(৩৭) বাইরে সুতরাহ ছাড়া নামায পড়া : মসজিদে নামায পড়লে ইমামের স্থান মেহরাব সুনির্দিষ্ট থাকে বলে সেখানে সুতরার দরকার হয়না। কিন্তু অন্যত্র কিংবা মসজিদের পেছনের অংশে নামায পড়লে সুতরাহ দিতে হবে। আবদুল্লাহ বিন ওমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'তোমরা সুতরাহ ছাড়া নামায পড়বে না এবং তোমাদের নামাযের সামনে দিয়ে কাউকে অতিক্রম করতে দেবে না। যদি সে না মানে তাহলে, তার সাথে লড়াই কর। কেননা, তার (শয়তান) সঙ্গী তার সাথে আছে।' (ইবনু খোযাইমাহ, হাকেম, বায়হাকী) হাকেম বলেছেন, মুসলিমের শর্তানুযায়ী হাদীসটি বিশুদ্ধ এবং আল্লামা জাহাবী একে সমর্থন করেছেন।
আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, নবী করীম (সঃ) বলেছেন: 'তোমাদের কেউ নামায পড়লে যেন সামনে সুতরাহ রাখে এবং এর নিকটবর্তী হয়। কেউ সামনে দিয়ে অতিক্রম করতে চাইলে তার সাথে লড়াই করবে; সে হচ্ছে শয়তান।' (আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ, বায়হাকী, ইবনু খোযাইমা এবং ইবনে আবি শায়বা)
সুতরার দূরত্বের পরিমাণ: সুতরার ও মুসল্লীর মধ্যকার দূরত্বের পরিমাণ কতটুকু হওয়া দরকার? এ বিষয়ে আবদুল্লাহ বিন ওমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। 'তিনি নিজে কা'বার ভেতর প্রবেশ করে দরজাকে পেছনে রেখে সামনের দিকে অগ্রসর হতেন এবং কা'বার দেয়াল থেকে প্রায় তিন হাত দূরে অবস্থান করে নামায পড়তেন। হযরত বেলাল (রাঃ)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, নবী করীম (সঃ) সে জায়গাতেই নামায পড়েছিলেন। এর দ্বারা প্রমাণ মিলে যে, তাঁর ও সুতরার মাঝখানের দূরত্ব ছিল প্রায় তিন হাত।' (বোখারী)
সহল বিন সা'দ থেকে বর্ণিত। 'রসূলুল্লাহ (সঃ) মোসাল্লা ও কা'বার দেয়ালের মাঝে একটি ভেড়া অতিক্রমের জায়গা ছিল।' ইমাম নওয়ী (রঃ) তাঁর শরহে মুসলিম গ্রন্থে লিখেছেন, এখানে 'মোসাল্লা' বলতে, সাজদার জায়গা বুঝানো হয়েছে।
আউন বিন আবি জোহাইফা থেকে বর্ণিত। 'তিনি বলেন, আমি আমার বাপের কাছে শুনেছি, নবী করীম (সঃ) (মক্কার মাআবদায়) বাতহায় দু'রাকাত করে জোহর ও আসর আদায় করেছেন। তাঁর সামনে ছিল আ'নজাহ। তাঁর সামনে দিয়ে নারী ও গাধা অতিক্রম করেছে।' (বোখারী, মুসলিম)
ইবনুল আসীর তাঁর 'আন-নেহায়া' গ্রন্থে লিখেছেন, আ'নজাহ হচ্ছে, তীরের অর্ধেক বা আরো একটু বড় ঠিক এ পরিমাণ। আ'নজায় তীরের মত দাঁত আছে।
আবদুল্লাহ বিন ওমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। 'নবী করীম (সঃ)-এর সামনে হারবাহ নামক যুদ্ধাস্ত্র দাঁড় করানো হত এবং তিনি এর দিকে ফিরে নামায পড়তেন।' (বোখারী, মুসলিম, নাসাঈ) 'হারবাহ' হচ্ছে সুঁচালো মাথা বিশিষ্ট লোহার তৈরি ছোট যুদ্ধাস্ত্র।
আবদুল্লাহ বিন ওমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। 'নবী করীম (সঃ) নিজ সওয়ারীকে সামনে রেখে নামায পড়তেন।' (বোখারী, মুসলিম, আবু দাউদ)
সুতরাহর পরিমাণ: সুতরাহ কত বড় হবে? এ মর্মে হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। 'তিনি বলেন, তাবুক যুদ্ধে নবী করীম (সঃ)-কে সুতরাহর পরিমাণ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি জবাবে বলেন: সওয়ারীর পিঠে রাখা আসনের কাঠের মত উঁচু হলেই চলবে।' (মুসলিম)
তালহা বিন ওবায়দুল্লাহ থেকে বর্ণিত। 'রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, নামাযের সময় সামনে সওয়ারীর আসনের কাঠের মত উঁচু জিনিস দাঁড় করালেই চলবে। এরপর সামনে দিয়ে কি যায় তা নিয়ে আর কোন পরোয়া নেই।' (মুসলিম)
ইমাম নওয়ী বলেছেন: সওয়ারীর আসনের শেষ মাথায় লাগানো কাঠের পরিমাণ হল হাতের হাড়ের পরিমাণ, অর্থাৎ হাতের দুই-তৃতীয়াংশ। পুরো হাত পরিমাণ নয়।
দাগ কি সুতরার বিকল্প হতে পারে? দাগ সুতরার বিকল্প হতে পারে না। তাই উঁচু সুতরাহ ব্যবহার করতে হবে। যে হাদীসে সুতরাহ না পেলে বিকল্প হিসেবে দাগ দেয়ার কথা এসেছে সে হাদীসের সনদ দুর্বল। তাই সে হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়। ইমামের সুতরাহ মোক্তাদীর জন্য যথেষ্ট।
দুর্বল হাদীসগুলোর একটা হল: আবু মাহজুরা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি নবী করীম (সঃ)-কে মসজিদে হারামে বাবে বনি শায়বা দিয়ে প্রবেশ করতে দেখেছি। তিনি কা'বা শরীফের সামনে কেবলামুখী হয়ে দাঁড়ান, একটি দাগ বা রেখা টানেন, তারপর। তাকবীরে তাহরীমার মাধ্যমে নামায শুরু করেন। লোকেরা কা'বা ও ঐ দাগের মাঝে তওয়াফ করতে থাকে।' (আবু ইয়ালী) এ হাদীসের সনদে হাসান বিন ওবাদ অজ্ঞাত ব্যক্তি। ইমাম জাহাবী বলেন, তিনি কে আমরা জানিনা। এছাড়াও সনদে ইবরাহীম বিন আবদুল মালেকও দুর্বল ব্যক্তি। তাই হাদীসটি দুর্বল। এ বিষয়ে এরূপ আরো কয়েকটি দুর্বল হাদীস রয়েছে।
দুই হারাম শরীফে সুতরাহর প্রয়োজনীয়তা: দুই হারাম শরীফ অর্থাৎ মক্কার মসজিদে হারাম এবং মদীনার মসজিদে নবওয়ীতেও সুতরাহর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কেননা, সুতরার ব্যাপারে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আদেশ সকল মসজিদের জন্য প্রযোজ্য। তা থেকে কোন মসজিদকে বাদ দেয়া হয়নি। তাই দুই হারাম শরীফও ঐ আদেশের শামিল। যদি ইমাম মসজিদের দেয়াল কিংবা মেহরাবের কাছে না দাঁড়ান।
সুতরাহ সম্পর্কিত একাধিক হাদীস তিনি মদীনার মসজিদে নবওয়ীতে বসেই বলেছেন। অপরদিকে মক্কার মসজিদে হারামে সুতরাহ সম্পর্কে আবদুল্লাহ বিন আবি আওফা থেকে বর্ণিত। 'তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সঃ) ওমরাহ করেন, বাইতুল্লাহর তওয়াফ করেন এবং মাকামে ইবরাহীমের পেছনে দু'রাকাত নামায পড়েন। তাঁর সাথীরা মানুষ থেকে তাঁকে আড়াল করে রাখেন।' (বোখারী)
ইয়াহইয়া বিন আবি কাসীর থেকে সহীহ সনদ সহকারে বর্ণিত। 'তিনি বলেন, আমি মসজিদে হারামে আনাস বিন মালেককে সামনে লাঠি দাঁড় করিয়ে নামায পড়তে দেখেছি।' (ইবনে আবি শায়বা)
সালেহ বিন কাইসান থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'আমি ইবনে ওমারকে কা'বার দিকে মুখ করে নামায পড়তে দেখেছি। তিনি তাঁর সামনে দিয়ে কাউকে অতিক্রম করতে দেননি। বরং বাধা দিয়েছেন।' (বোখারী)