ওহীর মতো মনে করে, তাদের জন্য অবশ্যই উপকারী হবে। আল্লাহ বলেছেন:

اتَّبِعُوا مَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ مِّنْ رَّبِّكُمْ - وَلَا تَتَّبِعُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ قَلِيلًا مَّا تَذَكَّرُونَ -

অর্থঃ "তোমরা তোমাদের প্রভুর কাছ থেকে অবর্তীণ কিতাবের অনুসরণ করো এবং আল্লাহ ছাড়া আর কোনো বন্ধুর অনুসরণ করো না। তোমরা খুব সামান্যই উপদেশ মেনে চল।" -(সূরা আরাফ: ৩)

১. ইমাম আবু হানীফা (রঃ)

প্রথমে ইমাম আবু হানীফা (রঃ) সম্পর্কে আলোচনা করা যাক। তাঁর সাথী-সঙ্গীরা তাঁর বহু কথা বর্ণনা করেছেন। সেগুলোর মূল সুর একটা। সেটা হচ্ছে, হাদীস আঁকড়ে ধরা ওয়াজিব এবং ইমামদের যে সকল রায় হাদীস বিরোধী তা প্রত্যাখ্যান করা জরুরী। তিনি বলেছেন:

১. হাদীস সহীহ হলে সেটাই আমার মাযহাব।'৯

৯. ইবনে আবেদীন 'আল-হাশিয়া' কিতাবের ১ম খন্ডের ৬৩ পৃষ্ঠা এবং তার 'রাসমুল মুফতী' কিতাবের ১ম খন্ডের ৪র্থ পৃষ্ঠায় একথা উল্লেখ করেছেন। ইবনে আবেদীন ইবনে হাম্মামের 'শারহুল হেদায়াহ' গ্রন্থ থেকে উল্লেখ করেছেন: 'মাযহাবের বিরুদ্ধে বিশুদ্ধ হাদীস পাওয়া গেলে এর ওপরই আমল করতে হবে এবং সেটাই তাঁর মাযহাব। এর ফলে সে হানাফী মাযহাবের অনুসারী হওয়া থেকে বাদ যাবে না।' আমি বলবো, এটা তাদের সর্বোচ্চ তাকওয়া ও জ্ঞানের লক্ষণ। তারা ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন যে, তারা সকল হাদীসের ব্যাপারে অবগত ছিলেন না। ইমাম শাফেঈ (রঃ)-ও অনুরূপ বলে গেছেন। তাদের কোনো মাসআলা সহীহ হাদীস বিরোধী হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আমাদেরকে সহীহ হাদীস মতো চলতে হবে।

২. আমরা কোথা থেকে মাসআলা গ্রহণ করেছি, তা জানার আগ পর্যন্ত -আমাদের বক্তব্য গ্রহণ করা কারোর জন্য জায়েয নয়। 

ইবনু আবদিল বার, ১৪৫81

١- الْإِنْتِقَاءِ فِي فَضَائِلِ الثَّلَاثَةِ الْأَئِمَّةِ الْفُقَهَاءِ

ইবনুল কাইয়েম, ২য় খন্ড, ৩০৯ পৃঃ।

- إِعْلَامُ الْمُوْقِعِينَ .

ইবনু আবেদীন, ষষ্ঠ খন্ড, ২৯৩ পৃঃ।

الْحَاشِيَةُ عَلَى الْبَحْرِ الرَّائِقِ .

ইবনু আবেদীন, ষষ্ঠ খন্ড, ২৯-৩২ পৃঃ।

رَسُمُ الْمُفْنِي

আশ-শা'রানী, ১ম খন্ড, ৫৫ পৃঃ ইত্যাদি গ্রন্থ।

ه - الْمِيزَانُ .

আরেক বর্ণনায় ইমাম আবু হানীফার এই বক্তব্য এসেছে, যে ব্যক্তি আমার দলীল-প্রমাণ জানে না, তার জন্য আমার বক্তব্য দিয়ে ফতোয়া দেওয়া হারাম।'

অন্য এক বর্ণনায় তাঁর আরো একটি কথা যোগ করে বলা হয়েছে, 'আমরা মানুষ। আজ যে কথা বলি কাল সে কথা প্রত্যাহার করি।'

আরেক বর্ণনায় এসেছে, 'হে ইয়াকুব (আবু ইউসুফ), তোমার জন্য আফসোস! আমার কাছ থেকে যা শোন সব কিছু লিখ না। কেননা, আজ আমি কোনো বিষয়ে একটা মত পোষণ করি আগামীকাল তা ত্যাগ করি আর আগামীকাল যে মত পোষণ করি পরশু তা ত্যাগ করি। (আমি বলি, শ্রদ্ধেয় ইমাম অধিকাংশ মাসআলায় কেয়াস করেছেন। যখনই তিনি অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী অন্য কেয়াস বা হাদীস পেয়েছেন, তখনই আগের কেয়াস ত্যাগ করে পরবর্তীটার উপর আমল করেছেন। এব্যাপারে শা'রানী মীযানের ১ম খন্ডের ৬২ পৃষ্ঠায় যা বলেছেন, সংক্ষেপে তা হচ্ছেঃ)

আমি বলবো, যারা দলীল-প্রমাণ জানে না, তাদের ব্যাপারে যদি এটাই ইমামের বক্তব্য হয়, তাহলে তাদের ব্যাপারে আফসোস! যারা জানেন যে, দলীল এর বিপরীত এবং তদুপরি তারা দলীল বিরোধী ফাতোয়া দেন। এই একটি বক্তব্যই অন্ধ তাকলীদ (অনুসরণ) ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। সে জন্য কোন কোন হানাফী অন্ধ মোকাল্লেদ এটাকে ইমাম আবু হানীফার বক্তব্য হওয়াকে অস্বীকার করেন।

ইমাম আবু হানীফা (রঃ)-এর ব্যাপারে আমার সহ সকল ইনসাফকারীর বিশ্বাস হল, হাদীসসহ ইসলামী শরীআ লিপিবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে হাদীসের হাফেযগণ যখন বিভিন্ন দেশের শহর-বন্দর ও গ্রামে ছড়িয়ে পড়েন এবং নিজেদের মিশনে সাফল্য লাভ করেন, তখন পর্যন্ত যদি তিনি জীবিত থাকতেন, তাহলে তিনি তাই গ্রহণ করতেন এবং তিনি যে সকল কেয়াস' করেছেন তা ত্যাগ করতেন এবং অন্যান্য মাযহাবের মত তাঁর মাযহাবেও কেয়াস হ্রাস পেত। তাঁর আমলে তাবেঈ এবং তাবয়ে তাবেঈগণ বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে

৩. আমার কোনো কথা বা বক্তব্য যদি কোরআন ও হাদীসের বিপরীত হয়, তাহলে আমার বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করো। (আল ইকায-আল ফোলানীঃ পূঃ ৫০। তিনি এটাকে ইমাম মোহাম্মদের বক্তব্য হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, একথা মোজতাহিদের চাইতে মোকাল্লিদের জন্য বেশী প্রযোজ্য। আমি বলি, এই কথার ওপর ভিত্তি করে শা'রানী মীযান গ্রন্থের ১ম খন্ডের ২৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেনঃ)

২. মালেক বিন আনাস (রঃ)

১. ইমাম মালেক (রঃ) বলেছেন: আমি মানুষ, ভুল-শুদ্ধ দু'টোই করি।

আমার রায় দেখ। যা কোরআন ও সুন্নাহর মোতাবেক তা গ্রহণ কর এবং যা তার বিপরীত তা প্রত্যাখ্যান কর। (আল-জামে'-ইবনু আবদিল বার, ২য় খন্ড, ৩২ পৃঃ। উসুলুল আহকাম-ইবনে হাযম, ষষ্ঠ খন্ড, ১৪৯ পৃঃ। আল-ফোলানীঃ ৭২ পৃঃ।)

থাকার কারণে প্রয়োজনের ভিত্তিতে অন্যান্য মাযহাবের তুলনায় কেয়াসের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। কেননা, ঐ সকল মাসআলায় তখন হাদীস পাওয়া যায়নি। অন্যান্য মাযহাবের ইমামদের অবস্থা এর ব্যতিক্রম। তাদের আমলে হাদীসের হাফেযগণ শহর ও গ্রামে ছড়িয়ে পড়েন এবং হাদীস সংগ্রহ করে তা লিপিবদ্ধ করেন। ফলে, অন্যান্য মাযহাবের কেয়াসের সংখ্যা হ্রাস পায়।

এ বিষয়ে আল্লামা আবুল হাসানাত তাঁর 'আন-নাফে' আল-কবীর' গ্রন্থের ১৩৫ পৃষ্ঠায় বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আগ্রহী পাঠকরা তা পড়ে দেখতে পারেন।

আমি বলি, যে সকল মাসআলায় ইমাম আবু হানীফা (রঃ) অনিচ্ছাসত্ত্বে সহীহ হাদীসের বিপরীত মতপ্রকাশ করেছেন তা গ্রহণযোগ্য ওযর। কেননা, আল্লাহ কাউকে তার সামর্থের বাইরের বিষয়ে দায়ী করবেন না। সে জন্য তাঁকে বিদ্রুপ করা যাবে না। অনেক জাহেল-মূর্খ লোক অনুরূপ করে থাকে। বরং তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ওয়াজিব। কেননা, তিনি মুসলমানদের অন্যতম ইমাম। তাদের ওসীলায় এই দীন সংরক্ষিত আছে এবং আমাদের কাছে পৌঁছেছে। তাঁরা ভুল-শুদ্ধ যাই করুন না কেন, এর বিনিময়ে পুরস্কার পাবেন। তাঁর কোন অনুসারীর জন্যে সহীহ হাদীস বিরোধী তাঁর মাসআলা মানা জরুরী নয়।

যদি কেউ বলে, আমার ইমামের মৃত্যুর পর সহীহ হাদীস পেলে তা দিয়ে আমি কি করবো? এর জওয়াব হচ্ছে, তার উচিত সহীহ হাদীস মোতাবেক আমল করা। কেননা, ইমাম জীবিত থাকলে তাকে তাই আদেশ করতেন। সকল ইমাম শরীয়তের অনুসারী। কেউ যদি বলে, যেহেতু ইমাম গ্রহণ করেননি সেজন্য আমি সহীহ হাদীস গ্রহণ করবো না এটাই অধিকাংশ মোকাল্লিদের মনোভাব-তারা বিরাট কল্যাণ থেকে বঞ্চিত। তাদের উচিত, ইমামের উপদেশ অনুযায়ী সহীহ হাদীসের উপর আমল করা। আমাদের বিশ্বাস, ইমামরা জীবিত থাকলে তারা সহীহ হাদীস মেনে চলতেন এবং নিজেদের কেয়াস ত্যাগ করতেন।

২. রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পর এমন কোনো ব্যক্তি নেই যার কথা ও কাজ সমালোচনার উর্ধে। একমাত্র রসূলুল্লাহ (সঃ)-ই সমালোচনার উর্ধে। (ইরশাদুস সালেক: ইবনু আবদিল হাদী, ১ম খন্ডঃ ২২৭ পৃঃ। আল-জামে'-ইবনু আবদিল বার, ২য় খন্ড, ৯১ পৃঃ। উসুলুল আহকাম-ইবনু হাযম, ষষ্ঠ খন্ড: ১৪৫-১৭৯ পৃষ্ঠা। আল-ফাতাওয়া-আসাবকী, ১ম খন্ড: ১৪৮ পৃঃ।)

৩. ইবনু ওহাব বলেছেন, আমি ইমাম মালেকের উযুর মধ্যে দুই পায়ের আঙ্গুল খেলাল করার বিষয়ে এক প্রশ্ন করতে শুনেছি। তিনি উত্তরে বলেন, লোকদের জন্য এটার প্রয়োজন নেই। ইবনু ওহাব বলেন, আমি মানুষ কমে গেলে তাঁকে নিরিবিলি পেয়ে জিজ্ঞেস করি, তাতো আমাদের জন্য সুন্নাহ। ইমাম মালেক বলেন, সেটা কি? আমি বললাম, আমরা লাইস বিন সা'দ, ইবনু লোহাইআ', আমর বিন হারেস, ইয়াযিদ বিন আমর আল-মাআফেরী, আবু অবাদুর রহমান আল-হাবালী এবং আল মোস্তাওরাদ বিন শাদ্দাদ আল কোরাশী-এই সূত্র পরস্পরা থেকে জানতে পেরেছি যে, শাদ্দাদ আল কোরাশী বলেন, আমি রসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কনিষ্ঠ আঙ্গুল দিয়ে দুই পায়ের আঙ্গুল খেলাল করতে দেখেছি। ইমাম মালেক বলেন, এটাতো সুন্দর (হাসান) হাদীস। আমি এখন ছাড়া আর কখনও এই হাদীসটি শুনিনি। তারপর যখনই তাঁকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে, তখনই তাঁকে পায়ের আঙ্গুল খেলাল করার আদেশ দিতে আমি শুনেছি। (১৫. মোকাদ্দামা আল জারাহ ওয়াত তা'দীল-ইবনু আবি হাতেম: ৩১-৩২ পৃঃ।)

৩. ইমাম শাফেঈ (রঃ)

এ বিষয়ে ইমাম শাফেঈ থেকে অনেক সুন্দর কথা বর্ণিত আছে এবং তাঁর অনুসারীরা তা সর্বাধিক আমল করেছে। (১৬. ইবনু হাযম বলেছেন: যে সকল ফকীহ তার অনুসারীদেরকে অন্ধ অনুসরণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন তাদের মধ্যে ইমাম শাফেঈ অন্যতম। তিনি তাকলীদ করতে একেবারেই নিষেধ করেছেন এবং পরবর্তী লোকদের যে কোন (আচার) বক্তব্যের সত্যতা যাঁচাই করে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন।)

তিনি বলেছেন:

১. তোমাদের কারোর কাছ থেকে যেন রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সুন্নাহ ছুটে না যায়। আমি যতো কিছুই বলে থাকি তা যদি রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদীসের পরিপন্থী হয়, তাহলে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কথাই আমার কথা। (১৭. হাকেম তা বর্ণনা করেছেন। তারীখে দিমাঙ্ক- ইবনে আসাকির। ইকায পৃঃ ১০০ এবং ইলামুল মোকেঈন, ২য় খন্ড, ৩৬৩-৩৬৪ পৃঃ।)

২. একথার উপর মুসলমানদের ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, যখনই কারোর সামনে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কোনো কথা প্রকাশ পায়, তখনই তার জন্যে অন্য কোনো লোকের কথার ভিত্তিতে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদীস ত্যাগ করা জায়েয নয়। (ইবনুল কাইয়েম, ২ খন্ড: ৩৬১ পৃঃ এবং আলফোলানী: ৬৮ পৃঃ।)

৩. তোমরা যদি আমার কিতাবে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সুন্নাহ বিরোধী, কোনো কিছু পাও, তাহলে আমার ঐ কথা ত্যাগ কর। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, তাহলে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঐ হাদীসকে অনুসরণ কর এবং অন্য কারো কথার প্রতি নজর দিও না। (আল-হারাওয়ায়ী জাম্মুল কালাম, ৩য় খন্ডঃ পৃষ্ঠা ১ ও ৪৬। আল ইহতিজাজ বিশ-শাফেঈ-খাতীব, ৮ম খন্ড, পৃঃ ২। ইবনু আসাকির খন্ড ১৫, পৃঃ ৯। আল-মাজমু আন-নববী-১ম খন্ড, ৬৩ পৃষ্ঠা। ইবনুল কায়েম-২য় খন্ডঃ ৩৬১ পৃঃ। আল-ফোলানী-পৃঃ, ১০০ এবং আল-হিলাইয়া-আবু নাঈম, ৯ম খন্ডঃ ১০৭ পৃঃ।)

৪. সহীহ ও বিশুদ্ধ হাদীসই আমার মাযহাব। (আল-মাজমু-আন-নববী। আশশারানী-১ম খন্ড, ৫৭ পৃঃ। তিনি এটাকে হাকেম এবং বায়হাকীর দিকে সম্বোধন করেছেন। আল ফোলানীঃ ১০৭ পৃঃ। শারানী বলেছেন, ইবনু হাযমের মতে, তিনি সহ অন্য ইমামদের কাছেও এটা সহীহ। ইমাম নববী যা বলেছেন তার সারসংক্ষেপ হল:)

৫. আপনারা হাদীস ও রিজাল শাস্ত্রে আমার চাইতে বেশী জ্ঞাত। সহীহ হাদীসের সন্ধান পেলে আমাকে জানাবেন। বর্ণনাকারী কুফা, বসরা ও সিরিয়ার যেই হোক না কেন, হাদীস সহীহ হলে আমি তার কাছে যাবো। (ইমাম আহমদকে সম্বোধন করে এ কথাগুলো তিনি বলেছেন। আদাবুশ শাফেঈ-ইবনু আবি হাতেমঃ পৃঃ ৯৪-৯৫। আল হিলইয়া-আবু নাঈম, ৯, খন্ড, পৃঃ ১০৬'। ইবনে আসাকির, ইবনু আবদিল বার, ইবনুল জাওযী এবং আল-হারওয়ায়ী নিজ নিজ কিতাবে তা উল্লেখ করেছেন।)

আমাদের সাথীরা হাই তোলার ব্যাপারে এই রকম আমল করেছেন। তারা রোগসহ বিভিন্ন ওযরের কারণে ইহরাম থেকে হালাল হওয়ার শর্তের বিষয়েও হাদীস অনুযায়ী আমল করেছেন। আমাদের পুরাতন সাথীরা কোনো মাসআলায় হাদীস পেলে এবং শাফেঈ মাযহাব এর বিপরীত থাকলে হাদীস অনুযায়ী আমল করতে বলতেন। যা হাদীস মোতাবেক তাই শাফেঈর মাযহাব। আসসাবকী বলেছেন, হাদীসের অনুসরণ করাই উত্তম। কেউ যদি নিজেকে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে উপস্থিত মনে করে, তাহলে তার পক্ষে কি হাদীস মোতাবেক আমল না করে উপায় আছে?

বায়হাকী বলেছেন, ইমাম শাফেঈ প্রায়ই হাদীসের উপর আমল করেছেন। তিনি হেজায, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং ইরাকের আলেমদেরকে জমা করে নির্দ্বিধায় সহীহ বর্ণনাগুলো গ্রহণ করেছেন।

৬. আমি যা বলেছি তার বিপরীত যদি রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কোনো হাদীস কারো নিকট বিদ্যমান থাকে, তাহলে আমি আমার জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থাতেই ঐ হাদীসের দিকে ফিরে আসবো। (হিলইয়া-আবু নাঈম, ৯ম খন্ড, ১০৭ পৃঃ। আল হারওয়ারী ৪৭ পৃঃ। ইবনুল কাইয়েম-ইলামুল মোকেয়ীন, ২য় খন্ড, পৃঃ ৩৬৩ এবং আল ফোলানী, পৃঃ ১০৪।)

৭. তোমরা যদি আমাকে কোনো কথা বলতে দেখ এবং রসূলুল্লাহ (সঃ) থেকে এর বিপরীত রিওয়ায়াত পাও, তাহলে জেনে রাখ আমার জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পেয়েছে। (আদাব-ইবনু আবি হাতেম, পৃঃ ৯৩। আল-আমালী, আবুল কাসেম সমরখন্দী। হিলইয়া-আবু নাঈম, ৯ম খন্ড, পৃঃ ১০৬ এবং ইবনু আসাকির।)

৮. আমি যা বলেছি তার বিপরীত রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর থেকে কোনো সহীহ বর্ণনা থাকলে নবীর হাদীসই উত্তম, তখন তোমরা আমার তাকলীদ করবে না। (ইবনু আবি হাতেম, আবু নাঈম ও ইবনু আসাকির।)

৯. রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদীসই আমার কথা-যদিও সেই হাদীস আমার কাছ থেকে শুনতে পাওনি। (ইবনু আবি হাতেম পৃঃ ৯৩-৯৪।)

৪ ইমাম আহমদ বিন হাম্বল

ইমামদের মধ্যে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল সর্বাধিক হাদীস সংগ্রহকারী ও হাদীসের উপর আমলকারী। তিনি শাখা-প্রশাখা মাসআলা ও রায়ের (ইজতিহাদের) উপর ভিত্তি করে কোন গ্রন্থ রচনা করাকে অপছন্দ করতেন। (আল মানাকেব-ইবনুল জাওযী, পৃঃ ১৯২।)

 তিনি বলেছেন:

১. তোমরা আমার, ইমাম মালেক, শাফেঈ আওযাঈ এবং সুফিয়ান ছাওরীর তাকলীদ (অন্ধ আনুগত্য) করবে না। বরং তারা যে উৎস থেকে গ্রহণ করেছেন তুমিও সেই উৎস থেকেই গ্রহণ কর। (২৭. আল-ফোলানী, পৃঃ ১১৩। ইবনুল কাইয়েম-ই'লাম, ২য় খন্ডঃ পৃঃ ৩০২।)

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, তুমি তোমার দীনের বিষয়ে তাদের কারো অন্ধ আনুগত্য কর না। রসূলুল্লাহ (সঃ) ও সাহাবায়ে কেরাম থেকে যা বর্ণিত হয়েছে তা গ্রহণ কর। তারপর তাবেঈদের কাছ থেকে গ্রহণ কর এবং এ বিষয়ে ব্যক্তির স্বাধীনতা রয়েছে। তিনি একবার বলেছেন: 'অনুসরণ বলতে বুঝায় রসূলুল্লাহ (সঃ) ও সাহবায়ে কেরাম থেকে যা বর্ণিত হয়েছে তার অনুসরণ

করা।' তারপর তাবেঈদের কাছ থেকে বর্ণিত বিষয় মানা-না মানার ব্যাপারে ব্যক্তির স্বাধীনতা রয়েছে।  (মাসায়েলে ইমাম আহমদ, পৃঃ ২৭৬-২৭৭।)

২. আওযাঈ'; ইমাম মালেক ও ইমাম আবু হানীফার রায় তাদের নিজস্ব রায় বা ইজতিহাদ। আমার কাছে এসবই সমান। তবে দলীল হল আছার অর্থাৎ সাহাবী ও তাবেঈগণের কথা। (ইবনু আবদিল বার-আল-জামে, ২য় খন্ড: পৃঃ ১৪৯।)

৩. যে ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদীসকে প্রত্যাখ্যান করে, সে ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। (ইবনুল জাওয়ী পৃঃ ১৮২)

হাদীস অনুসরণের ব্যাপারে এবং অন্ধ আনুগত্য থেকে দূরে থাকার জন্য এই হচ্ছে ইমামগণের মন্তব্য ও বক্তব্য। তাদের বক্তব্যগুলো এত স্পষ্ট ও পরিষ্কার যে, এর জন্য কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের দরকার কিংবা বির্তকের অবকাশ নেই। এর ভিত্তিতে বলা যায় যে, হাদীস অনুসরণের কারণে নিজ ইমামের মাযহাবের রায়ের বিপরীত হলেও কেউ মাযহাব বিচ্যুত হয় না। বরং সে নিজ মাযহাবেরই অনুসারী থাকে।

তবে যে ব্যক্তি শুধু ইমামদের কথার দোহাই দিয়ে হাদীসের বিরোধিতা করে, সে ব্যক্তি কিছুতেই অটুট রজ্জু আঁকড়ে ধরে নেই। বরং এই অনমনীয় মনোভারের কারণে সে ইমামদের নাফরমানীই করে এবং তাদের কথার বিরোধিতা করে।

আল্লাহ বলেনঃ

فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا -(سورة النساء : (٢٥)

অর্থঃ "আপনার রবের কসম। তারা সেই পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না যে পর্যন্ত আপনাকে তাদের ঝগড়ার সালিশে বিচারক না বানায়, আপনার ফয়সালার ব্যাপারে অন্তরে কুণ্ঠা বোধ না করে এবং আপনার রায় প্রশান্ত চিত্তে মেনে না নেয়।" (সূরা আন নিসা : ৬৫)

فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ -

অর্থ: 'যারা আল্লাহর আদেশের বিরোধিতা করে, তাদের এ বিষয়ে ভয় করা জরুরী যে, তারা দুনিয়ায় গযব কিংবা আখেরাতে কষ্টদায়ক আযাবের সম্মুখীন হবে। 

৩১.ক

হাফেয ইবনে রজব (রঃ) বলেছেন : রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বাণী যাদের

কাছে পৌঁছেছে এবং যারা তা জানতে পেরেছেন, তাদের কর্তব্য হল উম্মাহর কাছে তা বর্ণনা করা, তাদেরকে উপদেশ দেয়া এবং রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বাণীর আনুগত্য করার আদেশ দেয়া যদিও তা উম্মাহর মহান ব্যক্তিদের রায়ের বিপরীত হয়। রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আদেশের মর্যাদা অন্য যে কোনো ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মতের মর্যাদার চাইতে শ্রেষ্ঠতর। কেননা, কোন মহান ব্যক্তিত্বও ভুল করে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আদেশের বিরোধিতা করতে পারেন। এ কারণেই সাহাবায়ে কেরামসহ পরবর্তী উত্তরসূরীরা সহীহ হাদীস বিরোধীকোনো কিছু গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। কোনো কোনো সময় তাঁরা কঠোর ভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। 

৩১.খ

তবে তা বিদ্বেষের কারণে নয়। সম্মানিত ব্যক্তির প্রতি ভালবাসা অব্যাহত রেখেই কঠোর অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছেন। কেননা, আল্লাহর রসূল ছিলেন তাদের কাছে সর্বাধিক প্রিয় এবং তাঁর আদেশ ছিল সৃষ্টিজগতের সব কিছুর উর্ধে। যখন রসূলের (সঃ) বাণীর সাথে অন্য কারোর কথা সংঘর্ষমুখর হয়, তখনই অন্যদের কথার ওপর রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কথার শ্রেষ্ঠত্ব দান করে তার আনুগত্য করা হয়। রসূল (সঃ)-এর কথার পরিপন্থী হওয়ার কারণে তা

৩১ ক. সূরা নূর: ৬৩।

৩১ খ. আমি বলি এমনকি তারা নিজেদের বাপ কিংবা ওলামায়ে কেরামের কথাও কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইমাম তাহাওয়ী শরহে মাআ'নীল আছার গ্রন্থের ১ম খন্ডের ৩৭২ পৃঃ এবং আবু ইয়া'লী নিজ মোসনাদ গ্রন্থের ৩য় খন্ডে ১৩১৭ পৃষ্ঠায় সালেম বিন আবদুল্লাহ বিন ওমার থেকে নির্ভরযোগ্য সনদ সহকারে বর্ণনা করেছেন। আমি মসজিদে নবওয়ীতে আবদুল্লাহ বিন ওমার (রাঃ)-এর সাথে বসা ছিলাম। তখন সিরিয়া থেকে এক লোক এসে তাঁকে হজ্জে তামাত্তু সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। ইবনে ওমার উত্তরে বলেন,, তা ভাল ও উত্তম। তখন লোকটি বলে আপনার আব্বা ও মা কি তা করতে নিষেধ করতেন? ইবনে ওমার বলেন, তোমার জন্য আফসোস! রসূলুল্লাহ (সঃ) যা করেছেন আমার বাপ তা নিষেধ করলে তুমি কোন্টা মানবে? লোকটি বলে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর টাই মানবো। ইবনে ওমার বলেন এবার এখান থেকে যাও।

কোনো সম্মানিত লোকের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে অন্তরায় নয়। এ ব্যক্তি আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রাপ্ত। 

৩১.গ

কেননা, তার কাছে রসূলের বাণী সুস্পষ্ট হলে তিনি বিনা দ্বিধায় তা মেনে নেবেন। 

৩২. আমি বলি, তারা কি করে ভুল সংশোধনকে অপছন্দ করবে। অথচ তাদেরকে রসূলের আনুগত্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং রসূলুল্লাহর হাদীস বিরোধী কথা ও কাজ প্রত্যাহার করাকে জরুরী ঘোষণা করা হয়েছে। বরং ইমাম শাফেঈ নিজ সঙ্গীদেরকে সহীহ হাদীস তাঁর দিকে সম্বোধন করার নির্দেশ দিয়েছেন। যদিও তারা সেই হাদীস তার কাছ থেকে গ্রহণ করেননি কিংবা বিপরীত হাদীসই গ্রহণ করেছেন। সেজন্য ইবনু দাকীক আল-ঈদ যখন চার মাযহাবের একক কিংবা সামষ্টিক সহীহ হাদীস বিরোধী মাসআলাগুলো এক বিরাট খন্ডে জমা করেন, তখন তিনি এর ভূমিকায় বলেন:

এই মাসআলাগুলোকে চার ইমামের দিকে সম্বোধন করা হারাম। তাদের অনুসারী ফকীহদের উচিত সেগুলো জানা এবং ইমামদের দিকে সেগুলোকে সম্বোধন না করা। যেন তাদের দিকে মিথ্যাকে সম্বোধন করা না হয়।