সালামের আগের বিভিন্ন প্রকার দোআ
রসূলুল্লাহ (সঃ) নামাযের মধ্যে বিভিন্ন রকম দোআ করতেন। একেক সময় একেক দোআ করতেন । (এখানে তাশাহহুদ না বলে নামায বলার কারণ হল, হাদীসের শব্দ হুবহু এরকম। এতে নামায শব্দের উল্লেখ থাকায় তা নামাযের দোআ'র উপযুক্ত প্রত্যেক স্থানকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। যেমন, সাজদাহ, তাশাহ্হুদ ইত্যাদি। আগেই এগুলোতে দোআর নির্দেশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে)
তিনি মুসল্লীদেরকে এ সকল দোআর যে কোন একটা নির্বাচন করার আদেশ দিয়েছেন। (বোখারী, মুসলিম। আসরাম বলেছেন, আমি ইমাম আহমদকে জিজ্ঞেস করি, তাশাহ্হুদের পর কি দোআ' পড়বো? তিনি উত্তর দেন, হাদীসে বর্ণিত দোআ'। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি, রসূলুল্লাহ (সঃ) কি একথা বলেননি যে, যে কোন একটি দোআ নির্বাচন কর? তিনি বলেন, হাদীসের একটি দোআ' নির্বাচন কর। আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করি, হাদীসে কোন্ দোআ' আছে? ইবনে তাইমিয়া তাঁর মজমুউল ফাতাওয়া গ্রন্থে এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, হাদীসের দোআ হচ্ছে উত্তম)
দোআগুলো হচ্ছে:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُبِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَأَعُوذُبِكَ مِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ وَأَعُوذُبِكَ مِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ اللَّهُمَّ إِنِّي اعُوْذُبِكَ مِنَ الْمَاثَمِ وَالْمَغْرَمِ -
অর্থঃ "হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে কবর আযাব, দাজ্জালের বিপদ, জীবন ও মৃত্যুর পরীক্ষা থেকে পানাহ চাই। হে আল্লাহ্! আমি তোমার কাছে গুনাহ ও ঋণ (আয়েশা (রাঃ) বলেন, এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহকে প্রশ্ন করেন, আপনি কেন ঋণ থেকে এত বেশী পানাহ চান? রসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেন, মানুষ ঋণগ্রস্ত হলে কথা বলার সময় মিথ্যা বলে এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে) থেকে আশ্রয় চাই।” (বোখারী, মুসলিম)
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُبِكَ مِنْ شَرِّ مَا عَمِلْتٌ وَمِنْ شَرِّ مَا لَمْ أَعْمَلُ بَعْدُ -
অর্থঃ হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আমার অতীত আমলের অনিষ্ট থেকে পানাহ চাই এবং ভবিষ্যতে নেক আমল না করার মন্দ থেকেও পানাহ চাই। (নাসাঈ- সনদ সহীহ, কিতাবুস সুন্নাহ -ইবনু আবী আসেম)
৩ اللَّهُمَّ حَاسِبْنِي حِسَابًا يَسِيرًا .
অর্থঃ হে আল্লাহ! আমার হিসাব নিও সহজ করে। (আহমদ। হাকেম এটিকে সহীহ বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী তা সমর্থন করেছেন)
اللَّهُمَّ بِعِلْمِكَ الْغَيْبِ وَقُدْرَتِكَ عَلَى الْخَلْقِ أَحْيِنِي مَا عَلِمْتَ الْحَيَاةَ خَيْرًا لِي وَتَوَفَّنِي إِذَا كَانَتِ الْوَفَاةَ خَيْرًا لِي اللَّهُمَّ
মুহাম্মাদ (সঃ)
وَاسْأَلُكَ خَشْيَتَكَ فِي الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ وَأَسْأَلُكَ كَلِمَةَ الْحَقِ وَالْعَدْلِ فِي الْغَضَبِ وَالرِّضَى وَاسْأَلُكَ الْقَصْدَ فِي الْفَقْرِ وَالْغِنَى وَأَسْأَلُكَ نَعِيْمًا لَا يُبِيدُ وَأَسْأَلُكَ قُرَّةَ عَيْنٍ لَا تَنْفَدُ وَلَا تَنْقَطِعُ وَاسْأَلُكَ الرِّضَى بَعْدَ الْقَضَاءِ وَاسْأَلُكَ بَرْدَ الْعَيْشِ بَعْدَ الْمَوْتِ وَاسْأَلَكَ لَذَّةَ النَّظَرِ إِلَى وَجْهِكَ وَاسْأَلُكَ الشَّوْقَ إِلَى لِقَاعِكَ فِي غَيْرِ ضَرَاءٍ مُّضِرَّةٍ وَلَا فِتْنَةٍ مُضِلَّةِ اللَّهُمَّ زَيِّنَا بِزِيَّنَةِ الْإِيْمَانِ وَاجْعَلْنَا هُدَاةٌ مُهْتَدِينَ .
অর্থ: হে আল্লাহ! তোমার গায়েব সম্পর্কিত জ্ঞান এবং সৃষ্টির উপর
তোমার শক্তি দ্বারা আমাকে ততদিন জীবিত রেখো যতদিন আমার জন্য হায়াতকে তুমি উত্তম মনে কর এবং যখন আমার জন্য মৃত্যুকে উত্তম মনে করবে, তখন মৃত্যু দান করিও। হে আল্লাহ! আমি তোমার উপস্থিতি ও অনুপস্থিতিতে আল্লাহভীতি কামনা করি, রাগ ও সন্তুষ্টির মুহূর্তে আমি সত্য কথা বলা ও ইনসাফ করার তাওফীক প্রার্থনা করি। অভাব ও প্রাচুর্যের মধ্যে মিতব্যয়িতা চাই, তোমার কাছে ধ্বংসহীন নেয়ামত চাই, চোখের অবিচ্ছিন্ন শীতলতা কামনা করি, তাকদিরের পরে তোমার সন্তুষ্টি প্রার্থনা করি। মৃত্যুর পর জীবনের শীতলতা চাই, তোমার চেহারার প্রতি দৃষ্টি লাভের আনন্দ প্রার্থনা করি, তোমার সাক্ষাতের জন্য আগ্রহ কামনা করি, কোন ক্ষতিকর বিষয় এবং পথভ্রষ্টকারী ফেতনা ছাড়া। হে আল্লাহ! আমাদেরকে ঈমানের রং-এ রঙ্গীন কর এবং আমাদেরকে হেদায়াতকারী ও হেদায়াতপ্রাপ্ত বানিয়ে দাও।(নাসাঈ, হাকেম এটিকে সহীহ বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী তা সমর্থন করেছেন)
৫. রসূলুল্লাহ (সঃ) নামাযে পড়ার জন্য আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)-কে নিম্নের দোআ শিক্ষা দিয়েছেন
اللَّهُمَّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي ظُلْمًا كَثِيرًا وَلَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا. أَنْتَ فَاغْفِرْ لِي مَغْفِرَةً مِّنْ عِنْدِكَ وَارْحَمْنِي إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفُورُ الرَّحِيمِ -
অর্থঃ হে আল্লাহ! আমি আমার নফসের উপর বিরাট যুলুম করেছি, তুমি ছাড়া আর কেউ তা মাফ করতে পারবে না। তুমি আমাকে তোমার কাছ থেকে ক্ষমা দান কর এবং আমাকে রহম কর। নিশ্চয়ই তুমি অত্যধিক ক্ষমাশীল ও মেহেরবান।(বোখারী, মুসলিম)
৬. রসূলুল্লাহ (সঃ) আয়েশা (রাঃ)-কে নিম্নের দোআ শিক্ষা দেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ مِنَ الْخَيْرِ كُلِّهِ عَاجِلِهِ وَاجِلِهِ مَا عَلِمْتُ مِنْهُ وَمَا لَمْ أَعْلَمُ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الشَّرِ كُلِّهِ عَاجِلِهِ وَاجِلِهِ مَا عَلِمْتُ مِنْهُ وَمَا لَمْ أَعْلَمُ وَأَسْأَلُكَ الْجَنَّةَ وَمَا قَرَّبَ إِلَيْهَا مِنْ قَوْلِ أَوْ عَمَلٍ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ النَّارِ وَمَا قَرَّبَ إِلَيْهَا مِنْ قَوْلِ أَوْ عَمَلٍ وَاسْأَلُكَ مِنَ الْخَيْرِ مَا سَأَلَكَ عَبْدَكَ وَرَسُولُكَ مُحَمَّدٌ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّمَا اسْتَعَاذَكَ مِنْهُ عَبْدِكَ وَرَسُولُكَ مُحَمَّد وَاسْأَلُكَ مَا قَضَيْتَ لِي مِنْ أَمْرٍ أَنْ تَجْعَلَ عَاقِبَتَهُ لِى رُشْدًا -
অর্থঃ হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে দ্রুত আমার জানা-অজানা সকল কল্যাণ প্রার্থনা করি। আমি তোমার কাছে দ্রুত ও বিলম্বিত সকল মন্দ যা আমি জানি এবং যা জানি না তা থেকে পানাহ চাই। আমি তোমার কাছে বেহেশত ও তা লাভ করতে সহায়ক কথা ও কাজ কামনা করি এবং তোমার কাছে দোযখ এবং যে কথা ও কাজ দোযখের নিকটবর্তী করে, তা থেকে পানাহ চাই। আমি তোমার কাছে তোমার বান্দাহ ও রসূল মোহাম্মদ (সঃ) যে কল্যাণ কামনা করেছেন সে কল্যাণ কামনা করি। তোমার কাছে যে মন্দ ও অকল্যাণ থেকে তোমার বান্দাহ ও রসূল মোহাম্মদ (সঃ) আশ্রয় চেয়েছেন আমি সে সকল মন্দ ও অকল্যাণ থেকে আশ্রয় চাই। আমি তোমার কাছে আমার ভাগ্যে নির্ধারিত বিষয়সমূহের ভাল পরিণাম কামনা করি। (আহমদ, আতায়ালিসী, বোখারী, আল্আদাব আল-মোফরাদ, ইবনু মাজাহ। হাকেম এটিকে সহীহ বলেছেন এবং যাহাবী তা সমর্থন করেছেন)
৭. রসূলুল্লাহ (সঃ) এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি নামাযে কি
(দোআ') কর? লোকটি জওয়াব দিল, আমি তাশাহহুদ পড়ি, আল্লাহ্র কাছে বেহেশত চাই এবং দোযখ থেকে পানাহ চাই। আল্লাহর কসম, আমি আপনার এবং মোআ'যের অস্পষ্ট দোআ'র গুনগুন শব্দ বুঝতে পারি না। তিনি তাঁকে বলেন, তুমি আমাদের দোআকে তোমার দোআর কাছাকাছি কর। (আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ-সনদ সহীহ)
৮. রসূলুল্লাহ (সঃ) এক ব্যক্তিকে তাশাহহুদে নিম্নোক্ত দোআ পড়তে শুনেছেনঃ
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ يَا اللَّهُ الْوَاحِدُ الْأَحَدُ الصَّمَدُ الَّذِي لَمْ يَلِدُ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا اَحَدٌ أَنْ تَغْفِرَ لِي ذُنُوبِي إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ -
অর্থঃ "হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করি, হে আল্লাহ! তুমি এক ও একক, কারোর মুখাপেক্ষী তুমি নও, তুমি সেই সত্তা যিনি কোন সন্তান জন্ম দেননি এবং নিজে জন্ম নেননি, যার কোন সমকক্ষ নেই, আমার গুনাহ মাফ কর, তুমি নিশ্চয়ই সর্বাধিক ক্ষমাশীল ও মেহেরবান।"
তা শুনার পর রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, একে মাফ করে দেয়া হয়েছে, একে মাফ করে দেয়া হয়েছে। (আবু দাউদ, নাসাঈ, আহমদ, ইবনু খোযায়মাহ্, হাকেম এটিকে সহীহ বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী তা সমর্থন করেছেন)
৯. রসূলুল্লাহ (সঃ) অন্য একজনকে তাশাহ্হুদে নিম্নের দোআ পড়তে শুনেনঃ
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنَّ لَكَ الْحَمْدُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ وَحْدَكَ لَا شَرِيكَ لَكَ الْمَنَّانُ يَا بَدِيعُ السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْجَنَّةَ وَأَعُوذُبِكَ مِنَ النَّارِ -
অর্থঃ “হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করি, সকল প্রশংসা তোমার জন্য, তুমি ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তুমি এক ও একক, তোমার কোন শরীক নেই। হে মান্নান, আসমান ও যমীনের স্রষ্টা, হে মহান ও সম্মানিত, হে চিরঞ্জীব, হে চিরস্থায়ী! আমি তোমার কাছে বেহেশত চাই এবং দোযখ থেকে পানাহ চাই।"
তার এ দোআ শুনে রসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবায়ে কেরামকে জিজ্ঞেস করেন, তোমরা কি জান সে কি দিয়ে দোআ করেছে? তাঁরা জওয়াব দেন, আল্লাহ ও তাঁর রসূল সর্বাধিক জানেন। তিনি বলেন, আমার প্রাণ যার হাতে তাঁর শপথ করে বলছি, সে আল্লাহর মহান নাম সহকারে দোআ করেছে। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, সে আল্লাহর 'ইসমে আযম' সহকারে দোআ করেছে। ঐ নামে তাঁকে ডাকা হলে তিনি জওয়াব দেন এবং কোন কিছু চাওয়া হলে তিনি দান করেন। (আবু দাউদ, আহমদ, আল-আবুল মোফরাদ-বোখারী, তাবারানী, আত্-তাওহীদ- ইবনু মানদাহ। সনদ সহীহ)
১০. রসূলুল্লাহ (সঃ) তাশাহ্হুদ ও সালামের মাঝে সর্বশেষ যা বলতেন, তা হচ্ছে।
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي مَا قَدَّمَتْ وَمَا أَخَرَتْ وَمَا أَسْرَرْتُ وَمَا أَعْلَنْتُ وَمَا اسرَفْتُ وَمَا أَنْتَ اعْلَمُ بِهِ مِنِّى أَنْتَ الْمُقَدِّمِ وَانتَ الْمُؤَخِّرُ لَا إِلَهَ الا انت .
অর্থঃ "হে আল্লাহ! আমার আগের ও পরেরর গুনাহ, গোপন ও প্রকাশ্য গুনাহ, অপচয় এবং যা সম্পর্কে তুমি আমার চাইতে সর্বাধিক জান সে-সকল গুণাহ মাফ কর। তুমিই প্রথম এবং তুমিই সর্বশেষ। তুমি ছাড়া কোন মা'বুদ নেই। (মুসলিম, আবু আওয়ানাহ)