Saturday, July 18, 2026

রুকু, রুকুর পদ্ধতি, ধীরস্থিরভাবে রুকু করা ওয়াজিব, রুকুর যিকর, রুকু দীর্ঘায়িত করা, রুকুতে কোরআন পড়া নিষেধ, রুকু থেকে ধীরস্থিরভাবে দাঁড়ানো ওয়াজিব, রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ানো এবং দোআ পড়া

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

রুকু

রসূলুল্লাহ (সঃ) কেরাআত শেষ করার পর সামান্য একটু অপেক্ষা করতেন।(আবু দাউদ। হাকেম একে সহীহ হাদীস বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী তা সমর্থন করেছেন। ইবনুল কাইয়েম সহ অন্যরা ঐ অপেক্ষার পরিমাণ সম্পর্কে বলেছেন, তা শ্বাস নেয়ার পরিমাণ সমতুল্য) তারপর তিনি তাকবীরে তাহরীমার সময়ের মত উপরের দিকে দুই হাত তুলতেন এবং তাকবীর বলতেন ও রুকুতে যেতেন। 

(বোখারী, মুসলিম,। রুকুতে যাওয়ার আগে এবং রুকু থেকে উঠার সময় দু'হাত তোলার ব্যাপারে মোতাওয়াতের বর্ণনা রয়েছে। অর্থাৎ বহু সংখ্যক বর্ণনাকারী দ্বারা তা বর্ণিত হয়েছে। তিন ইমাম, অধিকাংশ মোহাদ্দেস ও ফকীহ এবং ইমাম আবু ইউসুফের ছাত্র ইসাম বিন ইউসুফ আবু ইসমাহ বলখী সহ কিছু হানাফীর মাযহাবও এটাই। ওকবাহ বিন আমের হাত তোলার ব্যাপারে বলেছেন, প্রতি বারের ইশারায় ১০ নেকী পাওয়া যায়।)

তিনি ভুল নামায আদায়কারীকে বলেছিলেন: আল্লাহর আদেশ মোতাবেক ভাল করে উযু না করলে তোমাদের নামায পরিপূর্ণ হবে না। তারপর তাকবীর বলবে এবং আল্লাহর হামদ ও মর্যাদা প্রকাশ করবে। এরপর আল্লাহ যেভাবে আদেশ দিয়েছেন, সেভাবে কোরআন থেকে কেরাআত পাঠ করবে। পরে তাকবীর বলবে ও রুকুতে যাবে। দু'হাত হাঁটুর উপর এমনভাবে রাখবে যেন জোড়াগুলো ঢিলা-ঢালা থাকে। (আবু দাউদ, নাসাঈ। হাকেম একে সহীহ বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী সমর্থন করেছেন)

রুকুর পদ্ধতি

রসূলুল্লাহ (সঃ) রুকুতে দুই হাঁটুর উপর দুই হাতের তালু রাখতেন।(বোখারী, আবু দাউদ) এবং লোকদেরকেও অনুরূপ করার নির্দেশ দিয়েছেন। (বোখারী, আবু দাউদ) তিনি ভুল নামায আদায়কারীকেও অনুরূপ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে আগে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি দুই হাঁটু আঁকড়ে ধরতেন।(বোখারী, মুসলিম) তিনি আঙ্গুল ফাঁক করে রাখতেন।(হাকেম এটিকে সহীহ বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী তা সমর্থন করেছেন) তিনি ভুল নামায আদায়কারীকেও অনুরূপ নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন: তুমি যখন রুকুতে যাবে, তখন তোমার দুই হাত দুই হাঁটুর উপর রাখবে এবং আঙ্গুলগুলো ফাঁক রাখবে। তারপর একটু থামবে যে পর্যন্ত না প্রত্যেক অঙ্গ তার নিজ স্থান আঁকড়ে ধরে।(ইবনু খোযায়মাহ, ইবনু হিব্বান)

তিনি দুই কনুই দুই পাঁজর থেকে দূরে রাখতেন।(তিরমিযী। ইবনু খোযায়মাহ একে সহীহ বলেছেন) তিনি রুকুতে গেলে পিঠ সমান ভাবে বাঁকাতেন। (বায়হাকী-সনদ সহীহ, বোখারী) এমন কি পিঠে পানি ঢেলে দিলে তা যেন সমান ভাবে স্থির হয়ে থাকবে।(আল-কবীর ওয়াস্সাগীর-তাবারানী, যাওয়ায়েদ আল-মোসনাদ আবদুল্লাহ বিন আহমদ, ইবনু মাজাহ।) তিনি ভুল নামায আদায়কারীকে বলেছিলেন, তুমি যখন রুকুতে যাবে, তখন তোমার দুই হাত দুই হাঁটুর উপর রাখ, তোমার পিঠ সমানভাবে বাঁকাও এবং শক্তভাবে রুকু কর।(আহমদ, আবু দাউদ-সনদ সহীহ)

তিনি পিঠ থেকে মাথা উঁচু-নীচু করতেন না। (আবু দাউদ, বোখারী-কেরাআত অধ্যায়-সনদ সহীহ) বরং মাথা পিঠ বরাবর সমান রাখতেন।(মুসলিম, আবু আওয়ানাহ)

ধীরস্থিরভাবে রুকু করা ওয়াজিব

রসূলুল্লাহ (সঃ) ধীরস্থিরভাবে রুকু করতেন এবং ভুল নামায আদায়কারীকেও অনুরূপ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, তোমরা রুকু ও সাজদাহ পরিপূর্ণ কর। আল্লাহর শপথ, আমি আমার পেছনে তোমাদের রুকু ও সাজদাহ দেখি। (বোখারী, মুসলিম। নামাযের মধ্যে পেছনে দেখা রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মোজেযা ছিল। অন্যান্য সময় পেছনে দেখার কথা এখানে বলা হয়নি)

তিনি এক ব্যক্তিকে দেখলেন, সে রুকু পরিপূর্ণ করছে না এবং সাজদাহ ঠিকমত না করে ঠোকর দিচ্ছে। তখন তিনি বললেন, ঐ ব্যক্তি ঐ অবস্থায় মারা গেলে উম্মতে মোহাম্মদ হিসেবে বিবেচিত হবে না। সে নামাযে কাকের মত ঠোকর দিচ্ছে। যে ব্যক্তি রুকু পরিপূর্ণ করে না এবং সাজদায় ঠোকর মারে, তার উদাহরণ হল সেই ক্ষুধার্ত ব্যক্তির মত, যে একটি বা দু'টি খেজুর খায়, কিন্তু তাতে তার কোন লাভ হয় না। (অর্থাৎ ক্ষুধা দূর হয় না)। (মোসনাদ-আবু ইয়া'লী, বায়হাকী, তাবারানী, ইবনু আসাকির, ইবনু খোযায়মাহ। সনদ সহীহ)

আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু রসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে নামাযে মোরগের মত ঠোকর দিতে, শিয়ালের মত এদিক-ওদিক তাকাতে এবং বানরের মত চার পায়ের উপর বসতে নিষেধ করেছেন।(আহমদ, ইবনু আলী শায়বা, আতায়ালিসী। হাদীসটি উত্তম)

রসূলুল্লাহ (সঃ) আরও বলেছেন, নামায-চোর হচ্ছে সর্ব নিকৃষ্ট চোর। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করেন, কিভাবে নামায চুরি হয়? তিনি বলেন, রুকু ও সাজদাহ পরিপূর্ণ না করা।(ইবনু আবী শায়বা, তাবারানী। হাকেম এটিকে সহীহ হাদীস বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী তা সমর্থন করেছেন)

একবার রসূলুল্লাহ (সঃ) নামায পড়া অবস্থায় নিজ চোখের কোণ দ্বারা এমন এক ব্যক্তিকে ইশারা করলেন, যে রুকু ও সাজদায় পিঠ সমানভাবে সোজা করেনি। নামায শেষে তিনি বললেন, হে মুসলিম সমাজ! সে ব্যক্তির নামায হয় না, যে রুকু ও সাজদায় পিঠ সোজা করে না। (ইবনু আবী শায়বা, ইবনু মাজাহ, আহমদ। সনদ সহীহ)

অন্য এক হাদীসে রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, রুকু ও সাজদায় পিঠ সোজা ও সমান না করলে কোন ব্যক্তির নামায হয় না। (আবু আ'ওয়ানা, আবু দাউদ, আস্সাহমী। দারু কুতনী একে সহীহ বলেছেন)

রুকুর যিকর

রসূলুল্লাহ (সঃ) এই রোকনটি আদায়ের সময় বিভিন্ন রকম যিকর ও দোআ পাঠ করতেন। কোন সময় একটা, কোন সময় অন্যটা। তিনি যা বলতেন, তা হচ্ছে নিম্নরূপ:

১. তিন বার সোবহানা রাব্বিয়াল আযীম। (আহমদ, আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ, দারু কুতনী, তাহাবী, বাযযার। তাবারানী ৭জন সাহাবী থেকে এটি বর্ণনা করেছেন। ইবনুল কাইয়েম সহ যারা তিন তাসবীহর সংখ্যা অস্বীকার করেন এই হাদীস তাদের জন্য উত্তম জওয়াব) 

অর্থ: 'আমার মহান রবের পবিত্রতা বর্ণনা করছি।' তিনি কখনও এ বাক্য তিন বারেরও বেশী পড়তেন।(নবী করীম (সঃ) কর্তৃক কেয়াম, রুকু ও সাজদা সমানহারে দীর্ঘায়িত করার হাদীস থেকে একথা প্রমাণিত। হাদীসটি এ অনুচ্ছেদের শেষে বর্ণিত হবে)) একবার রাতের নামাযে তিনি এই তাসবীহটি এত বেশী পড়লেন রুকুর সময় প্রায় দাঁড়ানোর সময়ের সমান হয়ে যায়। ঐ রাকআতে তিনি তিনটি লম্বা সূরা পড়েছিলেন। সেগুলো হচ্ছে, সূরা বাকারা, সূরা নিসা ও সূরা আলে-ইমরান। সেই রাকাতে তিনি মাঝে মাঝে দোআ ও গুনাহ মাফ চেয়েছেন। রাতের নামায অধ্যায়ে তা উল্লেখ করা হয়েছে।

২. তিনবার সোবহানা রাব্বিয়াল আযীম ওয়া বিহামদিহী (আবু দাউদ, দারু কুতনী, আহমদ, তাবারানী, বায়হাকী) অর্থ: আমার মহান রবের পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা করছি।

৩. কখনও নিচের বাক্যটি তিনবার পড়তেন: (মুসলিম, আবু আ'ওয়ানা)

سُبُّوحٌ قُدُّوسٌ رَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوحِ .

অর্থ: 'আল্লাহ পবিত্র ও মোবারক, তিনি সকল ফেরেশতা এবং জিবরাঈলের রব।'

৪. তিনি এই দোআটি রুকু ও সাজদায় বেশি বেশি পড়তেন। (তিনি সূরা নাসরের আদেশ অনুযায়ী এই দোআ পড়তেন। তাতে আদেশ করা হয়েছে, আপনি আপনার রবের পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা করুন এবং ক্ষমা চান)

سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي -

কর।' অর্থ: 'মহান আল্লাহর পবিত্রতা ও প্রশংসা, হে আল্লাহ! আমাকে মাফ

৫. কখনও পড়তেন: (মুসলিম, আবু আওয়ানাহ, তাহাওয়ী দারু কুতনী)

اللَّهُمَّ لَكَ رَكَعْتٌ وَبِكَ أمَنَتٌ وَلَكَ أَسْلَمْتُ وَعَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ أَنْتَ رَبِّي خَشَعَ لَكَ سَمْعِى وَبَصَرِى وَمُنِّى وَعَظَمِي وَعَصَبِي وَمَا اسْتَقَلَتْ بِهِ قَدَمِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ .

অর্থঃ “হে আল্লাহ! আমি তোমার জন্য রুকু করেছি তোমার প্রতি ঈমান এনেছি, তোমার কাছে আত্মসর্মপণ করেছি, তোমার উপর নির্ভর করেছি, তুমি আমার রব! তোমার জন্য আমার কান, চোখ, মগয, হাড় ও শিরা বিনীত। আমার পা যতবার উপরের দিকে উঠে, তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টির জন্যই উঠে।'

৬. তিনি এই দোয়াও পড়তেন: 

سُبْحَانَ ذِي الْجَبَرُوتِ وَالْمَلَكُوتِ وَالْكِبْرِيَاءِ وَالْعَظْمَةِ .(আবু দাউদ, নাসাঈ-সনদ সহীহ। একই রুকুতে উপরোল্লিখিত সকল দোআ' ও যিকর এক সাথে পড়া জায়েয কিনা তা নিয়ে মতভেদ আছে। ইবনুল কাইয়েম যাদুল মাআদ গ্রন্থে এব্যাপারে দ্বিধাদ্বন্দু প্রকাশ করেছেন। পক্ষান্তরে ইমাম নববী বলিষ্ঠভাবে তাকে জায়েয বলেছেন। তিনি তাঁর 'আযকার' গ্রন্থে লিখেছেন, সম্ভব হলে সকল দোআ একই সাথে পড়া উত্তম। কিন্তু 'নায়লুল আবরার' গ্রন্থে আবুত্ তাইয়্যেব সিদ্দীক হাসান খান বলেছেন: 'রসূলুল্লাহ (সঃ) এক সময় একটা পড়েছেন। সবগুলো একত্রে পড়েননি। বেশ-কম না করে তাঁর হুবহু অনুসরণ করাই উত্তম। একথা বিশুদ্ধ বলে আমার মনে হয়। তবে দীর্ঘ রুকু সহ রসূলুল্লাহর দীর্ঘ নামাযের যে বর্ণনা হাদীসে এসেছে, সে অনুযায়ী কেউ দীর্ঘ নামায পড়লে রুকুতে সকল দোআ না পড়ে তা সম্ভব নয়। যেমনটি বলেছেন ইমাম নববী। তবে একই যিকরের পুনরাবৃত্তি করা সুন্নতের বেশি নিকটবর্তী)

অর্থঃ "সেই আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করছি, যিনি শাস্তি, বাদশাহী, শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বের অধিকারী।" তিনি রাতের নামাজে এ দোআ পড়েছেন।

রুকু দীর্ঘায়িত করা

রসূলুল্লাহ (সঃ) রুকু, রুকু থেকে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে সাজদাহ এবং দুই সাজদার মাঝখানে প্রায় সমপরিমাণ সময় ব্যয় করতেন। (বোখারী, মুসলিম)

রুকুতে কোরআন পড়া নিষেধ

রসূলুল্লাহ (সঃ) রুকু' ও সাজদায় কোরআন পড়তে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, আমাকে রুকু ও সাজদায় কোরআন পড়তে নিষেধ করা হয়েছে। তোমরা রুকুতে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ কর এবং সাজদায় বেশী বেশী করে দোআ কর। সাজদা দোআ' কবুলের উপযুক্ত জায়গা। (মুসলিম, আবু আ'ওয়ানা। এই নিষেধাজ্ঞা ফরয ও নফল সকল নামাযের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ইবনু আসাকির নফল নামাযে জায়েয বলে যে মন্তব্য করেছেন, তা দুর্বল)

রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ানো এবং দোআ পড়া

রসূলুল্লাহ (সঃ) রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সময় বলতেন:

سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ -

অর্থ: "আল্লাহ সেই ব্যক্তির কথা কবুল করেন, যে তাঁর প্রশংসা করে।" (বোখারী, মুসলিম) তিনি ভুল নামায আদায়কারীকে বলেছেন, কোন ব্যক্তির নামায সে পর্যন্ত শুদ্ধ হয় না, যে পর্যন্ত না সে তাকবীর বলে রুকু থেকে সম্পূর্ণ সোজা হয়ে সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ বলে। (আবু দাউদ। হাকেম এটিকে সহীহ বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী তা সমর্থন করেছেন)

তারপর তিনি দাঁড়িয়ে বলতেন: - رَبَّنَا (وَ) لَكَ الْحَمْدُ

এখানে ওয়াও সহ বা তা ব্যতিত উভয় প্রকার পড়ার বর্ণনা আছে।

- (বোখারী, আহমদ)

অর্থঃ হে আমাদের রব! (এবং) তোমার জন্যই সকল প্রশংসা।

তিনি সকল ধরনের মুসল্লীকে অনুরূপ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'তোমরা আমাকে যেরূপ নামায পড়তে দেখ, সেরূপ নামায পড়।' (বোখারী, আহমদ)

তিনি আরও বলেছেন, ইমামকে অনুসরণের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি যখন سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ বলবে, তখন তোমরা বলবে, اللَّهُمَّ

رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ

আল্লাহ তোমাদের প্রশংসা শুনবেন। আল্লাহ তাঁর নবীর মুখে বলেছেন, যে আল্লাহর প্রশংসা করে, তিনি তা শুনেন। (মুসলিম, আবু আ'ওয়ানা, আহমদ, আবু দাউদ)

তিনি অন্য এক হাদীসে এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেছেন, যার কথা ফেরেশতার দোআর সাথে একাকার হয়ে যাবে আল্লাহ তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেবেন।(বোখারী, মুসলিম। তিরমিযী একে সহীহ হাদীস বলেছেন)

তিনি রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সময় দু'হাত উপরে উঠাতেন। তাকবীরে তাহরীমা অধ্যায়ে তা আলোচনা করা হয়েছে।

১. তারপর তিনি দাঁড়ানো অবস্থায় নীচে বর্ণিত দোআ পড়েছেন:

رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ  (বোখারী, মুসলিম। মোতাওয়ায়াতের রেওয়াতের দ্বারা হাত তোলার কথা

বর্ণিত)

২. কোনো সময় পড়তেন:

رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ  (বোখারী, মুসলিম। মোতাওয়ায়াতের রেওয়াতের দ্বারা হাত তোলার কথা

বর্ণিত)

শব্দ যোগ করে اللهم ৩. কোনো সময় তিনি উপরোক্ত বাক্যগুলোর আগে পড়তেন। (বোখারী, আহমদ। ইবনুল কাইয়েম তাঁর যাদুল মাআ'দ গ্রন্থে 'আল্লাহুম্মা' এবং 'ওয়াও' সম্বলিত বর্ণনাগুলোকে অস্বীকার করেছেন। অথচ এ সকল বর্ণনা বোখারী, মোসনাদে আহমদ এবং নাসাঈতে আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে, দারেমীতে ইবনু উমার থেকে, বায়হাকীতে আবু সাঈদ খুদরী থেকে এবং নাসাঈতে অন্য এক সূত্রে আবু মূসা আশআরী থেকে বর্ণিত আছে।)

এই ভাবে পড়ার জন্য তিনি আদেশ করে বলেছেন।

৪. ইমাম যখন 'সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ' বলবে, তখন তোমরা বলবে, 'আল্লাহুম্মা রব্বানা লাকাল হামদ'। যে ব্যক্তির কথা ফেরেশতার কথার সাথে মিলে যাবে, আল্লাহ তার অতীতের গুনাহ মাফ করে দেবেন। (বোখারী, মুসলিম। তিরমিযী একে সহীহ হাদীস বলেছেন)

৫. তিনি কখনও এর সাথে নিম্নোক্ত দোআ যোগ করতেন:((মুসলিম, আবু আ'ওয়ানা)

مِلْءَ السَّمَاتِ وَمِلْءَ الْأَرْضِ وَمِلْءَ مَا شِئْتَ مِنْ شَيْءٍ بَعْدُ

অর্থ : আসমান ভরে, যমীন ভরে এবং তুমি আরও যা চাও তা ভরে (তোমার প্রশংসা)

৬. কিংবা তিনি যোগ করে পড়তেন: (মুসলিম, আবু আ'ওয়ানা)

مِلْءَ السَّمَوتِ وَمِلْءَ الْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَمِلْءَ مَا شِئْتَ مِنْ شَيْءٍ بَعْدُ

৭. কখনও তিনি এই দোআটি যোগ করতেন: (মুসলিম, আবু আ'ওয়ানা)

أهْلَ الثَّنَاءِ وَالْمَجْدِ لَأَمَانِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلَا مُعْطَى لِمَا مَنَعْتَ وَلَا يَنْفَعُ ذَالْجَدِ مِنْكَ الْجَدُّ .

অর্থ: 'হে প্রশংসা ও মর্যাদার অধিকারী! তুমি যাকে দাও তা রোধকারী কেউ নেই, তুমি যাকে বঞ্চিত কর তাকে কোন দানকারী নেই এবং কোন বিত্তশালী ও ক্ষমতাধর ব্যক্তির শক্তি ও সম্পদ তোমার কাছ থেকে তাকে রক্ষা করে উপকার করতে পারে না। (একমাত্র নেক আমলই তাকে রক্ষা করতে পারে।)

৮. তিনি রাতের নামাযে কখনও বলতেন:

لِرَبِّيَ الْحَمْدُ لِرَبِّيَ الْحَمْدُ -

অর্থ: আমার রবের সকল প্রশংসা, আমার রবের সকল প্রশংসা।

তিনি এটা বারবার পুনরাবৃত্তি করতেন। ফলে তাঁর এই কেয়াম বা সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সময় প্রায় রুকুর সময়ের পরিমাণ হয়ে যেত। আর রুকুর সময়ের পরিমাণ ছিল প্রথম রাকআতের কেয়াম সমান, যে রাকআতে তিনি সূরা বাকারা পড়েছেন। (আবু দাউদ, নাসাঈ-সনদ সহীহ)

৯. কখনও তিনি নীচের দোয়াটি যোগ করতেন:

مل السَّمَوتِ وَمِلْءَ الْأَرْضِ وَمِلْءَ مَا شِئْتَ مِنْ شَيْءٍ بَعْدُ، أَهْلَ الثَّنَاءِ وَالْمَجْدِ اَحَقَّ مَا قَالَ الْعَبْدُ وَكُلُّنَا لَكَ عَبْدُ اللَّهُمَّ لَا مَانِعَ لِمَا اعْطَيْتَ وَلَا مُعْطِيَ لِمَا مَنَعْتَ وَلَا يَنْفَعُ ذَالْجَدِّ مِنْكَ الْجَدُّ .

অর্থ: আসমান ভরে, যমীন ভরে এবং তুমি আরও যা চাও তা ভরে তোমার প্রশংসা। হে প্রশংসা ও মর্যাদার অধিকারী, বান্দার প্রশংসা পাওয়ার সর্বাধিক যোগ্য সত্তা! আমরা সবাই তোমার গোলাম। তুমি যাকে দাও তা রোধকারী কেউ নেই। তুমি যাকে বঞ্চিত কর তাকে কোন দানকারী নেই। কোনবিত্তশালী ও ক্ষমতাধর ব্যক্তির সম্পদ ও শক্তি তোমার কাছ থেকে তাকে রক্ষা করে উপকার করতে পারে না। (মুসলিম, আবু আ'ওয়ানা, আবু দাউদ)

১০. তিনি নিম্নের দোআ পড়েছেন:

رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ حَمْدًا كَثِيرًا طَيِّبًا مُبَارَكًا فِيهِ (مُبَارَكًا عَلَيْهِ كَمَا يُحِبُّ رَبُّنَا وَيَرْضَى)

অর্থ: হে আমাদের রব! তোমার জন্যই প্রশংসা, অত্যধিক পবিত্র ও মোবারক প্রশংসা, (প্রশংসাকারীর জন্যও তা মোবারক হোক, যেভাবে আমাদের রব পসন্দ করেন ও সন্তুষ্ট থাকেন)।

রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিছনে নামায আদায়কারী এক সাহাবী রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর 'সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ' বলে দাঁড়ানোর পর ঐ দোআটি পড়েন। রসূলুল্লাহ (সঃ) নামায শেষ করে জিজ্ঞেস করলেন, কে ঐ দোআটি পড়েছিল? ব্যক্তিটি বলল, আমি ইয়া রসূলাল্লাহ! রসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন, আমি ৩৩-এরও অধিক ফেরশতাকে প্রতিযোগিতা করতে দেখেছি, কে প্রথমে তা লিখবে! (মালেক, বোখারী, আবু দাউদ)

রুকু থেকে ধীরস্থিরভাবে দাঁড়ানো ওয়াজিব

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, রসূলুল্লাহ (সঃ) প্রায় রুকুর সমপরিমাণ সময় রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। তাঁর দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার কারণে কেউ কেউ ধারণা করতেন তিনি সাজদায় যাবার কথা ভুলে গেছেন।(বোখারী, মুসলিম, আহমদ)

তিনি ভুল নামায আদায়কারীকে প্রশান্তি সহকারে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়ে বলেছেন: তারপর মাথা তুলে সোজা হয়ে দাঁড়াও। অন্য এক রিওয়ায়াতে এসেছে, যখন তুমি মাথা তুলবে, তখন সোজা হয়ে দাঁড়াবে যেন হাড় তার জোড়ার সাথে ঠিকমত খাপ খায়। (বোখারী, মুসলিম, দারেমী, হাকেম, শাফেঈ, আহমদ। এই হাদীসের উদ্দেশ্য হল, প্রশান্তির সাথে দাঁড়ানো। এই হাদীস দ্বারা হেজাযের কিছু আলেম রুকু থেকে দাঁড়িয়ে বুকের উপর হাত বাঁধার বৈধতা সম্পর্কে যা বলেছেন, তা রিওয়ায়াতের অর্থের মধ্যেই নেই। বরং এজাতীয় প্রমাণ বাতিল। এই কেয়ামে বুকে হাত বাঁধা যে বেদআত তাতে আমার কোন সন্দেহ নেই। এর কোন ভিত্তি থাকলে তা আমাদের পর্যন্ত পৌঁছত। অতীতের নেক লোকেরাও অনুরূপ করেছেন বলে কোন প্রমাণ নেই। হাদীসের কোন ইমামও এ প্রসঙ্গে অনুকূল কিছু বলেননি। শেখ তুয়াইজেরী ইমাম আহমদের বরাত দিয়ে বলেছেন, কেউ ইচ্ছা করলে হাত ছেড়ে দিতে পারে কিংবা বাঁধতে পারে। তিনি এটাকে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদীস বলেননি)

তিনি তাকে বলেন, এরূপ না করলে তোমাদের নামায পরিপূর্ণ হবে না।

রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ সেই ব্যক্তির নামাযের দিকে তাকান না, যে রুকু ও সাজদায় পিঠ সোজা করে না। (আহমদ, আল কবীর-তাবারানী। সনদ সহীহ)

ইমামের প্রতি লোকমা দেয়া

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

ইমামের প্রতি লোকমা দেয়া

ইমাম কেরাআত ভুলে গেলে বা আটকে গেলে তা সংশোধন করে দেয়া সুন্নত। একবার রসূল (সাঃ) নামাযে কেরাআত পড়েন এবং কৈরাআতে আটকে যান। নামায শেষ করে তিনি উবাইকে বলেন, তুমি কি আমাদের সাথে নামায পড়েছ? তিনি বলেন, হ্যাঁ। তিনি আবার বলেন, কোন্ জিনিস তোমাকে লোকমা দিতে বাধা দিয়েছে? (আবু দাউদ, ইবনু হিব্বান, তাবারানী, ইবনু আসাকির, আযযিয়া আলমোখতারা-সনদ সহীহ)

শয়তানের ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য নামাযে আউযু বিল্লাহ পড়া ও থুথু নিক্ষেপ করা । উসমান বিন আবুল আ'স (রাঃ) রসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রসূল! শয়তান আমার ও আমার নামাযের মধ্যে বাধা সৃষ্টি করে এবং আমার কেরাআতে ভুল-ভ্রান্তি ঘটায়। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, ঐটা হচ্ছে শয়তান এবং তার নাম হচ্ছে খেনযাব। তুমি যখন শয়তানের ওয়াসওয়াসা অনুভব করবে, তখন আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবে। অর্থাৎ আউযু বিল্লাহ পড়বে এবং তোমার বাম দিকে তিনবার থুথু নিক্ষেপ করবে। উসমান বলেন, আমি ঐ রকম করি এবং আল্লাহ আমার কাছ থেকে শয়তানকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন।(মুসলিম, আহমদ। ইমাম নববী (রঃ) বলেছেন, এই হাদীস প্রমাণ করছে ওয়াসওয়াসার সময় শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়া এবং বাম দিকে ৩বার থুথু নিক্ষেপ করা মোস্তাহাব। আন-নেহায়া গ্রন্থে বলা হয়েছে, এখানে থুথু বলতে 'ফুঁ' বুঝানো হয়েছে, যাতে থুথুর বিন্দু থাকবে)

সুন্দর আওয়াজ ও তারতীল সহকারে কেরাআত পাঠ এবং রসূলুল্লাহ (সঃ)- সুন্দর আওয়াজে বা সুরে কোরআন পড়ার নির্দেশ

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

সুন্দর আওয়াজ ও তারতীল সহকারে কেরাআত পাঠ

আল্লাহ তারতীল (ধীরে ধীরে ও সুন্দর করে) সহকারে কোরআন পড়ার যে নির্দেশ দিয়েছেন সেই আলোকে রসূল (সঃ) আস্তে আস্তে সুন্দর আওয়াযে কোরআন পাঠ করতেন। তিনি না খুব বেশী ধীরগতিতে পড়তেন, না দ্রুতগতিতে পড়তেন। বরং তিনি প্রতিটি অক্ষর সুস্পষ্ট করে পাঠ করতেন। তিনি এমন ভাবে তারতীল করে পাঠ করতেন তাতে যেন দীর্ঘ সূরা আরও অধিকতর দীর্ঘ হয়ে যেত।(মুসলিম, মালেক)

তিনি বলেন, কোরআনের পাঠককে বলা হবে, তুমি দুনিয়ায় যে রকম তারতীল সহকারে কোরআন পাঠ করেছ ঠিক তেমনি ভাবে কোরআন পড় এবং উপরে উঠো। তোমার পঠিত শেষ আয়াতের উপর তোমার মর্যাদা নির্ধারিত হবে। (আবু দাউদ। তিরমিযী এটিকে সহীহ বলেছেন)

তিনি যেখানে মাদের অক্ষর আছে, সেখানে লম্বা করে টেনে পড়তেন।

الرَّحِيمِ - الرَّحْمَنِ - بِسْمِ اللهِ FOR পড়তেন। তিনি মাদের হরফে মাদ আদায় করে লম্বা করে পড়তেন। (বোখারী, 'স্মাবু দাউদ)

তিনি প্রতিটি আয়াতের শেষে ওয়াক্ফ করতেন বা থামতেন। সূরা ফাতেহায় এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তিনি কখনও লম্বা ও গুনগুন সুরে কোরআনের আয়াত পাঠ করতেন। এটাকে 'তারজী' বলা হয় (যেমনটি আযানে দেখা যায়।) তিনি মক্কা বিজয়ের দিন উষ্ট্রীর পিঠে নরম সুরে তারজী' সহকারে সূরা ফাতহ পড়েছিলেন। (বোখারী ও মুসলিম)

আবদুল্লাহ বিন মোগাফ্ফাল রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর তারজী' নিম্নরূপ বর্ণনা করেছেন।

।।। (তিন আলিফ) এর ব্যাখ্যায় বলেছেন প্রথম হামজার উপর ফাতাহ্ এরপর আলিফ সাকিন এবং তারপর অন্য আরেকটি হামজাহ। মোল্লা আলী কারীও অন্য এক সূত্র থেকে একই কথা বর্ণনা করেছেন। এরপর তিনি বলেছেন, এটা পরিষ্কার যে, এখানে ৩টা লম্বা আলিফ রয়েছে।

রসূলুল্লাহ (সঃ)- সুন্দর আওয়াজে বা সুরে কোরআন পড়ার নির্দেশ

দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:

زَيَّنُوا الْقُرْآنَ بِأَصْوَاتِكُمْ فَإِنَّ الصَّوتَ الْحَسَنَ يَزِيدُ الْقُرْآنَ

حَسَنًا .

অর্থ: 'তোমরা কোরআনকে সুললিত কণ্ঠে পড়। সুন্দর সুর কোরআনের সৌন্দর্য বাড়ায় (বোখারী, আবু দাউদ, দারেমী, হাকেম, তাম্মাম, আররাযী-সনদ সহীহ)

তিনি আরো বলেছেন,

إِنَّ مِنْ أَحْسَنِ النَّاسِ صَوْتًا بِالْقُرْآنِ الَّذِي إِذَا سَمِعْتُمُوهُ يقْرَأُ حَسِبْتُمُوهُ يَخْشَى اللَّهَ .

অর্থ: সেই ব্যক্তির কোরআন পড়ার সুর সর্বোত্তম, যার কোরআন পড়া শুনলে তোমাদের ধারণা হবে যে, লোকটি আল্লাহকে ভয় করে। (হাদীসটি সহীহ। ইবনু মোবারক, আযযোহদ ১/১৬২, দারেমী, ইবনু নসর, তাবারানী, আবু নাঈম-আখবার ইসপাহান এবং আযযিয়া-আল্ মোখতারা গ্রন্থে তা বর্ণনা করেছেন)

রসূলুল্লাহ (সঃ) গুনগুন সুরে কোরআন পড়ার আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'তোমরা আল্লাহর কিতাব শিখ, ভাল করে তা আঁকড়ে ধর ও অনুসরণ কর এবং ললিত-কোমল সুরে তা পড়। আল্লাহর শপথ, উটকে রশি দিয়ে বেঁধে রাখার চাইতেও কোরআন মনে রাখা আরও কঠিন। (দারেমী, আহমদ-সনদ সহীহ)

তিনি বলেছেন - لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَّمْ يَتَغَنَّ بِالْقُرْآنِ “সে ব্যক্তি আমাদের নয়, যে সুন্দর সুরে কোরআন পড়ে না।" (আবু দাউদ। হাকেম ও আল্লামা যাহাবী একে সহীহ বলেছেন)

তিনি আরও বলেছেন, 'আল্লাহ কোন নবীর সুন্দর সুরে কিতাব পড়া অপেক্ষা অন্য কোন জিনিস বেশী শুনেন না। নবী শব্দ করে সুললিত কণ্ঠে কোরআন পড়বেন। (বোখারী, মুসলিম, তাহাবী, ইবনে মান্দাহ-আত-তাওহীদ ১/৮১ পৃঃ)

রসূলুল্লাহ (সঃ) আবু মূসা আশআরীকে বলেছেন, আমি গত রাতে তোমার কেরাআত শুনেছি, তুমি যদি আমাকে দেখতে! তোমাকে দাউদ (আঃ)-এর মত সুন্দর কণ্ঠ বা সুর দেয়া হয়েছে। আবু মূসা বলেন, আমি আপনার উপস্থিতি টের পেলে আরও সুন্দর সুরে পাঠ করতাম। (আবদুর রায্যাক-আল-আমালী, বোখারী, মুসলিম, ইবনু নসর, হাকেম)

বিতরের নামায, জুমআ’র নামায, দুই ঈদের নামাজ এবং জানাযার নামায

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

৭. বিতরের নামায

রসূলুল্লাহ (সঃ) বিতরের নামাযে প্রথম রাকআতে সূরা আল-আ'লা (নং ৮৭, আয়াত ১৯), দ্বিতীয় রাকআতে সূরা কাফেরূন এবং তৃতীয় রাকআতে সূরা ইখলাস পড়তেন। (নাসাঈ। হাকেম এটাকে সহীহ বলেছেন)

তিনি কখনও তৃতীয় রাকআতে সূরা ফালাক ও সূরা নাসসহ যোগ করে পড়তেন। (তিরমিযী। হাকেম এটিকে সহীহ বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী এর সাথে একমত হয়েছেন)

একবার তিনি তৃতীয় রাকআতে সূরা নিসার একশত আয়াত পড়েছেন। (নাসাঈ, আহমদ-সনদ সহীহ)

তিনি বিতরের পরের দুই রাকআত নামাযে সূরা যিলযাল এবং সূরা কাফেরূন পড়েছেন। 

আহমদ, ইবনু নসর-সনদ সহীহ। বিতরের পরে দুই রাকআত নামাযের কথা মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে, যা বোখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত অপর একটি হাদীসের বিপরীত। তাতে রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, إِجْعَلُوا أَخِرَصَلَاتِكُمْ بِاللَّيْلِ وَتْرا

অর্থ: তোমরা রাত্রে বিতরকে সর্বশেষ নামায বানাও।' ওলামায়ে কেরাম হাদীস দু'টির বৈপরীত্য দূর করার উদ্দেশ্যে কিছু জওয়াব দিয়েছেন। কিন্তু কোনটাই প্রাধান্য পাওয়ার যোগ্য নয়। তাই আমার মতে, বিতরকে সর্বশেষ নামায বানানোর আদেশের প্রেক্ষিতে উক্ত দুই রাকআত নামায ত্যাগ করা উত্তম। বিতরের পর দুই রাকআত নামায পড়ার বিষয়েও আরেকটি আদেশসূচক হাদীস আছে। তাই প্রথম হাদীসের উপর আমল করা মোস্তাহাব হলে দ্বিতীয় হাদীসের সাথে কোন বিরোধ থাকে না।

৮. জুমআ'র নামায

তিনি কখনও জুমআ'র নামাযের প্রথম রাকআতে সূরা জুমআ' এবং দ্বিতীয় রাকআতে সূরা মুনাফেকুন পড়েছেন।(মুসলিম, আবু দাউদ) কখনও সূরা মুনাফেকুন-এর পরিবর্তে সূরা গাশিয়াহ পড়েছেন। (মুসলিম, আবু দাউদ)

কখনও প্রথম রাকআতে সূরা আল আ'লা (নং ৮৭, আয়াত ১৯) পড়েছেন এবং দ্বিতীয় রাকআতে সূরা গাশিয়া (নং ৮৮, আয়াত ২৬) পড়েছেন। (মুসলিম, আবু দাউদ)

৯. দুই ঈদের নামায

তিনি ঈদের নামাযের প্রথম রাকআতে কখনও সূরা আল-আ'লা এবং দ্বিতীয় রাকআতে সূরা আল-গাশিয়া পড়তেন। (মুসলিম, আবু দাউদ)

কখনও সূরা কাফ (নং ৫০, আয়াত ৪৫) এবং সূরা কামার (নং ৫৪, আয়াত ৫৫) পড়েছেন।(মুসলিম, আবু দাউদ

১০. জানাযার নামায

জানাযার নামাযে সূরা ফাতেহা  (এটা শাফেঈ, আহমদ এবং ইসহাকের মত। পরবর্তী যুগের কিছু হানাফী বিশেষজ্ঞের মতও তাই। তবে সূরা ফাতেহার পর অন্য সূরা পড়ার বিষয়টি শুধু শাফেঈ মাযহাবের মত এবং এটি হক) এবং অন্য একটি সূরা পড়া সুন্নত।(বোখারী আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনুল যাযুদ। তোয়াইজিরী বলেছেন, একটি সূরা যোগ করা দুর্লভ মত নয়। (মোকালামা-৬৮ পৃঃ)) প্রথম তাকবীরের পর তিনি সূরা গোপনে পড়তেন।(নাসাঈ, তাহাবী-সনদ সহীহ)

রাসুল (সা:) এর রাতের নামায/সালাত

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

৬. রাতের নামায

রসূলুল্লাহ (সঃ) রাতের নামাযে কেরাআত লম্বা এবং ছোট করতেন। কখনও তিনি অনেক লম্বা কেরাআত পড়তেন। আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) বলেন, 'আমি এক রাতে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে নামায পড়েছি। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকায় আমি একটা খারাপ ইচ্ছা পোষণ করি। খারাপ ইচ্ছাটি কি ছিল-এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমি বসে পড়া এবং রসূলুল্লাহর সাথে নামায ত্যাগ করার ইচ্ছা করি।(বোখারী, মুসলিম)

হোযাইফা বিন ইয়ামান বলেন, আমি এক রাত্রে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে নামায পড়ি। তিনি সূরা বাকারা দিয়ে নামায শুরু করেন। আমি ধারণা করি যে, হয়তো একশত আয়াতের মাথায় তিনি রুকুতে যাবেন। কিন্তু না, তিনি কেরাআত অব্যাহত রাখেন। আমি ধারণা করি, হয়তো সূরাটি তিনি দুই রাকআতে পড়বেন। কিন্তু না, তিনি কেরাআত পড়া অব্যাহত রাখেন। তখন আমার ধারণা হয় যে, হয়তো সূরাটি শেষ করে রুকুতে যাবেন। কিন্তু না,

তিনি সূরা নিসা শুরু করে তা শেষ করলেন। তারপর সূরা আলে-ইমরান শুরু করে তাও শেষ করেন।(তিনি সূরা আলে-ইমরানের আগে সূরা নিসা পড়েছেন। এর দ্বারা প্রমাণ হয় যে, কোরআনের সূরার ক্রমিক ধারা লংঘন করা জায়েয) তিনি আস্তে আস্তে এবং সাধারণভাবে কেরাআত পড়েন। যখন তাসবীহ পাঠের আয়াত আসে, তখন তাসবীহ পড়েন, চাওয়ার আয়াত আসলে প্রার্থনা করেন এবং আশ্রয়ের আয়াত আসলে আশ্রয় চান।

তারপর তিনি রুকু করেন।(মুসলিম, নাসাঈ)

তিনি একরাতে ৭টি লম্বা সূরা পাঠ করেন, অথচ তখন তিনি অসুস্থ ছিলেন।(আবু ইয়া'লী। হাকেম ও আল্লামা যাহাবী একে সহীহ হাদীস বলেছেন। ৭টি লম্বা, সূরা হচ্ছে-বাকারা, আলে-ইমরান, নিসা, মায়েদাহ, আনআ'ম, আ'রাফ এবং তাওবাহ)

তিনি কখনও প্রত্যেক রাকআতে একটি করে উপরোল্লিখিত সূরা পড়তেন।(আবু দাউদ, নাসাঈ-সনদ বিশুদ্ধ)

তিনি এক রাতে কখনও পুরো কোরআন পড়েছেন বলে জানা যায় না।(মুসলিম, আবু দাউদ)

বরং তিনি আবদুল্লাহ বিন আমরের জন্য তাতে সম্মতি দেননি। আবদুল্লাহ বিন আমর বলেছেন, আমি-প্রত্যেক মাসে কোরআন খতম করি। আমি বলি যে, আমার আরও শক্তি আছে। (অর্থাৎ আমি আরও বেশী পড়তে পারি।) রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, তাহলে ২০ রাতে এক খতম কর। আবদুল্লাহ বলেন, আমি আরও বেশী পড়ার শক্তি রাখি। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, তাহলে ৭ রাতে এক খতম কর, এর বেশী নয়।(বোখারী, মুসলিম) (অর্থাৎ ৭ দিনের কম সময়ে কোরআন খতম কর না)

তারপর তিনি তাকে ৫ দিনের মধ্যে কোরআন খতমের অনুমতি দিয়েছেন।(নাসাঈ, তিরমিযী)

এরপর তাকে তিন দিনের মধ্যে কোরআন খতমের অনুমতি দিয়েছেন।(বোখারী, আহমদ)

তিনদিনের কম সময়ে কোরআন খতম করতে তিনি তাকে নিষেধ করেছেন।(সুনানে দারেমী, সুনান সাঈদ বিন মানসুর-সনদ বিশুদ্ধ) তিনি এর কারণ বর্ণনা করে বলেন: যে ব্যক্তি তিন দিনের কমে কোরআন খতম করে, সে কোরআন বুঝতে পারে না।(আহমদ-সনদ সহীহ)

অন্য আরেক বর্ণনায় এসেছে, তিনি তাকে বলেছেন, সে ব্যক্তি কোরআন বুঝতে পারে না, যে তিন দিনের কম সময়ে কোরআন খতম করে।(দারেমী। তিরমিযী এটিকে সহীহ বলেছেন)

রসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে আরো বলেন, সকল ইবাদতকারীর রয়েছে হিম্মত ও তৎপরতা( হিম্মত ও তৎপরতা বলতে বুঝায় সেই তেজীভাব, যা মুসলমানরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার জন্য প্রদর্শন করে। এই তেজীভাবের অপর অর্থ হল, নেক আমল করা এবং স্থায়ীভাবে তা করতে থাকা যে পর্যন্ত না আল্লাহর সাথে সাক্ষাত হয়। তাই রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহর কাছে প্রিয়তম আমল হচ্ছে স্থায়ী আমল-যদিও সেটা কম হোক না কেন) এবং প্রত্যেক হিম্মত ও তৎপরতার জন্য রয়েছে সময় বা যুগ সন্ধিক্ষণ। হয় তিনি সুন্নতে, না হয় বেদআতের দিকে মোড় নেবেন। যার কাল-সন্ধিক্ষণ সুন্নতের বিপরীত জিনিসের প্রতি মোড় নেয়, সে ধ্বংস হবে।(আহমদ, ইবনু হিব্বান)

সে কারণে রসূলুল্লাহ (সঃ) তিন দিনের কম সময়ে কোরআন শরীফ খতম করতেন না।(ইবনু, সা'দ, ১ম খন্ড ৩৭৬ পৃঃ, আখলাকুন্নবী-আবুশ্ শেখ ২৮১ পৃঃ)

তিনি বলতেন, যে ব্যক্তি রাতে দুইশত আয়াত পড়ে, তাকে একনিষ্ঠ মোখলেস আনুগত্যকারীদের মধ্যে পরিগণিত করা হয়।(দারেমী, হাকেম। আল্লামা যাহাবী হাদীসটিকে ঠিক বলেছেন)

রসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক রাতের নামাযে সূরা বনী ইসরাঈল এবং সূরা যুমার পাঠ করতেন।(আহমদ, ইবনে নসর-সনদ সহীহ)

তিনি আরও বলতেন, যে ব্যক্তি রাতে একশত আয়াত পড়বে, তাকে গাফেলদের মধ্যে লেখা হবে না।(দারেমী, হাকেম এবং আল্লামা যাহাবী একে সহীহ বলেছেন)

তিনি কখনও প্রত্যেক রাকআতে ৫০ আয়াত কিংবা আরও বেশী পড়তেন।(বোখারী, আবু দাউদ) আবার কখনও সূরা মোয্যাম্মেল (নং ৭৩, আয়াত সংখ্যা ২০) পরিমাণ কেরাআতে পড়তেন।(আহমদ, আবু দাউদ, সনদ সহীহ) তিনি কখনও পুরো রাত জেগে নামায পড়তেন না। (মুসলিম, আবু দাউদ। এই হাদীস সহ অন্যান্য হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সর্বদা বা অধিকাংশ সময় পুরো রাত জাগা মাকরূহ। কেননা, তা উত্তম হলে রসূলুল্লাহ (সঃ) ছাড়তেন না। তিনি হচ্ছেন উত্তম আদর্শ ও চরিত্র। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) ৪০ বছর ব্যাপী ইশার উযু দিয়ে ফজর পড়েছেন বলে যে মিথ্যা ঘটনা বর্ণিত আছে, তা বিশ্বাস করা ঠিক নয়। আল্লামা ফিরোযাবাদী 'আর রাদ্দ আ'লাল মো'তারেদ' গ্রন্থের ১ম খন্ডের ৪৪ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, এটা ইমাম আবু হানীফার সম্মানের প্রতি ক্ষতিকর প্রকাশ্য মিথ্যা। ইমাম আবু হানীফা (রঃ) প্রতি নামাযের জন্য নতুন উযু করা উত্তম তাই সেটা অবশ্যই করে থাকবেন) 

তবে কদাচিত পুরো রাত পড়েছেন।

বর্ণিত আছে, আবদুল্লাহ বিন খাব্বাব আল-আরত বদরের যুদ্ধে রসূলুল্লাহর সাথে অংশগ্রহণ করেন এবং রসূলুল্লাহকে সারা রাতভর নামায পড়তেন দেখেন। সোবহে সাদেক পর্যন্ত তিনি নামায পড়েছেন। তিনি নামায থেকে সালাম ফিরালেন। খাব্বাব জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রসূল, আমার মা-বাপ আপনার জন্য উৎসর্গ হোক, আপনি এই রাতে এমন নামায পড়লেন যা ইতিপূর্বে আর কখনও দেখিনি। তিনি উত্তরে বলেন, হাঁ, এটা ছিল আশা ও ভয়ের নামায, আমি আমার রবের কাছে তিনটি জিনিস চেয়েছি। তিনি দু'টো দিয়েছেন এবং একটি নিষেধ করেছেন। আমি চেয়েছি যে, আমার উম্মাতকে যেন অন্যান্য জাতির মত ধ্বংস করা না হয়। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, যেন দুর্ভিক্ষ দিয়ে ধ্বংস করা না হয়। এই দোআ আল্লাহ মনযুর করেছেন। আমি আমার রবের কাছে আমাদের উপর নিজেরা ছাড়া অন্য জাতিকে বিজয়ী না করার প্রার্থনা জানিয়েছি। তিনি ঐ দোআও মনযুর করেছেন। আমি আরও দোআ করেছি, আমাদের মধ্যে যেন বিভক্তি না হয়। তিনি তা কবুল করেননি।( নাসাঈ, আহমদ, তাবারানী। তিরমিযী এটিকে সহীহ হাদীস বলেছেন)

এক রাতে তিনি বারবার ভোর পর্যন্ত শুধু নিম্নোক্ত আয়াতটি পড়ে রুকু, সাজদাহ ও দোআ করতে থাকেন। আয়াতটি হল:

إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ

الْحَكِيمُ

অর্থ: 'তুমি যদি তাদেরকে শাস্তি দাও, তবে তারা তো তোমারই বান্দাহ, আর যদি তাদেরকে ক্ষমা কর, নিঃসন্দেহে তুমি শক্তিশালী ও বিজ্ঞ।'

(সূরা মায়েদাহ-১১৮)

ভোর হলে আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! সারা রাত ভোর না হওয়া পর্যন্ত আপনি শুধু এই একটি মাত্র আয়াত পড়ে রুকু, সাজদাহ এবং দোআ করলেন, অথচ আল্লাহ আপনাকে পুরো কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন। আমাদের মধ্যে কেউ এরকম করলে আমরা তাকে পাকড়াও করতাম। রসূলুল্লাহ (সঃ) জওয়াবে বললেন, আমি আল্লাহর কাছে আমার উম্মতের সুপারিশ প্রার্থনা করেছি, তিনি তা মনযুর করেছেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করে না, সে ইন্‌শাআল্লাহ আমার সুপারিশ লাভকরবে।(নাসাঈ, ইবনু খোযায়মাহ, আহমদ, ইবনু নসর। হাকেম ও আল্লামা যাহাবী একে সহীহ বলেছেন)

এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমার এক প্রতিবেশী রাতে নামায পড়েন। তবে তিনি তাতে সূরা ইখলাস ছাড়া আর কোন সূরা পড়েন না। তিনি বারবার কেবলমাত্র ঐ সূরাটিই পড়েন এবং আর কোন সূরা পড়েন না। প্রশ্নকর্তা সূরা ইখলাসকে যেন অপর্যাপ্ত বিবেচনা করে ঐ প্রশ্ন করেন। নবী (সঃ) বললেন, আল্লাহর কসম, এটা কোরআনের এক-তৃতীয়াংশ।(বোখারী, আহমদ)

এশার নামাযে/সালাতে রাসুলুল্লাহ (সা:) যা পড়তেন

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

৫. এশার নামায

রসূলুল্লাহ (সঃ) এশার ফরয নামাযের প্রথম দুই রাকআতে মাঝারি ধরনের (ওয়াসাত মোফাস্সাল) সূরা পড়তেন।(নাসাঈ, আহমদ-সনদ সহীহ) তিনি কখনও সূরা আশ-শামস (সূরা নং ৯১, আয়াত সংখ্যা ১৫) কিংবা এই জাতীয় অন্য সূরা পড়েছেন।(আহমদ, তিরমিযী একে উত্তম হাদীস বলেছেন)

তিনি কখনো সূরা ইনশিক্বাক পড়েছেন এবং ঐ সূরায় যে সাজদা আছে, তা আদায় করেছেন।(বোখারী, মুসলিম, নাসাঈ)

একবার তিনি সফরে প্রথম রাকআতে সূরা তীন পড়েছেন। (সূরা নং-৯৫, আয়াত সংখ্যা ৮) (আহমদ, তিরমিযী একে উত্তম হাদীস বলেছেন)

তিনি এশার ফরয নামাযে লম্বা কেরআত পড়তে নিষেধ করেছেন। কেননা, একবার সাহাবী মোআয বিন জাবাল নিজ লোকদেরকে নিয়ে এশার নামায পড়েন এবং তাতে লম্বা কেরাআত পড়েন। সেই জামাতে শরীক একজন আনসার সাহাবী নামায শেষে পুনরায় এশার ফরয নামায আদায় করেন। মোআয (রাঃ)-কে বিষয়টি জানানোর পর তিনি মন্তব্য করেন যে, ঐ আনসার সাহাবী মুনাফিক। আনসার সাহাবী ঐ মন্তব্য শুনার পর রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে যান এবং মোআযের মন্তব্য সম্পর্কে তাঁকে জানান। তখন রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, হে মোআয! তুমি কি ফেতনা ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারী হতে চাও? হে মোআয! তুমি লোকদেরকে নিয়ে নামাযের ইমামতি করলে সূরা আশ-শামস, (নং ৯১, আয়াত ১৫) সূরা আ'লা (নং ৭৭ আয়াত ১৯) সূরা আলাক (নং ৯৬, আয়াত ১৯) এবং সূরা আল-লাইল (নং ৯২, আয়াত ২১) পড়তে পার। কেননা, তোমার পেছনে বুড়ো, দুর্বল ও এমন লোক আছে, যাদের দ্রুত যাওয়া দরকার।(বোখারী, মুসলিম, নাসাঈ)

মাগরিবের নামাযে/সালাতে রাসুলুল্লাহ (সা:) যা পড়তেন

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

৪. মাগরিবের নামায

রসূলুল্লাহ (সঃ) মাগরিবের নামাযে ছোট সূরা (কেসারে মোফাস্সাল) পড়তেন। লোকেরা তাঁর সাথে নামায পড়ে ঘরে গিয়ে ধনুকে তীরের স্থান নির্ধারণ করতে পারত।(আহমদ, তায়ালিসী-সনদ সহীহ) অর্থাৎ অন্ধকার নেমে আসার আগেই নামায শেষ হয়ে যেত।

তিনি সফরে দ্বিতীয় রাকআতে সূরা তীন পড়েছেন।

তিনি কখনও লম্বা এবং কখনও মাঝারি সূরা পড়তেন। তাই তিনি কোনো সময় সূরা মোহাম্মদ (সূরা নং ৪৭, আয়াত সংখ্যা ৩৮) পড়েছেন।(ইবনু খোযায়মাহ, তাবারানী, আল-মাকদেসী-সনদ সহীহ) কখনও তিনি সূরা তৃর পড়েছেন।(বোখারী, মুসলিম) কখনও আবার সূরা আল মোরসালাত (সূরা নং ৭৭, আয়াত সংখ্যা ৫০) পড়েছেন। এটা তাঁর জীবনের সর্বশেষ মাগরিব পড়ার ঘটনা।(বোখারী, মুসলিম)

কখনও তিনি মাগরিবের দুই রাকআতে বড়ো দুই সূরার (সূরা আরাফ অপেক্ষাকৃত বড়ো এবং সূরা আনআম অপেক্ষাকৃত ছোট) মধ্যে অপেক্ষাকৃত বড়ো সূরা আল-আরাফ (সূরা নং ৭, আয়াত সংখ্যা ২০৬) পড়েছেন।(বোখারী, আবু দাউদ, ইবনু খোযায়মাহ, আহমদ, আস-সেরাজ, আল-মোখলেস)

কখনও তিনি দুই রাকআতে সূরা আনফাল পড়েছেন। (সূরা নং ৮, আয়াত সংখ্যা ৭৫)(তাবারানী- সনদ সহীহ)

রসূলুল্লাহ (সঃ) মাগরিবের ফরয নামাযের পর সুন্নতে সূরা কাফেরূন এবং সূরা ইখলাস পড়েছেন।(আহমদ, আল-মাকদেসী, নাসাঈ, ইবনু নসর এবং তাবারানী)



আসরের নামাযে/সালাতে রাসুলুল্লাহ (সা:) যা পড়তেন

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

আসরের নামাযে/সালাতে রাসুলুল্লাহ (সা:) যা পড়তেন

৩. আসরের নামায

রসূলুল্লাহ (সঃ) প্রথম দুই রাকআতে সূরা ফাতেহার পর একটি করে অন্য সূরা পড়তেন। দ্বিতীয় রাকআতের তুলনায় প্রথম রাকআতে দীর্ঘ কেরাআত পড়েছেন।(আবু দাউদ, ইবনু খোযায়মাহ) সাহাবায়ে কেরামের ধারণা ছিল যে, তিনি লম্বা কেরাআতের মাধ্যমে চাইতেন যেন লোকেরা ঐ রাকআতটি পায়।(আহমদ, মুসলিম) তিনি প্রত্যেক রাকআতে ১৫ আয়াত করে পড়তেন, যা যোহরের নামাযের কেরাআতের অর্ধেক পরিমাণ ছিল।

তিনি কখনও শেষ দুই রাকআতে প্রথম দুই রাকআতের অর্ধেক পরিমাণ কেরাআত পড়তেন।(বোখারী ও মুসলিম)

তিনি শেষ দুই রাকআতে কখনো শুধু সূরা ফাতেহা পড়েছেন।(বোখারী ও মুসলিম) তিনি কখনও আসরের নামাযে এমনভাবে কেরাআত পড়তেন যে, সাহাবায়ে কেরাম তা শুনতে পেতেন।(বোখারী ও মুসলিম)

যোহরের নামাযে আমরা যেসব সূরার কথা উল্লেখ করেছি আসরের নামাযে তিনি সেসব সূরা পড়তেন।

যোহরের নামাযে/সালাতে রাসুলুল্লাহ (সা:) যা পড়তেন

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

যোহরের নামাযে/সালাতে রাসুলুল্লাহ (সা:) যা পড়তেন

২. যোহরের নামায

রসূলুল্লাহ (সঃ) যোহরের ফরয নামাযের প্রথম দুই রাকআতে সূরা ফাতেহা এবং একটা করে অন্য সূরা পড়তেন। তিনি প্রথম রাকআতে দ্বিতীয় রাকআত অপেক্ষা লম্বা সূরা পড়তেন।(বোখারী, মুসলিম)

তিনি কখনও যোহরের প্রথম রাকআতে কেরাআত এতো লম্ব করতেন যে, নামায শুরু হওয়ার পর কোনো ব্যক্তি 'বাকী' নামক স্থানে গিয়ে প্রাকৃতিক প্রয়োজন সেরে সেখান থেকে ঘরে ফিরে উযু করে পরে মসজিদে এসে রসূলুল্লাহ (সঃ)-কে প্রথম রাকআতে পেতেন।(মুসলিম, বোখারী কেরাআত অধ্যায়)

লোকদের ধারণা, রসূলুল্লাহ (সঃ)-এমনটি করতেন এজন্যে যেনো লোকেরা প্রথম রাকআত পায়।(আবু দাউদ-বিশুদ্ধ সনদ, ইবনু খোযায়মাহ)

তিনি কখনও দুই রাকআতে ত্রিশ আয়াত পরিমাণ পড়তেন। যেমন সূরা সাজদাহ। আয়াত সংখ্যা ৩০। সাথে তো সূরা ফাতেহা থাকতোই।(আহমদ, মুসলিম)

তিনি কখনও সূরা আত্-তারেক, সূরা আল-বুরূজ এবং সূরা আল-লাইল জাতীয় সূরা পড়তেন।(আবু দাউদ, তিরমিযী এটাকে সহীহ বলেছেন। ইবনু খোযায়মাও একে সহীহ বলেছেন)

তিনি কখনও সূরা ইনশিক্বাক বা এ জাতীয় অন্য সূরা পড়েছেন।(ইবনু খোযায়মা-১/৬৭ পৃঃ)

যোহর ও আসরের নামাযে লোকেরা রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দাড়ির নড়াচড়া দেখে তাঁর কেরআত পড়া উপলব্ধি করতেন।(বোখারী, আবু দাউদ)

যোহরের শেষ দু' রাকআতে তিনি প্রথম দু' রাকআতের চাইতে সংক্ষিপ্ত কেরআত পড়তেন। অর্থাৎ প্রথম দুই রাকআতের অর্ধেক-পনের আয়াত পরিমাণ পড়তেন।(আহমদ, মুসলিম। এই হাদীস যোহরের শেষ দুই রাকআতে সূরা ফাতেহার-সাথে কেরাআত পড়া সুন্নত বলে প্রমাণ করে। সাহাবায়ে কেরাম এরূপই করতেন। আবু বকর (রাঃ)-ও এরূপ করেছেন। যোহর সহ অন্যান্য নামাযে ইমাম শাফেঈও এরূপ করেছেন। পরবর্তী আলেমদের মধ্যে আবুল হাসানাত (লক্ষ্মৌ) 'আতালীক আল-মোমাজ্জাদ আলা মোআজ মোহাম্মদ কিতাবের ১০২ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, কি আশ্চর্যের বিষয় যে, আমাদের আলেমরা শেষ দুই রাকআতে সূরা পড়লে ভুলের সাজদাকে বাধ্যতামূলক করেন। ইবরাহীম হালাবী এবং ইবনু আসীর এর যথার্থ উত্তর দিয়েছেন। কোন সন্দেহ নেই, যারা এরকম বলেন, তাদের কাছে হয় হাদীস পৌঁছেনি, অথবা তারা হাদীসের প্রতি গুরুত্ব দেননি।)

আবার কোন সময় শেষ দু' রাকআতে শুধু সূরা ফাতেহা পড়তেন।(বোখারী, মুসলিম)

কখনও তিনি তাদেরকে শেষ দু' রাকআতে আয়াত শুনাতেন।(ইবনু খোযায়মাহ, যিয়া আল-মাকদেসীর মোখতারা গ্রন্থে সহীহ সনদ সহকারে বর্ণিত)

সাহাবায়ে কেরাম রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কণ্ঠে এ দু রাকআতে সূরা আল-আলা এবং সূরা আল গাশিয়া পড়ার গুনগুন আওয়াজ শুনতেন।(বোখারী কেরাআত অধ্যায়, তিরমিযী) কখনও সূরা বুরূজ, সূরা তারেক এবং এ জাতীয় অন্য সূরা পড়তেন।(মুসলিম)

কখনও তিনি সূরা আল-লাইল কিংবা অনুরূপ সূরা পড়েছেন।(বোখারী, মুসলিম)

ফজরের নামাযে/সালাতে রাসুলুল্লাহ (সা:) যা পড়তেন

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

রসূলুল্লাহ (সঃ) নামাযে যা পড়তেন

রসূলুল্লাহ (সঃ) নামাযে যে সকল সূরা-কেরাআত পড়তেন, তা পাঁচ ওয়াক্ত নামাযসহ অন্যান্য নামাযে বিভিন্ন রকম হত। নীচে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

                                                                 ১. ফজরের নামায

তিনি ফজরের নামাযে সূরা কাফ থেকে পরবর্তী ৭টি বড়ো সূরার যে কোনো একটি পড়তেন। (নাসাঈ, আহমদ-সনদ সহীহ)

কখনও সূরা ওয়াকেআ (৯৬:৫৬) বা এজাতীয় অন্য সূরা ফরয দুই রাকআতে পাঠ করতেন। (আহমদ, ইবনু খোযায়মাহ হাকেম এবং আল্লামা যাহাবী একে সহীহ বলেছেন)

বিদায় হজ্জে ফজরের নামাযে তিনি সূরা আত্-তুর পড়েছেন।(বোখারী, মুসলিম) তিনি কখনও প্রথম রাকআতে সূরা 'কাফ ওয়াল কোরআনুল মজীদ' সহ এজাতীয় অন্য সূরা পড়েছেন। (মুসলিম, তিরমিযী) তিনি কখনও কেসারে মুফাসসাল সূরা যেমন সূরা তাকভীর (৮১:১৫) পাঠ করতেন।(মুসলিম, আবু দাউদ) তিনি একবার দুই রাকআতেই সূরা যিলযাল পড়েছেন। বর্ণনাকারী বলেছেন, জানি না, রসূলুল্লাহ (সঃ) ভুলে পড়েছেন, না কি ইচ্ছাকৃতভাবে পড়েছেন।(আবু দাউদ, বায়হাকী-সনদ বিশুদ্ধ। বুঝা যায় যে, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে তা করেছেন বৈধতার জন্য)

একবার তিনি সফরে সূরা নাস ও সূরা ফালাক পড়েছেন। (আবু দাউদ, ইবনু খোযায়মাহ, ইবনু বিসরান আমালী গ্রন্থে, ইবনু আবী শায়বা এবং আল্লামা যাহাবী একে সহীহ বলেছেন) তিনি উকবাহ বিন আমের (রাঃ)-কে বলেন, তুমি তোমার নামাযে মোআওয়েযাতাইন (সূরা ফালাক ও নাস) পড়। (আবু দাউদ, আহমদ-সনদ বিশুদ্ধ)

কখনও তিনি এর চাইতেও বেশি পড়তেন। তিনি ৬০ আয়াত কিংবা আরো বেশি পড়তেন।(বোখারী, মুসলিম) একজন বর্ণনাকারী বলেছেন, জানি না, এক রাকআতে নাকি দুই রাকআতে তা পড়েছেন।

তিনি কখনও সূরা রূম (নাসাঈ, আহমদ, বায্যার) এবং কখনও সূরা ইয়াসীন পড়েছেন।( আহমদ-সনদ সহীহ)

একবার তিনি মক্কায় ফজর পড়েন। তিনি সূরা আল্-মোমেনুন দিয়ে শুরু করেন। মূসা ও হারূন (আঃ) কিংবা বর্ণনাকারীর সন্দেহ অনুযায়ী, ঈসা (আঃ)-এর উল্লেখ আসার পর নাক দিয়ে শ্লেষ্মা বের হয়। তিনি তখন রুকুতে চলে যান।(মুসলিম, বোখারী)

ফজরে কখনও তিনি সূরা আস্-সাফফাত পড়ে লোকদের ইমামতি করতেন।(আহমদ, আবু ইয়ালী, মাকদেসী)

'শুক্রবারে তিনি প্রথম রাকআতে সূরা আলিফ-লাম-মীম তানযীল (আস্সাজদাহ) এবং দ্বিতীয় রাকআতে সূরা আদ-দাহর পড়তেন। (বোখারী, মুসলিম) তিনি প্রথম রাকআতে কেরাআত দীর্ঘ এবং দ্বিতীয় রাকআতে সংক্ষিপ্ত করতেন।(বোখারী, মুসলিম)

ফজরের সুন্নতের কেরাআত

রসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের দুই রাকাআত সুন্নতে সংক্ষিপ্ত কেরাআত পড়তেন।(আহমদ-সনদ বিশুদ্ধ) এমন কি আয়েশা (রাঃ) বলতেন: তিনি কি সূরা ফাতেহা পড়েছেন? (বোখারী, মুসলিম)

তিনি কোন সময় প্রথম রাকাআতে সূরা ফাতেহার পর সূরা বাকারার ১৩৬ আয়াত অর্থাৎ قُولُوا آمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْنَا

শেষ পর্যন্ত পড়তেন এবং দ্বিতীয় রাকআতে সূরা আলে-ইমরানের ৬৪ আয়াত অর্থাৎ

قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ -

শেষ পর্যন্ত পড়তেন। (মুসলিম, ইবনু খোযায়মাহ ও হাকেম)

কখনও আবার এর পরিবর্তে সূরা মোমেনূনের ৫২ নং আয়াত পড়তেন।(মুসলিম, আবু দাউদ)

আয়তাটি হচ্ছে:

فَلَمَّا أَحَسَّ عِيسَى مِنْهُمُ الْكُفْرَ.

কখনও তিনি প্রথম রাকআতে সূরা কাফেরূন (নং-১০৯) এবং ২য় রাকআতে সূরা ইখলাস (নং-১১২) পড়তেন।(মুসলিম, আবু দাউদ)

তিনি একবার এক ব্যক্তিকে প্রথম সূরাটি প্রথম রাকআতে পড়তে দেখে বলেন, 'এই বান্দাহটি তার রবের প্রতি ঈমান এনেছে এবং দ্বিতীয় সূরাটি দ্বিতীয় রাকআতে পড়তে দেখে বলেন, 'এই বান্দাহটি তার রবকে চিনতে পেরেছে।(তাহাবী, ইবনু হিব্বান, ইবনে বিশরান। আল্লামা যাহাবী একে সহীহ বলেছেন)

প্রকাশ্যে ও গোপনে কেরাআত পড়া এবং রাতের নামাযে কেরাআত প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে পড়া

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

প্রকাশ্যে ও গোপনে কেরাআত পড়া

রসূলুল্লাহ (সঃ) ফজরের ফরয নামায এবং মাগরিব ও ইশার ফরয নামাযের ১ম দুই রাকআতে প্রকাশ্যে কেরাআত পড়তেন। তিনি যোহর ও আসরের ফরয নামায, মাগরেবের ফরযের তৃতীয় রাকআত এবং ইশার ফরযের শেষ দুই রাকআতে কেরাআত অপ্রকাশ্যে পড়তেন। (ইমাম নববী বলেছেন, আমাদের পূর্বসূরীরা তাদের পূর্বসূরীদের কাছ থেকে সর্বসম্মতভাবে বিশুদ্ধ হাদীসের ভিত্তিতে এরূপ করে আসছেন)

সাহাবায়ে কেরাম তাঁর দাড়ির নড়াচড়া দেখে বুঝতে পারতেন, রসূলুল্লাহ (সঃ) অপ্রকাশ্যে কেরাআত পড়ছেন। (বোখারী, আবু দাউদ)

কোন সময় রসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে আয়াত শুনাতেন। অর্থাৎ এতোটুকু অপ্রকাশ্য আওয়াযে পড়তেন যে, নিকটবর্তী লোকেরা তা শুনতে পেত। (বোখারী ও মুসলিম)

তিনি জুমআ, দুই ঈদ এবং ইস্তিস্কার (বৃষ্টি প্রার্থনার) নামাযে কেরআত প্রকাশ্যে পড়তেন। (বোখারী, আবু দাউদ)

রাতের নামাযে কেরাআত প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে পড়া 

(আবদুল হক 'তাহাজ্জুদ' গ্রন্থে লিখেছেন: দিনে নফল ও সুন্নতে রসূলুল্লাহ (সঃ) প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে কিভাবে কেরাআত পড়তেন, তা সহীহ হাদীস দ্বারা জানা যায় না। তবে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, তিনি অপ্রকাশ্যে কেরাআত পড়েছেন। রসূলুল্লাহ (সঃ) থেকে বর্ণিত, একদিন তিনি আবদুল্লাহ বিন হোযাফার পাশ দিয়ে দিনে অতিক্রম করেন। আবদুল্লাহ দিনে প্রকাশ্যে কেরাআত পড়েন। তিনি আবদুল্লাহকে বলেন, হে আবদুল্লাহ! আল্লাহকে শুনাও, আমাদেরকে নয়। হাদীসটি দুর্বল।)

রসূলুল্লাহ (সঃ) রাতের নামাযে কখনও কেরাআত প্রকাশ্যে এবং কখনও অপ্রকাশ্যে পড়তেন। (মুসলিম, বোখারী আফআলুল ইবাদ গ্রন্থে)। তিনি যখন ঘরে কেরাআত পড়তেন, তখন হুজরায় যিনি থাকতেন তিনি তাঁর কেরাআত শুনতেন।-(আবু দাউদ, তিরমিযী-শামায়েল গ্রন্থে বিশুদ্ধ সনদ সহকারে) এ কথার অর্থ হল, তিনি প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যের মাঝামাঝি আওয়াজে কেরাআত পড়তেন।

তিনি কখনও আরও একটু উঁচু আওয়াজে কেরাআত পড়তেন। হুজরার বাইরে অবস্থানকারী ব্যক্তি তা শুনতে পেতেন। (নাসাঈ, তিরমিযী-শামায়েল গ্রন্থে এবং বায়হাকী 'আদ্‌দালায়েল' গ্রন্থে বিশুদ্ধ সনদ সহকারে তা বর্ণনা করেছেন)।

আর এ ভাবেই কেরাআত পড়ার জন্য তিনি আবু বকর এবং উমর (রাঃ)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এক রাতে তিনি বের হন এবং আবু বকর (রাঃ)-কে ছোট আওয়াজে নামায পড়তে দেখেন। তিনি উমর (রাঃ)-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাঁকে উঁচু আওয়াজে নামায পড়তে দেখেন। তাঁরা উভয়ে যখন রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছ একত্রিত হন, তখন রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, হে আবু বকর! আমি তোমার কাছে দিয়ে যাওয়ার সময় তুমি ছোট আওয়াজে কেরাআত পড়ছিলে! আবু বকর বলেন, আমি যার কাছে দোয়া করেছি তাকে শুনিয়েছি ইয়া রসূলাল্লাহ! তিনি উমরকে বলেন, আমি তোমার কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় তুমি উঁচু আওয়াজে নামায পড়ছিলে। উমর বলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি তন্দ্রাচ্ছন্ন লোককে জাগাই এবং শয়তানকে দূর করি। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, হে আবু বকর! তোমার আওয়াজ কিছুটা চড়া করো এবং উমরকে বলেন, তোমার আওয়াজ কিছুটা কমাও।(আবু দাউদ, হাকেম। আল্লামা যাহাবী এটিকে সহীহ বলেছেন)


রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, প্রকাশ্যে কোরআন পাঠকারী প্রকাশ্যে দান-সদকারীর মত এবং গোপনে কোরআন পাঠকারী গোপনে দান-সদকাকারীর মত। (আবু দাউদ, হাকেম)

সালাতে শুধু সূরা ফাতেহা পড়াও জায়েয

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

শুধু সূরা ফাতেহা পড়াও জায়েয

মোআয (রাঃ) রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ইশার নামায পড়ে ঘরে ফিরে যেতেন এবং নিজ গোত্রের সাথীদের নিয়ে পুনরায় নামাযের ইমামতি করতেন।

এক রাত তিনি ফিরে যান এবং তাদের নিয়ে নামায পড়েন। তাঁর নিজ গোত্র বনী সালামার এক যুবকও তার সাথে নামায পড়েন। যুবকটির নাম সালিম। নামায দীর্ঘ হওয়ায় যুবকটি নামায ছেড়ে দেয় এবং মসজিদের এক প্রান্তে পৃথকভাবে নামায আদায় করে। তারপর নিজ উটের লাগাম ধরে বেরিয়ে যায়। মোআযের নামায শেষ হলে তাকে ঘটনাটি জানানো হয়। মোআয বলেন, তার মধ্যে মুনাফেকী আছে। আমি তার এই ঘটনার বিষয়ে রসূলুল্লাহ (সঃ)-কে অবহিত করবো। যুবকটিও বলল, আমিও মোআযের বিষয়টি সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (সঃ)- কে অবহিত করবো। পরের দিন সকালে তারা রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে যান। মোআয যুবকটি সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (সঃ)-কে খবর দেন। যুবকটি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! মোআয আপনার কাছে রাতে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করে। পরে ফিরে যায় এবং আমাদের নামায দীর্ঘ করে। তখন রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, হে মোআয! তুমি কি ফেতনা সৃষ্টিকারী? রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, হে ভাতিজা! তুমি যখন নামায পড়, তখন তা কিভাবে আদায় কর? যুবকটি উত্তর দিল, আমি সূরা ফাতেহা পড়ি। তারপর আমি আল্লাহর কাছে বেহেশত প্রার্থনা করি এবং দোযখ থেকে আশ্রয় চাই। কিন্তু আমি আপনার ও মোআযের ঐ সকল সুরেলা কেরআত বুঝি না। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, আমি ও মোআয এই দু'টো কিংবা একটার মধ্যেই থাকি। (অর্থাৎ সূরা ফতেহার সাথে একটি সূর‍্য কিংবা শুধু সূরা ফাতেহা পড়ি) যুবকটি বলল, শীঘ্রই মোআয নিজ গোত্রে ফিরে আসার পর যখন শত্রুর আগমনের খবর পাবে, তখন বিষয়টি বুঝতে পারবে। বর্ণনাকারী বলেন, শত্রু আসার পর যুবকটি যুদ্ধে শহীদ হয়ে গেল। এরপর রসূলুল্লাহ (সঃ) মোআযকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার ও আমার বিরুদ্ধে অভিযোগকারী প্রতিপক্ষের কি খবর? মোআয বলেন, হে আল্লাহর রসূল! সে আল্লাহকে সত্য জেনেছে। আমিই বরং তাকে মিথ্যা জ্ঞান করেছি। সে শহীদ হয়ে গেছে। (আবু দাউদ, বায়হাকী বিশুদ্ধ সনদ সহকারে। এটা নামাযের ভেতর ও বাইরে এবং ফরয ও নফলে করণীয়)

ইবনু খোযায়মাহ, বায়হাকী-বিশুদ্ধ সনদ, আবু দাউদ। মুল ঘটনা বোখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, 'রসূলুল্লাহ (সঃ) দুই রাকআত নামায পড়েছেন, কিন্তু তাতে সূরা ফাতেহা ছাড়া আর কিছু পড়েননি।' আহমদ, মোসনাদে হারেস বিন উসামা। বায়হাকী দুর্বল সনদ সহকারে তা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু মোআয ও ইবনু আব্বাসের হাদীস দ্বারা নামাযে শুধু সূরা ফাতেহা পড়ার যথার্থতা প্রমাণিত হয়েছে।

সালাতে একই রাকআতে একই ধরনের সূরা কিংবা ভিন্ন ধরনের সূরা পড়া

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

একই রাকআতে একই ধরনের সূরা কিংবা ভিন্ন ধরনের সূরা পড়া

রসূলুল্লাহ (সঃ) একই ধরনের লম্বা সূরাগুলো এক সাথে পড়তেন।(একই ধরনের সূরা মানে, অর্থের দিক থেকে সাদৃশপূর্ণ সূরা। যেমন, উপদেশ, বিধান, কিস্সা ইত্যাদি। (সূরা থেকে শেষ পর্যন্ত সূরা গুলোকে সর্বসম্মতভাবে লম্বা সূরা বলা হয়)

তিনি একই রাকআতে সূরা আররাহমান (৫৫:৭৮) এবং সূরা আন-নাজম (৫৩:৬২) পড়তেন। অনুরূপভাবে তিনি একই রাকআতে নিম্নের সূরা একত্রে পড়তেন:

সূরা ক্বামার (৫৪:৫৫) এবং সূরা আল্ হাক্কা (৬৯:৫২)

সূরা তূর (৫২:৪৯) এবং সূরা আয-যারিয়াত (৫১:৬০)

সূরা সাআলা সায়েলুন (৭০:৪৪) এবং ওয়ান্নাযিআত (৭৯:৪৬)

সূরা ওয়াকেআহ (৫৬:৯৬) এবং সূরা কূলম (৬৮:৫২)

সূরা সাআলা সায়েলুন লিল-মোতাফফেফীন (৮৩:৩৬) এবং আবাসা (৮০:৪২)

সূরা আল-মোদ্দাসসের (৭৪:৫৬) এবং সূরা আল-মোযযাম্মেল (৭৩:২০)

সূরা দাহ্র (৭৬:৩১) এবং সূরা কেয়ামাহ (৭৫:৪০)

সূরা নাবা (৭৮: ৪০) এবং সূরা আল-মোরসালাত (৭৭:৫০)

সূরা আদ-দোখান (৪৪:৫৯) এবং সূরা তাকভীর (৮১:২৯)।(বোখারী মুসলিম)

কোন সময় তিনি ৭টি লম্বা সূরা থেকে একাধিক সূরা এক সাথে পড়তেন। যেমন সালাতুল লাইলে তিনি এক রাকআতে সূরা বাকারা, সূরা নিসা এবং সূরা আলে-ইমরান পড়তেন। তিনি বলতেন, দীর্ঘ কেয়াম বিশিষ্ট নামায উত্তম। (মুসলিম, তাহাবী)

তিনি যখন এই আয়াত পড়তেন:

أَلَيْسَ ذَلِكَ بِقَادِرٍ عَلَى أَنْ يُحْيِيَ الْمَوْتِي -তখন বলতেন سُبْحَانَكَ فَبَلَى আর তিনি যখন পড়তেন سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ عد سُبْحَانَ رَبِّي الأعلى 707000 677 الا على

প্রথমোক্ত আয়াতে আল্লাহ প্রশ্ন করেছেন, 'মহান আল্লাহ কি মৃতদেহকে জীবিত করতে সক্ষম নন? রসূলুল্লাহ (সঃ) এর জওয়াবে বলতেন: তুমি পবিত্র এবং তুমি তা করতে সক্ষম। দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, 'তোমার মহান রবের পবিত্রতা বর্ণনা কর।' এর জওয়াবে তিনি বলতেন: 'আমার মহান রবের জন্যে পবিত্রতা।'