Saturday, July 11, 2026

হাদীস অনুসরণের বিষয়ে ইমাম আবু হানীফা (রঃ), মালেক বিন আনাস (রঃ),ইমাম শাফেঈ (রঃ), ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রঃ) এর মতামত ও তাদের হাদীস বিরোধী বক্তব্য প্রত্যাখ্যান:

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

হাদীস অনুসরণের বিষয়ে ইমামদের মতামত ও তাদের হাদীস বিরোধী বক্তব্য প্রত্যাখ্যান:

এ বিষয়ে আমরা কিছু আলোচনাকে উপকারী মনে করি। সম্ভবত এর মধ্যে অনুসারীদের জন্য উপদেশ ও নসীহত থাকতে পারে। বরং যারা অন্ধ অনুসরণ করে এবং মাযহাবকে ও মাযহাবের বক্তব্যকে আসমানী ওহীর মতো মনে করে, তাদের জন্য অবশ্যই উপকারী হবে। আল্লাহ বলেছেন:

اتَّبِعُوا مَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ مِّنْ رَّبِّكُمْ - وَلَا تَتَّبِعُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ قَلِيلًا مَّا تَذَكَّرُونَ -

অর্থঃ "তোমরা তোমাদের প্রভুর কাছ থেকে অবর্তীণ কিতাবের অনুসরণ করো এবং আল্লাহ ছাড়া আর কোনো বন্ধুর অনুসরণ করো না। তোমরা খুব সামান্যই উপদেশ মেনে চল।" -(সূরা আরাফ: ৩)

১. ইমাম আবু হানীফা (রঃ)

প্রথমে ইমাম আবু হানীফা (রঃ) সম্পর্কে আলোচনা করা যাক। তাঁর সাথী-সঙ্গীরা তাঁর বহু কথা বর্ণনা করেছেন। সেগুলোর মূল সুর একটা। সেটা হচ্ছে, হাদীস আঁকড়ে ধরা ওয়াজিব এবং ইমামদের যে সকল রায় হাদীস বিরোধী তা প্রত্যাখ্যান করা জরুরী। তিনি বলেছেন:

১. হাদীস সহীহ হলে সেটাই আমার মাযহাব।'৯

৯. ইবনে আবেদীন 'আল-হাশিয়া' কিতাবের ১ম খন্ডের ৬৩ পৃষ্ঠা এবং তার 'রাসমুল মুফতী' কিতাবের ১ম খন্ডের ৪র্থ পৃষ্ঠায় একথা উল্লেখ করেছেন। ইবনে আবেদীন ইবনে হাম্মামের 'শারহুল হেদায়াহ' গ্রন্থ থেকে উল্লেখ করেছেন: 'মাযহাবের বিরুদ্ধে বিশুদ্ধ হাদীস পাওয়া গেলে এর ওপরই আমল করতে হবে এবং সেটাই তাঁর মাযহাব। এর ফলে সে হানাফী মাযহাবের অনুসারী হওয়া থেকে বাদ যাবে না।' আমি বলবো, এটা তাদের সর্বোচ্চ তাকওয়া ও জ্ঞানের লক্ষণ। তারা ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন যে, তারা সকল হাদীসের ব্যাপারে অবগত ছিলেন না। ইমাম শাফেঈ (রঃ)-ও অনুরূপ বলে গেছেন। তাদের কোনো মাসআলা সহীহ হাদীস বিরোধী হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আমাদেরকে সহীহ হাদীস মতো চলতে হবে।

২. আমরা কোথা থেকে মাসআলা গ্রহণ করেছি, তা জানার আগ পর্যন্ত -আমাদের বক্তব্য গ্রহণ করা কারোর জন্য জায়েয নয়। 

ইবনু আবদিল বার, ১৪৫81

١- الْإِنْتِقَاءِ فِي فَضَائِلِ الثَّلَاثَةِ الْأَئِمَّةِ الْفُقَهَاءِ

ইবনুল কাইয়েম, ২য় খন্ড, ৩০৯ পৃঃ।

- إِعْلَامُ الْمُوْقِعِينَ .

ইবনু আবেদীন, ষষ্ঠ খন্ড, ২৯৩ পৃঃ।

الْحَاشِيَةُ عَلَى الْبَحْرِ الرَّائِقِ .

ইবনু আবেদীন, ষষ্ঠ খন্ড, ২৯-৩২ পৃঃ।

رَسُمُ الْمُفْنِي

আশ-শা'রানী, ১ম খন্ড, ৫৫ পৃঃ ইত্যাদি গ্রন্থ।

ه - الْمِيزَانُ .

আরেক বর্ণনায় ইমাম আবু হানীফার এই বক্তব্য এসেছে, যে ব্যক্তি আমার দলীল-প্রমাণ জানে না, তার জন্য আমার বক্তব্য দিয়ে ফতোয়া দেওয়া হারাম।'

অন্য এক বর্ণনায় তাঁর আরো একটি কথা যোগ করে বলা হয়েছে, 'আমরা মানুষ। আজ যে কথা বলি কাল সে কথা প্রত্যাহার করি।'

আরেক বর্ণনায় এসেছে, 'হে ইয়াকুব (আবু ইউসুফ), তোমার জন্য আফসোস! আমার কাছ থেকে যা শোন সব কিছু লিখ না। কেননা, আজ আমি কোনো বিষয়ে একটা মত পোষণ করি আগামীকাল তা ত্যাগ করি আর আগামীকাল যে মত পোষণ করি পরশু তা ত্যাগ করি। (আমি বলি, শ্রদ্ধেয় ইমাম অধিকাংশ মাসআলায় কেয়াস করেছেন। যখনই তিনি অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী অন্য কেয়াস বা হাদীস পেয়েছেন, তখনই আগের কেয়াস ত্যাগ করে পরবর্তীটার উপর আমল করেছেন। এব্যাপারে শা'রানী মীযানের ১ম খন্ডের ৬২ পৃষ্ঠায় যা বলেছেন, সংক্ষেপে তা হচ্ছেঃ)

আমি বলবো, যারা দলীল-প্রমাণ জানে না, তাদের ব্যাপারে যদি এটাই ইমামের বক্তব্য হয়, তাহলে তাদের ব্যাপারে আফসোস! যারা জানেন যে, দলীল এর বিপরীত এবং তদুপরি তারা দলীল বিরোধী ফাতোয়া দেন। এই একটি বক্তব্যই অন্ধ তাকলীদ (অনুসরণ) ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। সে জন্য কোন কোন হানাফী অন্ধ মোকাল্লেদ এটাকে ইমাম আবু হানীফার বক্তব্য হওয়াকে অস্বীকার করেন।

ইমাম আবু হানীফা (রঃ)-এর ব্যাপারে আমার সহ সকল ইনসাফকারীর বিশ্বাস হল, হাদীসসহ ইসলামী শরীআ লিপিবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে হাদীসের হাফেযগণ যখন বিভিন্ন দেশের শহর-বন্দর ও গ্রামে ছড়িয়ে পড়েন এবং নিজেদের মিশনে সাফল্য লাভ করেন, তখন পর্যন্ত যদি তিনি জীবিত থাকতেন, তাহলে তিনি তাই গ্রহণ করতেন এবং তিনি যে সকল কেয়াস' করেছেন তা ত্যাগ করতেন এবং অন্যান্য মাযহাবের মত তাঁর মাযহাবেও কেয়াস হ্রাস পেত। তাঁর আমলে তাবেঈ এবং তাবয়ে তাবেঈগণ বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে

৩. আমার কোনো কথা বা বক্তব্য যদি কোরআন ও হাদীসের বিপরীত হয়, তাহলে আমার বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করো। (আল ইকায-আল ফোলানীঃ পূঃ ৫০। তিনি এটাকে ইমাম মোহাম্মদের বক্তব্য হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, একথা মোজতাহিদের চাইতে মোকাল্লিদের জন্য বেশী প্রযোজ্য। আমি বলি, এই কথার ওপর ভিত্তি করে শা'রানী মীযান গ্রন্থের ১ম খন্ডের ২৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেনঃ)

২. মালেক বিন আনাস (রঃ)

১. ইমাম মালেক (রঃ) বলেছেন: আমি মানুষ, ভুল-শুদ্ধ দু'টোই করি।

আমার রায় দেখ। যা কোরআন ও সুন্নাহর মোতাবেক তা গ্রহণ কর এবং যা তার বিপরীত তা প্রত্যাখ্যান কর। (আল-জামে'-ইবনু আবদিল বার, ২য় খন্ড, ৩২ পৃঃ। উসুলুল আহকাম-ইবনে হাযম, ষষ্ঠ খন্ড, ১৪৯ পৃঃ। আল-ফোলানীঃ ৭২ পৃঃ।)

থাকার কারণে প্রয়োজনের ভিত্তিতে অন্যান্য মাযহাবের তুলনায় কেয়াসের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। কেননা, ঐ সকল মাসআলায় তখন হাদীস পাওয়া যায়নি। অন্যান্য মাযহাবের ইমামদের অবস্থা এর ব্যতিক্রম। তাদের আমলে হাদীসের হাফেযগণ শহর ও গ্রামে ছড়িয়ে পড়েন এবং হাদীস সংগ্রহ করে তা লিপিবদ্ধ করেন। ফলে, অন্যান্য মাযহাবের কেয়াসের সংখ্যা হ্রাস পায়।

এ বিষয়ে আল্লামা আবুল হাসানাত তাঁর 'আন-নাফে' আল-কবীর' গ্রন্থের ১৩৫ পৃষ্ঠায় বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আগ্রহী পাঠকরা তা পড়ে দেখতে পারেন।

আমি বলি, যে সকল মাসআলায় ইমাম আবু হানীফা (রঃ) অনিচ্ছাসত্ত্বে সহীহ হাদীসের বিপরীত মতপ্রকাশ করেছেন তা গ্রহণযোগ্য ওযর। কেননা, আল্লাহ কাউকে তার সামর্থের বাইরের বিষয়ে দায়ী করবেন না। সে জন্য তাঁকে বিদ্রুপ করা যাবে না। অনেক জাহেল-মূর্খ লোক অনুরূপ করে থাকে। বরং তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ওয়াজিব। কেননা, তিনি মুসলমানদের অন্যতম ইমাম। তাদের ওসীলায় এই দীন সংরক্ষিত আছে এবং আমাদের কাছে পৌঁছেছে। তাঁরা ভুল-শুদ্ধ যাই করুন না কেন, এর বিনিময়ে পুরস্কার পাবেন। তাঁর কোন অনুসারীর জন্যে সহীহ হাদীস বিরোধী তাঁর মাসআলা মানা জরুরী নয়।

যদি কেউ বলে, আমার ইমামের মৃত্যুর পর সহীহ হাদীস পেলে তা দিয়ে আমি কি করবো? এর জওয়াব হচ্ছে, তার উচিত সহীহ হাদীস মোতাবেক আমল করা। কেননা, ইমাম জীবিত থাকলে তাকে তাই আদেশ করতেন। সকল ইমাম শরীয়তের অনুসারী। কেউ যদি বলে, যেহেতু ইমাম গ্রহণ করেননি সেজন্য আমি সহীহ হাদীস গ্রহণ করবো না এটাই অধিকাংশ মোকাল্লিদের মনোভাব-তারা বিরাট কল্যাণ থেকে বঞ্চিত। তাদের উচিত, ইমামের উপদেশ অনুযায়ী সহীহ হাদীসের উপর আমল করা। আমাদের বিশ্বাস, ইমামরা জীবিত থাকলে তারা সহীহ হাদীস মেনে চলতেন এবং নিজেদের কেয়াস ত্যাগ করতেন।

২. রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পর এমন কোনো ব্যক্তি নেই যার কথা ও কাজ সমালোচনার উর্ধে। একমাত্র রসূলুল্লাহ (সঃ)-ই সমালোচনার উর্ধে। (ইরশাদুস সালেক: ইবনু আবদিল হাদী, ১ম খন্ডঃ ২২৭ পৃঃ। আল-জামে'-ইবনু আবদিল বার, ২য় খন্ড, ৯১ পৃঃ। উসুলুল আহকাম-ইবনু হাযম, ষষ্ঠ খন্ড: ১৪৫-১৭৯ পৃষ্ঠা। আল-ফাতাওয়া-আসাবকী, ১ম খন্ড: ১৪৮ পৃঃ।)

৩. ইবনু ওহাব বলেছেন, আমি ইমাম মালেকের উযুর মধ্যে দুই পায়ের আঙ্গুল খেলাল করার বিষয়ে এক প্রশ্ন করতে শুনেছি। তিনি উত্তরে বলেন, লোকদের জন্য এটার প্রয়োজন নেই। ইবনু ওহাব বলেন, আমি মানুষ কমে গেলে তাঁকে নিরিবিলি পেয়ে জিজ্ঞেস করি, তাতো আমাদের জন্য সুন্নাহ। ইমাম মালেক বলেন, সেটা কি? আমি বললাম, আমরা লাইস বিন সা'দ, ইবনু লোহাইআ', আমর বিন হারেস, ইয়াযিদ বিন আমর আল-মাআফেরী, আবু অবাদুর রহমান আল-হাবালী এবং আল মোস্তাওরাদ বিন শাদ্দাদ আল কোরাশী-এই সূত্র পরস্পরা থেকে জানতে পেরেছি যে, শাদ্দাদ আল কোরাশী বলেন, আমি রসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কনিষ্ঠ আঙ্গুল দিয়ে দুই পায়ের আঙ্গুল খেলাল করতে দেখেছি। ইমাম মালেক বলেন, এটাতো সুন্দর (হাসান) হাদীস। আমি এখন ছাড়া আর কখনও এই হাদীসটি শুনিনি। তারপর যখনই তাঁকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে, তখনই তাঁকে পায়ের আঙ্গুল খেলাল করার আদেশ দিতে আমি শুনেছি। (১৫. মোকাদ্দামা আল জারাহ ওয়াত তা'দীল-ইবনু আবি হাতেম: ৩১-৩২ পৃঃ।)

৩. ইমাম শাফেঈ (রঃ)

এ বিষয়ে ইমাম শাফেঈ থেকে অনেক সুন্দর কথা বর্ণিত আছে এবং তাঁর অনুসারীরা তা সর্বাধিক আমল করেছে। (১৬. ইবনু হাযম বলেছেন: যে সকল ফকীহ তার অনুসারীদেরকে অন্ধ অনুসরণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন তাদের মধ্যে ইমাম শাফেঈ অন্যতম। তিনি তাকলীদ করতে একেবারেই নিষেধ করেছেন এবং পরবর্তী লোকদের যে কোন (আচার) বক্তব্যের সত্যতা যাঁচাই করে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন।)

তিনি বলেছেন:

১. তোমাদের কারোর কাছ থেকে যেন রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সুন্নাহ ছুটে না যায়। আমি যতো কিছুই বলে থাকি তা যদি রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদীসের পরিপন্থী হয়, তাহলে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কথাই আমার কথা। (১৭. হাকেম তা বর্ণনা করেছেন। তারীখে দিমাঙ্ক- ইবনে আসাকির। ইকায পৃঃ ১০০ এবং ইলামুল মোকেঈন, ২য় খন্ড, ৩৬৩-৩৬৪ পৃঃ।)

২. একথার উপর মুসলমানদের ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, যখনই কারোর সামনে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কোনো কথা প্রকাশ পায়, তখনই তার জন্যে অন্য কোনো লোকের কথার ভিত্তিতে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদীস ত্যাগ করা জায়েয নয়। (ইবনুল কাইয়েম, ২ খন্ড: ৩৬১ পৃঃ এবং আলফোলানী: ৬৮ পৃঃ।)

৩. তোমরা যদি আমার কিতাবে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সুন্নাহ বিরোধী, কোনো কিছু পাও, তাহলে আমার ঐ কথা ত্যাগ কর। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, তাহলে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ঐ হাদীসকে অনুসরণ কর এবং অন্য কারো কথার প্রতি নজর দিও না। (আল-হারাওয়ায়ী জাম্মুল কালাম, ৩য় খন্ডঃ পৃষ্ঠা ১ ও ৪৬। আল ইহতিজাজ বিশ-শাফেঈ-খাতীব, ৮ম খন্ড, পৃঃ ২। ইবনু আসাকির খন্ড ১৫, পৃঃ ৯। আল-মাজমু আন-নববী-১ম খন্ড, ৬৩ পৃষ্ঠা। ইবনুল কায়েম-২য় খন্ডঃ ৩৬১ পৃঃ। আল-ফোলানী-পৃঃ, ১০০ এবং আল-হিলাইয়া-আবু নাঈম, ৯ম খন্ডঃ ১০৭ পৃঃ।)

৪. সহীহ ও বিশুদ্ধ হাদীসই আমার মাযহাব। (আল-মাজমু-আন-নববী। আশশারানী-১ম খন্ড, ৫৭ পৃঃ। তিনি এটাকে হাকেম এবং বায়হাকীর দিকে সম্বোধন করেছেন। আল ফোলানীঃ ১০৭ পৃঃ। শারানী বলেছেন, ইবনু হাযমের মতে, তিনি সহ অন্য ইমামদের কাছেও এটা সহীহ। ইমাম নববী যা বলেছেন তার সারসংক্ষেপ হল:)

৫. আপনারা হাদীস ও রিজাল শাস্ত্রে আমার চাইতে বেশী জ্ঞাত। সহীহ হাদীসের সন্ধান পেলে আমাকে জানাবেন। বর্ণনাকারী কুফা, বসরা ও সিরিয়ার যেই হোক না কেন, হাদীস সহীহ হলে আমি তার কাছে যাবো। (ইমাম আহমদকে সম্বোধন করে এ কথাগুলো তিনি বলেছেন। আদাবুশ শাফেঈ-ইবনু আবি হাতেমঃ পৃঃ ৯৪-৯৫। আল হিলইয়া-আবু নাঈম, ৯, খন্ড, পৃঃ ১০৬'। ইবনে আসাকির, ইবনু আবদিল বার, ইবনুল জাওযী এবং আল-হারওয়ায়ী নিজ নিজ কিতাবে তা উল্লেখ করেছেন।)

আমাদের সাথীরা হাই তোলার ব্যাপারে এই রকম আমল করেছেন। তারা রোগসহ বিভিন্ন ওযরের কারণে ইহরাম থেকে হালাল হওয়ার শর্তের বিষয়েও হাদীস অনুযায়ী আমল করেছেন। আমাদের পুরাতন সাথীরা কোনো মাসআলায় হাদীস পেলে এবং শাফেঈ মাযহাব এর বিপরীত থাকলে হাদীস অনুযায়ী আমল করতে বলতেন। যা হাদীস মোতাবেক তাই শাফেঈর মাযহাব। আসসাবকী বলেছেন, হাদীসের অনুসরণ করাই উত্তম। কেউ যদি নিজেকে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে উপস্থিত মনে করে, তাহলে তার পক্ষে কি হাদীস মোতাবেক আমল না করে উপায় আছে?

বায়হাকী বলেছেন, ইমাম শাফেঈ প্রায়ই হাদীসের উপর আমল করেছেন। তিনি হেজায, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং ইরাকের আলেমদেরকে জমা করে নির্দ্বিধায় সহীহ বর্ণনাগুলো গ্রহণ করেছেন।

৬. আমি যা বলেছি তার বিপরীত যদি রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কোনো হাদীস কারো নিকট বিদ্যমান থাকে, তাহলে আমি আমার জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থাতেই ঐ হাদীসের দিকে ফিরে আসবো। (হিলইয়া-আবু নাঈম, ৯ম খন্ড, ১০৭ পৃঃ। আল হারওয়ারী ৪৭ পৃঃ। ইবনুল কাইয়েম-ইলামুল মোকেয়ীন, ২য় খন্ড, পৃঃ ৩৬৩ এবং আল ফোলানী, পৃঃ ১০৪।)

৭. তোমরা যদি আমাকে কোনো কথা বলতে দেখ এবং রসূলুল্লাহ (সঃ) থেকে এর বিপরীত রিওয়ায়াত পাও, তাহলে জেনে রাখ আমার জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পেয়েছে। (আদাব-ইবনু আবি হাতেম, পৃঃ ৯৩। আল-আমালী, আবুল কাসেম সমরখন্দী। হিলইয়া-আবু নাঈম, ৯ম খন্ড, পৃঃ ১০৬ এবং ইবনু আসাকির।)

৮. আমি যা বলেছি তার বিপরীত রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর থেকে কোনো সহীহ বর্ণনা থাকলে নবীর হাদীসই উত্তম, তখন তোমরা আমার তাকলীদ করবে না। (ইবনু আবি হাতেম, আবু নাঈম ও ইবনু আসাকির।)

৯. রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদীসই আমার কথা-যদিও সেই হাদীস আমার কাছ থেকে শুনতে পাওনি। (ইবনু আবি হাতেম পৃঃ ৯৩-৯৪।)

৪ ইমাম আহমদ বিন হাম্বল

ইমামদের মধ্যে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল সর্বাধিক হাদীস সংগ্রহকারী ও হাদীসের উপর আমলকারী। তিনি শাখা-প্রশাখা মাসআলা ও রায়ের (ইজতিহাদের) উপর ভিত্তি করে কোন গ্রন্থ রচনা করাকে অপছন্দ করতেন। (আল মানাকেব-ইবনুল জাওযী, পৃঃ ১৯২।)

 তিনি বলেছেন:

১. তোমরা আমার, ইমাম মালেক, শাফেঈ আওযাঈ এবং সুফিয়ান ছাওরীর তাকলীদ (অন্ধ আনুগত্য) করবে না। বরং তারা যে উৎস থেকে গ্রহণ করেছেন তুমিও সেই উৎস থেকেই গ্রহণ কর। (২৭. আল-ফোলানী, পৃঃ ১১৩। ইবনুল কাইয়েম-ই'লাম, ২য় খন্ডঃ পৃঃ ৩০২।)

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, তুমি তোমার দীনের বিষয়ে তাদের কারো অন্ধ আনুগত্য কর না। রসূলুল্লাহ (সঃ) ও সাহাবায়ে কেরাম থেকে যা বর্ণিত হয়েছে তা গ্রহণ কর। তারপর তাবেঈদের কাছ থেকে গ্রহণ কর এবং এ বিষয়ে ব্যক্তির স্বাধীনতা রয়েছে। তিনি একবার বলেছেন: 'অনুসরণ বলতে বুঝায় রসূলুল্লাহ (সঃ) ও সাহবায়ে কেরাম থেকে যা বর্ণিত হয়েছে তার অনুসরণ

করা।' তারপর তাবেঈদের কাছ থেকে বর্ণিত বিষয় মানা-না মানার ব্যাপারে ব্যক্তির স্বাধীনতা রয়েছে।  (মাসায়েলে ইমাম আহমদ, পৃঃ ২৭৬-২৭৭।)

২. আওযাঈ'; ইমাম মালেক ও ইমাম আবু হানীফার রায় তাদের নিজস্ব রায় বা ইজতিহাদ। আমার কাছে এসবই সমান। তবে দলীল হল আছার অর্থাৎ সাহাবী ও তাবেঈগণের কথা। (ইবনু আবদিল বার-আল-জামে, ২য় খন্ড: পৃঃ ১৪৯।)

৩. যে ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদীসকে প্রত্যাখ্যান করে, সে ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। (ইবনুল জাওয়ী পৃঃ ১৮২)

হাদীস অনুসরণের ব্যাপারে এবং অন্ধ আনুগত্য থেকে দূরে থাকার জন্য এই হচ্ছে ইমামগণের মন্তব্য ও বক্তব্য। তাদের বক্তব্যগুলো এত স্পষ্ট ও পরিষ্কার যে, এর জন্য কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের দরকার কিংবা বির্তকের অবকাশ নেই। এর ভিত্তিতে বলা যায় যে, হাদীস অনুসরণের কারণে নিজ ইমামের মাযহাবের রায়ের বিপরীত হলেও কেউ মাযহাব বিচ্যুত হয় না। বরং সে নিজ মাযহাবেরই অনুসারী থাকে।

তবে যে ব্যক্তি শুধু ইমামদের কথার দোহাই দিয়ে হাদীসের বিরোধিতা করে, সে ব্যক্তি কিছুতেই অটুট রজ্জু আঁকড়ে ধরে নেই। বরং এই অনমনীয় মনোভারের কারণে সে ইমামদের নাফরমানীই করে এবং তাদের কথার বিরোধিতা করে।

আল্লাহ বলেনঃ

فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا -(سورة النساء : (٢٥)

অর্থঃ "আপনার রবের কসম। তারা সেই পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না যে পর্যন্ত আপনাকে তাদের ঝগড়ার সালিশে বিচারক না বানায়, আপনার ফয়সালার ব্যাপারে অন্তরে কুণ্ঠা বোধ না করে এবং আপনার রায় প্রশান্ত চিত্তে মেনে না নেয়।" (সূরা আন নিসা : ৬৫)

فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ -

অর্থ: 'যারা আল্লাহর আদেশের বিরোধিতা করে, তাদের এ বিষয়ে ভয় করা জরুরী যে, তারা দুনিয়ায় গযব কিংবা আখেরাতে কষ্টদায়ক আযাবের সম্মুখীন হবে। 

৩১.ক

হাফেয ইবনে রজব (রঃ) বলেছেন : রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বাণী যাদের

কাছে পৌঁছেছে এবং যারা তা জানতে পেরেছেন, তাদের কর্তব্য হল উম্মাহর কাছে তা বর্ণনা করা, তাদেরকে উপদেশ দেয়া এবং রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বাণীর আনুগত্য করার আদেশ দেয়া যদিও তা উম্মাহর মহান ব্যক্তিদের রায়ের বিপরীত হয়। রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আদেশের মর্যাদা অন্য যে কোনো ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মতের মর্যাদার চাইতে শ্রেষ্ঠতর। কেননা, কোন মহান ব্যক্তিত্বও ভুল করে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আদেশের বিরোধিতা করতে পারেন। এ কারণেই সাহাবায়ে কেরামসহ পরবর্তী উত্তরসূরীরা সহীহ হাদীস বিরোধীকোনো কিছু গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। কোনো কোনো সময় তাঁরা কঠোর ভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। 

৩১.খ

তবে তা বিদ্বেষের কারণে নয়। সম্মানিত ব্যক্তির প্রতি ভালবাসা অব্যাহত রেখেই কঠোর অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছেন। কেননা, আল্লাহর রসূল ছিলেন তাদের কাছে সর্বাধিক প্রিয় এবং তাঁর আদেশ ছিল সৃষ্টিজগতের সব কিছুর উর্ধে। যখন রসূলের (সঃ) বাণীর সাথে অন্য কারোর কথা সংঘর্ষমুখর হয়, তখনই অন্যদের কথার ওপর রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কথার শ্রেষ্ঠত্ব দান করে তার আনুগত্য করা হয়। রসূল (সঃ)-এর কথার পরিপন্থী হওয়ার কারণে তা

৩১ ক. সূরা নূর: ৬৩।

৩১ খ. আমি বলি এমনকি তারা নিজেদের বাপ কিংবা ওলামায়ে কেরামের কথাও কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইমাম তাহাওয়ী শরহে মাআ'নীল আছার গ্রন্থের ১ম খন্ডের ৩৭২ পৃঃ এবং আবু ইয়া'লী নিজ মোসনাদ গ্রন্থের ৩য় খন্ডে ১৩১৭ পৃষ্ঠায় সালেম বিন আবদুল্লাহ বিন ওমার থেকে নির্ভরযোগ্য সনদ সহকারে বর্ণনা করেছেন। আমি মসজিদে নবওয়ীতে আবদুল্লাহ বিন ওমার (রাঃ)-এর সাথে বসা ছিলাম। তখন সিরিয়া থেকে এক লোক এসে তাঁকে হজ্জে তামাত্তু সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। ইবনে ওমার উত্তরে বলেন,, তা ভাল ও উত্তম। তখন লোকটি বলে আপনার আব্বা ও মা কি তা করতে নিষেধ করতেন? ইবনে ওমার বলেন, তোমার জন্য আফসোস! রসূলুল্লাহ (সঃ) যা করেছেন আমার বাপ তা নিষেধ করলে তুমি কোন্টা মানবে? লোকটি বলে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর টাই মানবো। ইবনে ওমার বলেন এবার এখান থেকে যাও।

কোনো সম্মানিত লোকের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে অন্তরায় নয়। এ ব্যক্তি আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রাপ্ত। 

৩১.গ

কেননা, তার কাছে রসূলের বাণী সুস্পষ্ট হলে তিনি বিনা দ্বিধায় তা মেনে নেবেন। 

৩২. আমি বলি, তারা কি করে ভুল সংশোধনকে অপছন্দ করবে। অথচ তাদেরকে রসূলের আনুগত্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং রসূলুল্লাহর হাদীস বিরোধী কথা ও কাজ প্রত্যাহার করাকে জরুরী ঘোষণা করা হয়েছে। বরং ইমাম শাফেঈ নিজ সঙ্গীদেরকে সহীহ হাদীস তাঁর দিকে সম্বোধন করার নির্দেশ দিয়েছেন। যদিও তারা সেই হাদীস তার কাছ থেকে গ্রহণ করেননি কিংবা বিপরীত হাদীসই গ্রহণ করেছেন। সেজন্য ইবনু দাকীক আল-ঈদ যখন চার মাযহাবের একক কিংবা সামষ্টিক সহীহ হাদীস বিরোধী মাসআলাগুলো এক বিরাট খন্ডে জমা করেন, তখন তিনি এর ভূমিকায় বলেন:

এই মাসআলাগুলোকে চার ইমামের দিকে সম্বোধন করা হারাম। তাদের অনুসারী ফকীহদের উচিত সেগুলো জানা এবং ইমামদের দিকে সেগুলোকে সম্বোধন না করা। যেন তাদের দিকে মিথ্যাকে সম্বোধন করা না হয়। 

0 comments:

Post a Comment

Thanks for your comments.