মুখবন্ধ
রসূলুল্লাহ (সাঃ) কিভাবে নামায পড়েছেন এ বিষয়টি জানার পর তাঁর নামায এবং সহীহ হাদীসের আলোকে নামায এবং অযু-গোসলের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলোও আলোচনার দাবী রাখে। আমরা সচরাচর নামাযে অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখি যা জানলে তার পুনরাবৃত্তি হবে না। নামায সহীহ-শুদ্ধ হোক এটা সবারই কামনা। কেননা, বিশুদ্ধ নামাযই আল্লাহর দরবারে কবুল হয়, ত্রুটিপূর্ণ নামায কবুল হয় 'না। অনুরূপভাবে, অজু-গোসলের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলোও আলোচনা হওয়া দরকার।
ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো হাদীসের পরিপন্থী। যদি বিরাট সংখ্যক লোকও সে ভুল করে তাহলেও সেটা ভুল। আর একজনও যদি হক বা সত্যকে অবলম্বন করে তাহলে তা-ই সত্য এবং এ ব্যাপারে কোন সমস্যা নেই। আল্লামা ইবনুল কাইয়েম (রঃ) বলেন: হক বা সত্যের অনুসারী একজন আলেমও সংখ্যাগরিষ্ঠতা, দলীল-প্রমাণ ও এজমা'র দাবী করতে পারেন, যদিও গোটা দুনিয়া তার বিরোধীতা করে।
নাঈম বিন হাম্মাদ বলেন: কোন দল বা সমষ্টি নষ্ট হয়ে গেলে তুমি তাদের খারাপ হওয়ার পূর্বের অবস্থা অনুসরণ করবে যদিও তুমি একা। তখন তুমিই মূলতঃ সমষ্টি।
ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের সময় তিনি ছাড়া অন্য সবাই যেমন, খলীফা, উজির-নাজির, আলেম-ওলামা, মুফতীরা 'কোরআন সৃষ্ট' এ মতবাদের অনুসারী হয়ে যান। একমাত্র ইমাম আহমদ এর বিরোধীতা করেন। সমষ্টির যুক্তি ছিল, আমরা সবাই নাহক এবং তিনি একাই হকের উপর আছেন, এটা হতে পারে না। তাই খলীফা তাঁকে গ্রেফতার করে বেত্রাঘাত পর্যন্ত করেন। তা সত্ত্বেও তিনি সত্য থেকে বিচ্যুত হননি। সত্যের জন্য অনেকে অকাতরে জীবন বিলিয়ে গেছেন। ভুল ও ত্রুটি-বিচ্যুতিকারীদের সংখ্যাই বিরাট। এক্ষেত্রে ভুল সংশোধনকারী হয়ত সংখ্যালঘু। তাই আল্লামা শাতেবী (রঃ) বলেছেন: 'অতীতের নেক লোকেরা হকের উপর আমলের জন্য উৎসাহিত করেছেন এবং সংখ্যালঘু হওয়ার ভয় করতে নিষেধ করেছেন।'
তিনি আরো বলেছেন: সাধারণ লোকের এজমা বা মতৈক্যের কোন মূল্য নেই, এমনকি তারা নেতৃত্ব বা ইমামতির দাবী করলেও না।
রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর অনুসরণ, তাঁর আদেশ-নিষেধ মানা, তিনি যা করেছেন তা করা, সেগুলোর প্রচার ও প্রসার ঘটানো, তাঁর ভাল ও পসন্দনীয় কাজগুলোর প্রচলন করা এবং মুসলিম উম্মাহকে সেগুলো অনুসরণের জন্য উৎসাহিত করাই মূলতঃ সুন্নত। সুন্নতের উদাহরণ হল, হযরত নূহ (আঃ)-এর নৌকার মত। যে তাতে আরোহণ করবে সে মুক্তি পাবে।
হাদীস সহীহ হলে তা গ্রহণ করাই ঈমান ও যুক্তির দাবী। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রঃ) এ মর্মে ইমাম মালেকের সাথে ইমাম আবু ইউসুফের সা' এবং মোদ সম্পর্কিত প্রসিদ্ধ ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন। ইমাম আবু ইউসুফ মোদ-এর পরিবর্তে ইমাম মালেকের সা'-এর ভিত্তিতে সদকা-ফিতরা দানের যুক্তি গ্রহণ করে নিজ মত পরিবর্তন করেছেন। ইমাম মালেক মদীনার বিভিন্ন লোককে তাদের মাপযন্ত্র- সা' হাজির করার আহ্বান জানালে অনেকে তা হাজির করেন। তারা তাদের দাদা-দাদীর বরাত দিয়ে বলেন: এগুলো দিয়ে রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে ঈদুল ফিতরের সদকাহ দেয়া হত। ইমাম মালেক প্রশ্ন করেন, তারা কি মিথ্যা বলছে? আবু ইউসুফ বলেন, না, তারা মিথ্যা বলছে না। ইমাম মালেক ইরাকী জনগণের জন্য তাদের ৫ রতল এবং আরেক রতলের এক তৃতীয়াংশকে এক সা'-এর সমান ধার্য করেন। আবু ইউসুফ ইমাম মালেককে বলেন, হে আবু আবদুল্লাহ! আমার বন্ধু ইমাম আবু হানিফা আমি যা দেখলাম তা দেখলে তিনিও আমার মতো আপনার মতের প্রতি প্রত্যাবর্তন করতেন।
ইমাম বারাবহারী (রঃ) বলেনঃ তোমরা ছোট ছোট নতুন নতুন এবাদত তৈরির ব্যাপারে হুঁশিয়ার থাকবে। ছোট ছোট বেদআতগুলোর পুনরাবৃত্তি বড় বেদআতের জন্ম দেয়। উম্মাহর মধ্যে প্রথম যে বেদআতগুলো ঢুকে সেগুলো ছোট আকৃতির থাকে এবং তাকে হক মনে হয়। ফলে বহু লোক ধোঁকায় পড়ে যায় ও তাতে অংশ নেয়। তারপর আর তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। এটা ফুলে-ফেঁপে বড় হতে থাকে, দ্বীনের অংশে পরিণত হয় এবং সেরাতুল মোস্তাকীম তথা সরল পথ থেকে বিচ্যুতি ঘটায়।
এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত ঘটনাটি বড় চমকপ্রদ। আমর বিন সালামাহ বলেন: আমরা চাশতের নামাযের আগে আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ)-এর ঘরের দরজায় বসা ছিলাম। তিনি বের হলেন। আমরা তাঁর সাথে মসজিদে চললাম। আবু মূসা আশআরী (রাঃ) আসলেন। তিনি প্রশ্ন করেন, আবু আবদুর রহমান কি আপনাদের কাছে এসেছে? আমরা বললাম, 'না'। তিনিও আমাদের কাছে বসলেন। এমন সময় আবু আবদুর রহমান অর্থাৎ আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) আসলেন। আমরা সকলে দাঁড়িয়ে গেলাম। হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) বলেন: হে আবু আবদুর রহমান! আমি প্রথমে মসজিদে ঢুকে কিছু অপসন্দনীয় কাজ দেখি। তবে আমি যা দেখেছি তা ভাল হবে বলে মনে করি। তিনি জিজ্ঞেস করেন, সেটা কি? তিনি জবাব দেন, আপনিও দেখতে পারবেন। আমি মসজিদে একদল লোককে গ্রুপে গ্রুপে বসে নামাযের জন্য অপেক্ষা করতে দেখলাম। প্রত্যেক গ্রুপের একজন লোকের হাতে ছিল কঙ্কর। তিনি দলের লোকদেরকে ১শ' বার তাকবীর, ১শ' বার লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং ১শ' বার তাসবীহ পড়তে (সোবহানাল্লাহ) বলেন। লোকেরা তাই করল। অর্থাৎ সে কঙ্কর দিয়ে তার হিসেব গুনতো। ইবনে মাসউদ জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি বলেছেন? তিনি বলেন, আমি আপনার মতের অপেক্ষায় কিছু বলিনি। ইবনে মাসউদ বলেন, আপনি তাদেরকে কেন তাদের গুনাহগুলোর গুনতির কথা বললেন না? আমি তাদের নেকসমূহ নষ্ট না হবার গ্যারান্টি দিচ্ছি। এরপর আমরা সবাই তাঁর সাথে একটি গ্রুপের কাছে যাই। তিনি সেখানে দাঁড়ান এবং জিজ্ঞেস করেন, আমি তোমাদের একি কাজ দেখছি? তারা বলল: হে আবু আবদুর রহমান, আমরা কঙ্কর দ্বারা তাকবীর, তাহলীল ও তাসবীহর হিসেব রাখি। তিনি বলেন: তোমরা তোমাদের গুনাহর হিসেব রাখ। আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি, তোমাদের নেক সামান্যও নষ্ট হবে না। হে উম্মতে মোহাম্মদ, তোমাদের জন্য আফসোস। তোমাদের ধ্বংস এত তাড়াতাড়ি আসন্ন! নবীর এ সকল সাহাবায়ে কেরাম বিদ্যমান আছেন, রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর এই তরতাজা শুকনো কাপড় এবং তাঁর তৈজসপত্রগুলো এখনও পর্যন্ত অক্ষত। আমার প্রাণ যার হাতে সে সত্ত্বার শপথ করে বলছি, তোমরা হয় উম্মতে মোহাম্মদীর সর্বাধিক হেদায়েত প্রাপ্ত কিংবা সর্বাধিক গোমরাহ লোক হবে। তাঁরা বলেন, হে আবু আবদুর রহমান! আল্লাহর কসম, আমাদের নেক উদ্দেশ্যই এর পেছনে কাজ করেছে। তিনি উত্তর দেন, বহু ভাল কাজের আকাঙ্খী লোক ঠিক পথে নেই। রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, একদল লোক কোরআন পড়বে কিন্তু তা তাদের গলার ভেতর প্রবেশ করবে না। আল্লাহর কসম, আমি জানিনা যে, তোমরাই সে দলের সংখ্যাধিক্য লোক কিনা?
আমর বিন সালামাহ বলেন: আমরা নাহরাওয়ান যুদ্ধে তাদের অধিকাংশকে খারেজী সম্প্রদায়ের সাথে আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে দেখেছি।
দ্বীনের মধ্যে নতুন আবিষ্কৃত এবাদত শেষ পর্যন্ত চরম গোমরাহীর দিকে ঠেলে দেয়। তাই যে কোন বেদআত থেকে মোমেনদেরকে দূরে থাকতে হবে।
0 comments:
Post a Comment
Thanks for your comments.