Saturday, July 18, 2026

রুকু, রুকুর পদ্ধতি, ধীরস্থিরভাবে রুকু করা ওয়াজিব, রুকুর যিকর, রুকু দীর্ঘায়িত করা, রুকুতে কোরআন পড়া নিষেধ, রুকু থেকে ধীরস্থিরভাবে দাঁড়ানো ওয়াজিব, রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ানো এবং দোআ পড়া

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

রুকু

রসূলুল্লাহ (সঃ) কেরাআত শেষ করার পর সামান্য একটু অপেক্ষা করতেন।(আবু দাউদ। হাকেম একে সহীহ হাদীস বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী তা সমর্থন করেছেন। ইবনুল কাইয়েম সহ অন্যরা ঐ অপেক্ষার পরিমাণ সম্পর্কে বলেছেন, তা শ্বাস নেয়ার পরিমাণ সমতুল্য) তারপর তিনি তাকবীরে তাহরীমার সময়ের মত উপরের দিকে দুই হাত তুলতেন এবং তাকবীর বলতেন ও রুকুতে যেতেন। 

(বোখারী, মুসলিম,। রুকুতে যাওয়ার আগে এবং রুকু থেকে উঠার সময় দু'হাত তোলার ব্যাপারে মোতাওয়াতের বর্ণনা রয়েছে। অর্থাৎ বহু সংখ্যক বর্ণনাকারী দ্বারা তা বর্ণিত হয়েছে। তিন ইমাম, অধিকাংশ মোহাদ্দেস ও ফকীহ এবং ইমাম আবু ইউসুফের ছাত্র ইসাম বিন ইউসুফ আবু ইসমাহ বলখী সহ কিছু হানাফীর মাযহাবও এটাই। ওকবাহ বিন আমের হাত তোলার ব্যাপারে বলেছেন, প্রতি বারের ইশারায় ১০ নেকী পাওয়া যায়।)

তিনি ভুল নামায আদায়কারীকে বলেছিলেন: আল্লাহর আদেশ মোতাবেক ভাল করে উযু না করলে তোমাদের নামায পরিপূর্ণ হবে না। তারপর তাকবীর বলবে এবং আল্লাহর হামদ ও মর্যাদা প্রকাশ করবে। এরপর আল্লাহ যেভাবে আদেশ দিয়েছেন, সেভাবে কোরআন থেকে কেরাআত পাঠ করবে। পরে তাকবীর বলবে ও রুকুতে যাবে। দু'হাত হাঁটুর উপর এমনভাবে রাখবে যেন জোড়াগুলো ঢিলা-ঢালা থাকে। (আবু দাউদ, নাসাঈ। হাকেম একে সহীহ বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী সমর্থন করেছেন)

রুকুর পদ্ধতি

রসূলুল্লাহ (সঃ) রুকুতে দুই হাঁটুর উপর দুই হাতের তালু রাখতেন।(বোখারী, আবু দাউদ) এবং লোকদেরকেও অনুরূপ করার নির্দেশ দিয়েছেন। (বোখারী, আবু দাউদ) তিনি ভুল নামায আদায়কারীকেও অনুরূপ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে আগে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি দুই হাঁটু আঁকড়ে ধরতেন।(বোখারী, মুসলিম) তিনি আঙ্গুল ফাঁক করে রাখতেন।(হাকেম এটিকে সহীহ বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী তা সমর্থন করেছেন) তিনি ভুল নামায আদায়কারীকেও অনুরূপ নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন: তুমি যখন রুকুতে যাবে, তখন তোমার দুই হাত দুই হাঁটুর উপর রাখবে এবং আঙ্গুলগুলো ফাঁক রাখবে। তারপর একটু থামবে যে পর্যন্ত না প্রত্যেক অঙ্গ তার নিজ স্থান আঁকড়ে ধরে।(ইবনু খোযায়মাহ, ইবনু হিব্বান)

তিনি দুই কনুই দুই পাঁজর থেকে দূরে রাখতেন।(তিরমিযী। ইবনু খোযায়মাহ একে সহীহ বলেছেন) তিনি রুকুতে গেলে পিঠ সমান ভাবে বাঁকাতেন। (বায়হাকী-সনদ সহীহ, বোখারী) এমন কি পিঠে পানি ঢেলে দিলে তা যেন সমান ভাবে স্থির হয়ে থাকবে।(আল-কবীর ওয়াস্সাগীর-তাবারানী, যাওয়ায়েদ আল-মোসনাদ আবদুল্লাহ বিন আহমদ, ইবনু মাজাহ।) তিনি ভুল নামায আদায়কারীকে বলেছিলেন, তুমি যখন রুকুতে যাবে, তখন তোমার দুই হাত দুই হাঁটুর উপর রাখ, তোমার পিঠ সমানভাবে বাঁকাও এবং শক্তভাবে রুকু কর।(আহমদ, আবু দাউদ-সনদ সহীহ)

তিনি পিঠ থেকে মাথা উঁচু-নীচু করতেন না। (আবু দাউদ, বোখারী-কেরাআত অধ্যায়-সনদ সহীহ) বরং মাথা পিঠ বরাবর সমান রাখতেন।(মুসলিম, আবু আওয়ানাহ)

ধীরস্থিরভাবে রুকু করা ওয়াজিব

রসূলুল্লাহ (সঃ) ধীরস্থিরভাবে রুকু করতেন এবং ভুল নামায আদায়কারীকেও অনুরূপ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, তোমরা রুকু ও সাজদাহ পরিপূর্ণ কর। আল্লাহর শপথ, আমি আমার পেছনে তোমাদের রুকু ও সাজদাহ দেখি। (বোখারী, মুসলিম। নামাযের মধ্যে পেছনে দেখা রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মোজেযা ছিল। অন্যান্য সময় পেছনে দেখার কথা এখানে বলা হয়নি)

তিনি এক ব্যক্তিকে দেখলেন, সে রুকু পরিপূর্ণ করছে না এবং সাজদাহ ঠিকমত না করে ঠোকর দিচ্ছে। তখন তিনি বললেন, ঐ ব্যক্তি ঐ অবস্থায় মারা গেলে উম্মতে মোহাম্মদ হিসেবে বিবেচিত হবে না। সে নামাযে কাকের মত ঠোকর দিচ্ছে। যে ব্যক্তি রুকু পরিপূর্ণ করে না এবং সাজদায় ঠোকর মারে, তার উদাহরণ হল সেই ক্ষুধার্ত ব্যক্তির মত, যে একটি বা দু'টি খেজুর খায়, কিন্তু তাতে তার কোন লাভ হয় না। (অর্থাৎ ক্ষুধা দূর হয় না)। (মোসনাদ-আবু ইয়া'লী, বায়হাকী, তাবারানী, ইবনু আসাকির, ইবনু খোযায়মাহ। সনদ সহীহ)

আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু রসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে নামাযে মোরগের মত ঠোকর দিতে, শিয়ালের মত এদিক-ওদিক তাকাতে এবং বানরের মত চার পায়ের উপর বসতে নিষেধ করেছেন।(আহমদ, ইবনু আলী শায়বা, আতায়ালিসী। হাদীসটি উত্তম)

রসূলুল্লাহ (সঃ) আরও বলেছেন, নামায-চোর হচ্ছে সর্ব নিকৃষ্ট চোর। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করেন, কিভাবে নামায চুরি হয়? তিনি বলেন, রুকু ও সাজদাহ পরিপূর্ণ না করা।(ইবনু আবী শায়বা, তাবারানী। হাকেম এটিকে সহীহ হাদীস বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী তা সমর্থন করেছেন)

একবার রসূলুল্লাহ (সঃ) নামায পড়া অবস্থায় নিজ চোখের কোণ দ্বারা এমন এক ব্যক্তিকে ইশারা করলেন, যে রুকু ও সাজদায় পিঠ সমানভাবে সোজা করেনি। নামায শেষে তিনি বললেন, হে মুসলিম সমাজ! সে ব্যক্তির নামায হয় না, যে রুকু ও সাজদায় পিঠ সোজা করে না। (ইবনু আবী শায়বা, ইবনু মাজাহ, আহমদ। সনদ সহীহ)

অন্য এক হাদীসে রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, রুকু ও সাজদায় পিঠ সোজা ও সমান না করলে কোন ব্যক্তির নামায হয় না। (আবু আ'ওয়ানা, আবু দাউদ, আস্সাহমী। দারু কুতনী একে সহীহ বলেছেন)

রুকুর যিকর

রসূলুল্লাহ (সঃ) এই রোকনটি আদায়ের সময় বিভিন্ন রকম যিকর ও দোআ পাঠ করতেন। কোন সময় একটা, কোন সময় অন্যটা। তিনি যা বলতেন, তা হচ্ছে নিম্নরূপ:

১. তিন বার সোবহানা রাব্বিয়াল আযীম। (আহমদ, আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ, দারু কুতনী, তাহাবী, বাযযার। তাবারানী ৭জন সাহাবী থেকে এটি বর্ণনা করেছেন। ইবনুল কাইয়েম সহ যারা তিন তাসবীহর সংখ্যা অস্বীকার করেন এই হাদীস তাদের জন্য উত্তম জওয়াব) 

অর্থ: 'আমার মহান রবের পবিত্রতা বর্ণনা করছি।' তিনি কখনও এ বাক্য তিন বারেরও বেশী পড়তেন।(নবী করীম (সঃ) কর্তৃক কেয়াম, রুকু ও সাজদা সমানহারে দীর্ঘায়িত করার হাদীস থেকে একথা প্রমাণিত। হাদীসটি এ অনুচ্ছেদের শেষে বর্ণিত হবে)) একবার রাতের নামাযে তিনি এই তাসবীহটি এত বেশী পড়লেন রুকুর সময় প্রায় দাঁড়ানোর সময়ের সমান হয়ে যায়। ঐ রাকআতে তিনি তিনটি লম্বা সূরা পড়েছিলেন। সেগুলো হচ্ছে, সূরা বাকারা, সূরা নিসা ও সূরা আলে-ইমরান। সেই রাকাতে তিনি মাঝে মাঝে দোআ ও গুনাহ মাফ চেয়েছেন। রাতের নামায অধ্যায়ে তা উল্লেখ করা হয়েছে।

২. তিনবার সোবহানা রাব্বিয়াল আযীম ওয়া বিহামদিহী (আবু দাউদ, দারু কুতনী, আহমদ, তাবারানী, বায়হাকী) অর্থ: আমার মহান রবের পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা করছি।

৩. কখনও নিচের বাক্যটি তিনবার পড়তেন: (মুসলিম, আবু আ'ওয়ানা)

سُبُّوحٌ قُدُّوسٌ رَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوحِ .

অর্থ: 'আল্লাহ পবিত্র ও মোবারক, তিনি সকল ফেরেশতা এবং জিবরাঈলের রব।'

৪. তিনি এই দোআটি রুকু ও সাজদায় বেশি বেশি পড়তেন। (তিনি সূরা নাসরের আদেশ অনুযায়ী এই দোআ পড়তেন। তাতে আদেশ করা হয়েছে, আপনি আপনার রবের পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা করুন এবং ক্ষমা চান)

سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي -

কর।' অর্থ: 'মহান আল্লাহর পবিত্রতা ও প্রশংসা, হে আল্লাহ! আমাকে মাফ

৫. কখনও পড়তেন: (মুসলিম, আবু আওয়ানাহ, তাহাওয়ী দারু কুতনী)

اللَّهُمَّ لَكَ رَكَعْتٌ وَبِكَ أمَنَتٌ وَلَكَ أَسْلَمْتُ وَعَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ أَنْتَ رَبِّي خَشَعَ لَكَ سَمْعِى وَبَصَرِى وَمُنِّى وَعَظَمِي وَعَصَبِي وَمَا اسْتَقَلَتْ بِهِ قَدَمِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ .

অর্থঃ “হে আল্লাহ! আমি তোমার জন্য রুকু করেছি তোমার প্রতি ঈমান এনেছি, তোমার কাছে আত্মসর্মপণ করেছি, তোমার উপর নির্ভর করেছি, তুমি আমার রব! তোমার জন্য আমার কান, চোখ, মগয, হাড় ও শিরা বিনীত। আমার পা যতবার উপরের দিকে উঠে, তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টির জন্যই উঠে।'

৬. তিনি এই দোয়াও পড়তেন: 

سُبْحَانَ ذِي الْجَبَرُوتِ وَالْمَلَكُوتِ وَالْكِبْرِيَاءِ وَالْعَظْمَةِ .(আবু দাউদ, নাসাঈ-সনদ সহীহ। একই রুকুতে উপরোল্লিখিত সকল দোআ' ও যিকর এক সাথে পড়া জায়েয কিনা তা নিয়ে মতভেদ আছে। ইবনুল কাইয়েম যাদুল মাআদ গ্রন্থে এব্যাপারে দ্বিধাদ্বন্দু প্রকাশ করেছেন। পক্ষান্তরে ইমাম নববী বলিষ্ঠভাবে তাকে জায়েয বলেছেন। তিনি তাঁর 'আযকার' গ্রন্থে লিখেছেন, সম্ভব হলে সকল দোআ একই সাথে পড়া উত্তম। কিন্তু 'নায়লুল আবরার' গ্রন্থে আবুত্ তাইয়্যেব সিদ্দীক হাসান খান বলেছেন: 'রসূলুল্লাহ (সঃ) এক সময় একটা পড়েছেন। সবগুলো একত্রে পড়েননি। বেশ-কম না করে তাঁর হুবহু অনুসরণ করাই উত্তম। একথা বিশুদ্ধ বলে আমার মনে হয়। তবে দীর্ঘ রুকু সহ রসূলুল্লাহর দীর্ঘ নামাযের যে বর্ণনা হাদীসে এসেছে, সে অনুযায়ী কেউ দীর্ঘ নামায পড়লে রুকুতে সকল দোআ না পড়ে তা সম্ভব নয়। যেমনটি বলেছেন ইমাম নববী। তবে একই যিকরের পুনরাবৃত্তি করা সুন্নতের বেশি নিকটবর্তী)

অর্থঃ "সেই আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করছি, যিনি শাস্তি, বাদশাহী, শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বের অধিকারী।" তিনি রাতের নামাজে এ দোআ পড়েছেন।

রুকু দীর্ঘায়িত করা

রসূলুল্লাহ (সঃ) রুকু, রুকু থেকে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে সাজদাহ এবং দুই সাজদার মাঝখানে প্রায় সমপরিমাণ সময় ব্যয় করতেন। (বোখারী, মুসলিম)

রুকুতে কোরআন পড়া নিষেধ

রসূলুল্লাহ (সঃ) রুকু' ও সাজদায় কোরআন পড়তে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, আমাকে রুকু ও সাজদায় কোরআন পড়তে নিষেধ করা হয়েছে। তোমরা রুকুতে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ কর এবং সাজদায় বেশী বেশী করে দোআ কর। সাজদা দোআ' কবুলের উপযুক্ত জায়গা। (মুসলিম, আবু আ'ওয়ানা। এই নিষেধাজ্ঞা ফরয ও নফল সকল নামাযের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ইবনু আসাকির নফল নামাযে জায়েয বলে যে মন্তব্য করেছেন, তা দুর্বল)

রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ানো এবং দোআ পড়া

রসূলুল্লাহ (সঃ) রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সময় বলতেন:

سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ -

অর্থ: "আল্লাহ সেই ব্যক্তির কথা কবুল করেন, যে তাঁর প্রশংসা করে।" (বোখারী, মুসলিম) তিনি ভুল নামায আদায়কারীকে বলেছেন, কোন ব্যক্তির নামায সে পর্যন্ত শুদ্ধ হয় না, যে পর্যন্ত না সে তাকবীর বলে রুকু থেকে সম্পূর্ণ সোজা হয়ে সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ বলে। (আবু দাউদ। হাকেম এটিকে সহীহ বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী তা সমর্থন করেছেন)

তারপর তিনি দাঁড়িয়ে বলতেন: - رَبَّنَا (وَ) لَكَ الْحَمْدُ

এখানে ওয়াও সহ বা তা ব্যতিত উভয় প্রকার পড়ার বর্ণনা আছে।

- (বোখারী, আহমদ)

অর্থঃ হে আমাদের রব! (এবং) তোমার জন্যই সকল প্রশংসা।

তিনি সকল ধরনের মুসল্লীকে অনুরূপ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'তোমরা আমাকে যেরূপ নামায পড়তে দেখ, সেরূপ নামায পড়।' (বোখারী, আহমদ)

তিনি আরও বলেছেন, ইমামকে অনুসরণের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি যখন سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ বলবে, তখন তোমরা বলবে, اللَّهُمَّ

رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ

আল্লাহ তোমাদের প্রশংসা শুনবেন। আল্লাহ তাঁর নবীর মুখে বলেছেন, যে আল্লাহর প্রশংসা করে, তিনি তা শুনেন। (মুসলিম, আবু আ'ওয়ানা, আহমদ, আবু দাউদ)

তিনি অন্য এক হাদীসে এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেছেন, যার কথা ফেরেশতার দোআর সাথে একাকার হয়ে যাবে আল্লাহ তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেবেন।(বোখারী, মুসলিম। তিরমিযী একে সহীহ হাদীস বলেছেন)

তিনি রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সময় দু'হাত উপরে উঠাতেন। তাকবীরে তাহরীমা অধ্যায়ে তা আলোচনা করা হয়েছে।

১. তারপর তিনি দাঁড়ানো অবস্থায় নীচে বর্ণিত দোআ পড়েছেন:

رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ  (বোখারী, মুসলিম। মোতাওয়ায়াতের রেওয়াতের দ্বারা হাত তোলার কথা

বর্ণিত)

২. কোনো সময় পড়তেন:

رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ  (বোখারী, মুসলিম। মোতাওয়ায়াতের রেওয়াতের দ্বারা হাত তোলার কথা

বর্ণিত)

শব্দ যোগ করে اللهم ৩. কোনো সময় তিনি উপরোক্ত বাক্যগুলোর আগে পড়তেন। (বোখারী, আহমদ। ইবনুল কাইয়েম তাঁর যাদুল মাআ'দ গ্রন্থে 'আল্লাহুম্মা' এবং 'ওয়াও' সম্বলিত বর্ণনাগুলোকে অস্বীকার করেছেন। অথচ এ সকল বর্ণনা বোখারী, মোসনাদে আহমদ এবং নাসাঈতে আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে, দারেমীতে ইবনু উমার থেকে, বায়হাকীতে আবু সাঈদ খুদরী থেকে এবং নাসাঈতে অন্য এক সূত্রে আবু মূসা আশআরী থেকে বর্ণিত আছে।)

এই ভাবে পড়ার জন্য তিনি আদেশ করে বলেছেন।

৪. ইমাম যখন 'সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ' বলবে, তখন তোমরা বলবে, 'আল্লাহুম্মা রব্বানা লাকাল হামদ'। যে ব্যক্তির কথা ফেরেশতার কথার সাথে মিলে যাবে, আল্লাহ তার অতীতের গুনাহ মাফ করে দেবেন। (বোখারী, মুসলিম। তিরমিযী একে সহীহ হাদীস বলেছেন)

৫. তিনি কখনও এর সাথে নিম্নোক্ত দোআ যোগ করতেন:((মুসলিম, আবু আ'ওয়ানা)

مِلْءَ السَّمَاتِ وَمِلْءَ الْأَرْضِ وَمِلْءَ مَا شِئْتَ مِنْ شَيْءٍ بَعْدُ

অর্থ : আসমান ভরে, যমীন ভরে এবং তুমি আরও যা চাও তা ভরে (তোমার প্রশংসা)

৬. কিংবা তিনি যোগ করে পড়তেন: (মুসলিম, আবু আ'ওয়ানা)

مِلْءَ السَّمَوتِ وَمِلْءَ الْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَمِلْءَ مَا شِئْتَ مِنْ شَيْءٍ بَعْدُ

৭. কখনও তিনি এই দোআটি যোগ করতেন: (মুসলিম, আবু আ'ওয়ানা)

أهْلَ الثَّنَاءِ وَالْمَجْدِ لَأَمَانِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلَا مُعْطَى لِمَا مَنَعْتَ وَلَا يَنْفَعُ ذَالْجَدِ مِنْكَ الْجَدُّ .

অর্থ: 'হে প্রশংসা ও মর্যাদার অধিকারী! তুমি যাকে দাও তা রোধকারী কেউ নেই, তুমি যাকে বঞ্চিত কর তাকে কোন দানকারী নেই এবং কোন বিত্তশালী ও ক্ষমতাধর ব্যক্তির শক্তি ও সম্পদ তোমার কাছ থেকে তাকে রক্ষা করে উপকার করতে পারে না। (একমাত্র নেক আমলই তাকে রক্ষা করতে পারে।)

৮. তিনি রাতের নামাযে কখনও বলতেন:

لِرَبِّيَ الْحَمْدُ لِرَبِّيَ الْحَمْدُ -

অর্থ: আমার রবের সকল প্রশংসা, আমার রবের সকল প্রশংসা।

তিনি এটা বারবার পুনরাবৃত্তি করতেন। ফলে তাঁর এই কেয়াম বা সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সময় প্রায় রুকুর সময়ের পরিমাণ হয়ে যেত। আর রুকুর সময়ের পরিমাণ ছিল প্রথম রাকআতের কেয়াম সমান, যে রাকআতে তিনি সূরা বাকারা পড়েছেন। (আবু দাউদ, নাসাঈ-সনদ সহীহ)

৯. কখনও তিনি নীচের দোয়াটি যোগ করতেন:

مل السَّمَوتِ وَمِلْءَ الْأَرْضِ وَمِلْءَ مَا شِئْتَ مِنْ شَيْءٍ بَعْدُ، أَهْلَ الثَّنَاءِ وَالْمَجْدِ اَحَقَّ مَا قَالَ الْعَبْدُ وَكُلُّنَا لَكَ عَبْدُ اللَّهُمَّ لَا مَانِعَ لِمَا اعْطَيْتَ وَلَا مُعْطِيَ لِمَا مَنَعْتَ وَلَا يَنْفَعُ ذَالْجَدِّ مِنْكَ الْجَدُّ .

অর্থ: আসমান ভরে, যমীন ভরে এবং তুমি আরও যা চাও তা ভরে তোমার প্রশংসা। হে প্রশংসা ও মর্যাদার অধিকারী, বান্দার প্রশংসা পাওয়ার সর্বাধিক যোগ্য সত্তা! আমরা সবাই তোমার গোলাম। তুমি যাকে দাও তা রোধকারী কেউ নেই। তুমি যাকে বঞ্চিত কর তাকে কোন দানকারী নেই। কোনবিত্তশালী ও ক্ষমতাধর ব্যক্তির সম্পদ ও শক্তি তোমার কাছ থেকে তাকে রক্ষা করে উপকার করতে পারে না। (মুসলিম, আবু আ'ওয়ানা, আবু দাউদ)

১০. তিনি নিম্নের দোআ পড়েছেন:

رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ حَمْدًا كَثِيرًا طَيِّبًا مُبَارَكًا فِيهِ (مُبَارَكًا عَلَيْهِ كَمَا يُحِبُّ رَبُّنَا وَيَرْضَى)

অর্থ: হে আমাদের রব! তোমার জন্যই প্রশংসা, অত্যধিক পবিত্র ও মোবারক প্রশংসা, (প্রশংসাকারীর জন্যও তা মোবারক হোক, যেভাবে আমাদের রব পসন্দ করেন ও সন্তুষ্ট থাকেন)।

রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পিছনে নামায আদায়কারী এক সাহাবী রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর 'সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ' বলে দাঁড়ানোর পর ঐ দোআটি পড়েন। রসূলুল্লাহ (সঃ) নামায শেষ করে জিজ্ঞেস করলেন, কে ঐ দোআটি পড়েছিল? ব্যক্তিটি বলল, আমি ইয়া রসূলাল্লাহ! রসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন, আমি ৩৩-এরও অধিক ফেরশতাকে প্রতিযোগিতা করতে দেখেছি, কে প্রথমে তা লিখবে! (মালেক, বোখারী, আবু দাউদ)

রুকু থেকে ধীরস্থিরভাবে দাঁড়ানো ওয়াজিব

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, রসূলুল্লাহ (সঃ) প্রায় রুকুর সমপরিমাণ সময় রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। তাঁর দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার কারণে কেউ কেউ ধারণা করতেন তিনি সাজদায় যাবার কথা ভুলে গেছেন।(বোখারী, মুসলিম, আহমদ)

তিনি ভুল নামায আদায়কারীকে প্রশান্তি সহকারে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়ে বলেছেন: তারপর মাথা তুলে সোজা হয়ে দাঁড়াও। অন্য এক রিওয়ায়াতে এসেছে, যখন তুমি মাথা তুলবে, তখন সোজা হয়ে দাঁড়াবে যেন হাড় তার জোড়ার সাথে ঠিকমত খাপ খায়। (বোখারী, মুসলিম, দারেমী, হাকেম, শাফেঈ, আহমদ। এই হাদীসের উদ্দেশ্য হল, প্রশান্তির সাথে দাঁড়ানো। এই হাদীস দ্বারা হেজাযের কিছু আলেম রুকু থেকে দাঁড়িয়ে বুকের উপর হাত বাঁধার বৈধতা সম্পর্কে যা বলেছেন, তা রিওয়ায়াতের অর্থের মধ্যেই নেই। বরং এজাতীয় প্রমাণ বাতিল। এই কেয়ামে বুকে হাত বাঁধা যে বেদআত তাতে আমার কোন সন্দেহ নেই। এর কোন ভিত্তি থাকলে তা আমাদের পর্যন্ত পৌঁছত। অতীতের নেক লোকেরাও অনুরূপ করেছেন বলে কোন প্রমাণ নেই। হাদীসের কোন ইমামও এ প্রসঙ্গে অনুকূল কিছু বলেননি। শেখ তুয়াইজেরী ইমাম আহমদের বরাত দিয়ে বলেছেন, কেউ ইচ্ছা করলে হাত ছেড়ে দিতে পারে কিংবা বাঁধতে পারে। তিনি এটাকে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদীস বলেননি)

তিনি তাকে বলেন, এরূপ না করলে তোমাদের নামায পরিপূর্ণ হবে না।

রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ সেই ব্যক্তির নামাযের দিকে তাকান না, যে রুকু ও সাজদায় পিঠ সোজা করে না। (আহমদ, আল কবীর-তাবারানী। সনদ সহীহ)

0 comments:

Post a Comment

Thanks for your comments.