Friday, July 10, 2026

রাসুল সা: এর সালাত/নামাজ বইটি লেখার ভূমিকা

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

ভূমিকা

সকল প্রশংসা সেই মহান আল্লাহর, যিনি নিজ বান্দাহদের ওপর নামায ফরয করেছেন, নামায কায়েম করার উত্তমরূপে আদায় করার আদেশ দিয়েছেন, বিনয়কে নামাযের সাফল্যের মানদণ্ড নির্ধারণ করেছেন, নামাযকে ঈমান কুফরীর মধ্যকার পার্থক্য নির্ণয় করেছেন এবং অশ্লীল গুনাহর কাজ থেকে বিরতকারী বানিয়েছেন।

দুরূদ সালাম মুহাম্মদ (সঃ)-এর ওপর, যাকে লক্ষ্য করে আল্লাহ বলেছেনঃ

وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ

"আমরা তোমার প্রতি যিকর (কোরআনের আদেশ-নিষেধ) নাযিল করেছি যেন তুমি লোকদের কাছে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করতে পারো।" (সূরা আন-নাহল-৪৪)

তিনি এই অর্পিত দায়িত্ব যথার্থভাবে পালন করেছেন। এর মধ্যে নামায হচ্ছে অন্যতম দায়িত্ব, যা তিনি কথা কাজের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন। এমন কি উদ্দেশ্যে একবার তিনি মিম্বারের উপর দাঁড়িয়ে নামায পড়েন রুকু-সাজদা করেন এবং বলেন, 'আমি তা এজন্যই করলাম তোমরা যেন তা আমার সঙ্গে আদায় করতে পার আমার নামায দেখে শিখতে পারো।' (বোখারী মুসলিম)

তিনি তাঁর আনুগত্য অনুসরণকে আমাদের জন্য কর্তব্য হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। তিনি বলেন:

صَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أَصَلِّي (بخاری واحمد)

"তোমরা আমাকে যেভাবে নামায পড়তে দেখ, সেভাবে নামায আদায় করো।" (বোখারী, আহমদ)

রসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর অনুরূপ নামায আদায়কারীদের উদ্দেশ্যে বেহেশতে প্রবেশের জন্য আল্লাহর প্রতিশ্রুতির সুসংবাদ দেন। তিনি বলেন: 'আল্লাহ পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করেছেন। যে ব্যক্তি উত্তমরূপে উযু করে ঠিক ওয়াক্ত মত নামাযগুলো আদায় করে, রুকু সাজদা পরিপূর্ণ করে এবং বিনয় সহকারে নামায পড়ে, তাকে মাফ করার বিষয়ে আল্লাহর ওয়াদা রয়েছে। যে ব্যক্তি অনুরূপ করে না, তার জন্য আল্লাহর কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাকে মাফ করতে পারেন এবং ইচ্ছা করলে শাস্তি দিতে পারেন।' (আবু দাউদ। এটি সহীহ হাদীস। একাধিক ইমাম একে সহীহ বলেছেন।)

রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বংশধর এবং সাহাবায়ে কেরামের ওপরও সালাম বর্ষিত হোক। যাঁরা আমাদের কাছে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইবাদত, নামায, কথা কাজ বর্ণনা করেছেন এবং সেগুলোকেই কেবল নিজেদের মাযহাব আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করেছেন। তাদের ওপরও সালাম রহমত বর্ষিত হোক, যারা তাঁদের অনুরূপ ভূমিকা গ্রহণ করেছেন এবং পরবর্তীতে কেয়ামত পর্যন্ত যারা তাদের অনুসরণ করবেন।

আমি যখন হাফেয আল মোনযেরীর 'আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব' গ্রন্থের নামায অধ্যায় শেষ করি এবং দীর্ঘ চার বছরব্যাপী কিছু সংখ্যক ভাইকে তা শিক্ষা দেই, তখন আমাদের সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ইসলামে নামাযের স্থান মর্যাদা কত বেশী এবং যে ব্যক্তি তা কায়েম করে উত্তম রূপে আদায় করে তা কত বেশী সওয়াব পুরস্কার রয়েছে। অবশ্য রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নামাযের সঙ্গে নৈকট্য দূরত্বের কারণে সওয়াবেরও বেশ-কম হয়ে থাকে। এই কথার প্রতি ইঙ্গিত দিয়েই রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'বান্দাহ নামায পড়ে। কিন্তু সেই নামাযের সওয়াব লেখা হয় এক-দশমাংশ, এক-নবমাংশ; এক-অষ্টমাংশ, এক-সপ্তমাংশ, এক-ষষ্ঠাংশ, এক-পঞ্চমাংশ, এক-চতুর্থাংশ, এক-তৃতীয়াংশ, অর্ধাংশ। (আবু দাউদ নাসাঈ।)

সেজন্য আমি বন্ধুদের সতর্ক করে দিয়েছি যে, আমাদের পক্ষে নামায পূর্ণভাবে কিংবা এর কাছাকাছিও আদায় করা সম্ভব নয়, যে পর্যন্ত না আমরা রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নামাযের বিস্তারিত বর্ণনা জানতে পারবো এবং তাতে কি কি ফরয-ওয়াজিব, আদব-কায়দা, নিয়ম-কানুন এবং দোআ যিকর আছে, তা অবগত হতে পারবো। তারপর যদি আমরা সেগুলোকে বাস্তবে পালন করি, তাহলে আশা করা যায় যে, আমাদের নামায আমাদেরকে অশ্লীল অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখবে এবং আমরা নামাযের জন্য বর্ণিত সওয়াব পুরস্কার লাভ করব।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, অধিকাংশ লোকের পক্ষে তা বিস্তারিত জানা মুশকিল। এমনকি সুনির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরণের কারণে বহু আলেমের পক্ষেও সেগুলো বিস্তারিত জানার অবকাশ নেই। ফিক্ এবং হাদীস সংগ্রহ সংকলনের 

মাধ্যমে হাদীসের প্রতিটি সেবক একথা পরিষ্কার জানেন যে, তাদের প্রত্যেকের মাযহাবে এমন কিছু সুন্নাহ আছে, যা অন্যদের মাযহাবে নেই। সেগুলোর মধ্যেও এমন কিছু সুন্নাহ আছে, যেগুলোকে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কথা কাজ হিসেবে বর্ণনা করা ঠিক নয়।

আবুল হাসানাত লক্ষ্মৌবী তাঁর 'আন-নাফেউল কবীর লিমান ইউতালেউ জামে' আস-সগীর' বইতে লিখেছেন, (১২২-১২৩ পৃঃ) বড় বড় ফকীহদের বইগুলোতেও বহু মওযু হাদীসের উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে ফাতোয়ার কিতাবগুলোর ক্ষেত্রে একথা বেশী প্রযোজ্য। যদিও লেখকরা বড় পন্ডিত ছিলেন কিন্তু তাঁরা হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে কিছুটা উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছেন। রকম বর্ণিত একটি অসত্য হাদীস হচ্ছে:

مَنْ قَضَى صَلَوَاتٍ مِّنَ الْفَرَائِضِ فِي أَخِرِجُمْعَةٍ مِّنْ رَمَضَانِ كَانَ ذَلِكَ جَابِرًا لِكُلِّ صَلَاةٍ فَائِتَةٍ فِي عُمُرِهِ إِلَى سَبْعِينَ سَنَةٍ -

অর্থঃ "যে ব্যক্তি রমযানের শেষ জুমআর দিন ফরয নামায আদায় করে, এর ফলে তার জীবনের ৭০ বছরের কাযা নামাযের ক্ষতিপূরণ হবে।"

মোল্লা আলী কারী তাঁর 'মাওযুআতুয সোগরা ওয়াল কোবরা' বইতে এটিকে বাতিল বলে উল্লেখ করেছেন। কেননা, তা ইজমার পরিপন্থী। ইজমা হচ্ছে, কোন ইবাদত কয়েক বছরের অন্য কোন কাযা ইবাদতের ক্ষতিপূরণ করতে পারে না।

আল্লামা শাওকানী 'আল-ফাওয়ায়েদুল মাজমুআহ ফিল আহাদীসিল মাওযুআহ' গ্রন্থেও এটাকে মাওযু' (অসত্য) হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন।

তাই হাদীসকে হাদীসের সেবক তথা মোহাদ্দেসীনের কাছ থেকে গ্রহণ করতে হবে।

যাই হোক, পরবর্তীকালেই এই প্রবণতা বেশী পরিলক্ষিত হয়। তারা বিনা বিচারে তা রসূলুল্লাহর হাদীস বলে চালিয়ে দেন। সেজন্য ইমাম নববী তাঁর 'আল-মজমু ফী শরহিল মুহায্যাব' গ্রন্থের ১ম খণ্ডের ৬০ পৃষ্ঠায় লিখেছেনঃ মোহেদ্দসীন বলেছেন, হাদীস দুর্বল হলে রসূলুল্লাহ (সঃ) 'বলেছেন', 'করেছেন', 'আদেশ দিয়েছেন' এবং 'নিষেধ করেছেন' এজাতীয় শক্তিশালী নিশ্চিত শব্দ দ্বারা বর্ণনা করা ঠিক নয়। সেসকল ক্ষেত্রে 'বর্ণিত আছে' 'উদ্ধৃত আছে' ইত্যাকার দুর্বল অনিশ্চিত শব্দ ব্যবহার করার বিধান রয়েছে।

কেননা শক্তিশালী শব্দগুলো বিশুদ্ধ হাদীস এবং দুর্বল শব্দগুলো দুর্বল হাদীসের জন্য ব্যবহার করার নিয়ম রয়েছে।

তাই মোহাদ্দেসীনে কেরাম দুর্বল অসত্য হাদীসগুলো থেকে সহীহ হাদীসগুলোকে পৃথক করে ভিন্ন কিতাব রচনা করেছেন। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে শেখ আবদুল কাদের বিন মোহাম্মদ আল-কোরাশী আল-হানাফীর রচিত-

الْعِنَايَةُ بِمَعْرِفَةِ أَحَادِيثِ الْهِدَايَةِ الطَّرْقُ وَالْوَسَائِلُ فِي

تَخْرِيجٍ أَحَادِيثِ خُلَاصَةِ الدَّلَائِلِ -

نَصَبُ الرَّايَةِ لِأَحَادِيثِ الْهَدَايَةِ - C

হাফেয ইবনে হাজার আসকালানীর الدِّرَايَةَ এবং

تَلْخِيْصُ الْخَبِيْرِ فِي تَخْرِيجِ أَحَادِيثِ الرَّافِعِي الْكَبِيْرِ ইত্যাদি।

0 comments:

Post a Comment

Thanks for your comments.