(১৪) দ্রুত মসজিদে যাওয়া:
বিশেষ করে ইমাম রুকুতে যাওয়ার পূর্ব সন্দিক্ষণে তাড়াহুড়া করে নামাযে শামিল হওয়ার চেষ্টা করা। এ জাতীয় তাড়াহুড়া নিষিদ্ধ। আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'যখন নামাযের একামত দেয়া হয় তখন দৌড়ে এসোনা, বরং স্বাভাবিকভাবে হেঁটে আস, ধীরে-সুস্থে আস; যতটুকু নামায পাও ততটুকু পড়, আর যতটুকু পাওনি তা পূর্ণ কর।'
(বোখারী, মুসলিম, আহমদ, ও অন্য চারটি বিশুদ্ধ হাদীসগ্রন্থ)
ধীরে-সুস্থে এবং তাড়াহুড়া না করে নামাযে যোগদান কাম্য। তাড়াহুড়া করে নামাযে আসলে জোরে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে হয়। কিন্তু স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস সহকারে এবং দ্রুততা পরিহার করে নামাযে শরীক হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। এ মর্মে আরেকটি হাদীস বর্ণিত আছে। আবু বাকরাহ সাকাফী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি যখন মসজিদে পৌঁছলেন তখন নবী করীম (সঃ) রুকু অবস্থায় ছিলেন। তিনি নামাযের কাতারে শামিল না হয়ে কাতারের বাইরেই রুকুতে শামিল হলেন। তিনি নবী করীম (সঃ)-কে একথা জানান। নবী করীম (সঃ) বলেন: আল্লাহ তোমার আগ্রহ বৃদ্ধি করুন, তবে আর এরূপ করবে না।' (বোখারী)
ইবনে হাজার আসকালানী হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, 'আর এরূপ করবে না' এর অর্থ হল, তুমি যেভাবে দ্রুত এসেছ, কাতারবিহীন রুকুতে শামিল হয়েছ, তারপর কাতারে শরীক হয়েছ' আর এরূপ করবে না।
আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: তোমরা যখন একামত শুনবে, তখন নামাযের উদ্দেশ্যে রওনা হবে, তবে শান্তভাবে ও সম্মানের সাথে চলবে, তাড়াহুড়া করবে না, যে পরিমাণ নামায পাবে তা পড়বে এবং যে পরিমাণ পাবে না সে পরিমাণ পূর্ণ করবে।' (বোখারী)
এ হাদীসগুলোতে নামাযের একামতের সময় তাড়াহুড়া না করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু অন্য আরেক বর্ণনায় নামাযের কথাও এসেছে, 'তোমরা যখন নামাযের জন্য রওনা হবে'। তাই তাড়াহুড়া নামায এবং একামত দু' অবস্থায়ই নিষিদ্ধ।
ইবনে হাজার আসকালানী (রঃ) বলেছেন: একামতের সময় তাড়াহুড়া করে না আসার একটি হেকমত হল, তাড়াহুড়া করে আসলে এবং নামাযে শরীক হলে বিনয় ও খুশু আসবে না। বরং যে আগে আসবে তার মনে সে খুশু বিদ্যমান থাকবে।
অন্য আরেক হাদীসে তাড়াহুড়া না করার আরেকটি হেকমত উল্লেখ আছে। আবু হোরায়রা থেকে বর্ণিত। আগে বর্ণিত হাদীসের শেষে উল্লেখ আছে: তোমাদের কেউ নামাযের ইচ্ছা পোষণ করে রওনা হলে সে নামাযের মধ্যেই বিবেচিত হবে। (মুসলিম) অর্থাৎ তার হুকুম মুসল্লীর হুকুমের মতই। তাই মুসল্লীর যা করণীয় ও বর্জনীয় তারও তা করণীয় ও বর্জনীয়। অর্থাৎ তাড়াহুড়া বর্জনীয়।
ইমাম ইবনে তাইমিয়াকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আল্লাহ কোরআন মজীদে বলেন: 'হে ঈমানদারগণ, যখন শুক্রবারে তোমাদেরকে জুম'আর নামাযের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণ ও জিকরের দিকে দ্রুত ধাবিত হও।' এ আয়াতে وিفَاسْعُ শব্দের অর্থ হচ্ছে দ্রুত ধাবিত হও। এ শব্দের ভিত্তিতে নামাযের জন্য তাড়াহুড়া করার বিধান রয়েছে। ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন: এ আয়াতে শব্দের অর্থ দৌড়-ঝাঁপ করা নয়। বরং উপরোল্লিখিত হাদীসে, ধীরে সুস্থে আসাকেই এর অর্থ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বিভিন্ন ইমামগণ বলেছেন: কোরআনে ও শব্দের অর্থ হল, কাজ করা ও কর্ম তৎপর হওয়া। অর্থাৎ আজান শুনার পর নামাযের প্রস্তুতি নেয়া, দ্রুততা বা তাড়াহুড়া নয়। যেমন, কোরআনের অন্য আয়াতেও এ শব্দটি কাজ-কর্মের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ বলেন:
وَمَنْ أَرَادَ الْآخِرَةَ وَسَعَى لَهَا سَعْيَهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَئِكَ كَانَ سَعْيُهُمْ مَشْكُورًا .
"যে ব্যক্তি আখেরাতের ইচ্ছা করে, সেজন্য আমল করে এবং সে যদি মোমেন হয় তাহলে তাদের আমল ও চেষ্টা-তৎপরতার যথার্থ মূল্যায়ন হবে।"
আল্লাহ আরো বলেন, إِنَّ سَعْيَكُمْ لَشَتَّى নিশ্চয়ই তোমাদের তৎপরতা ভিন্ন ভিন্ন।'
আল্লাহ আরো বলেন:
فِي إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ ) الْأَرْضِ فَسَادًا
'যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং জমীনে ফেতনা-ফাসাদের চেষ্টা করে তাদের শাস্তি হল...।
উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহে ' শব্দের অর্থ হল কাজ ও তৎপরতা, তাড়াহুড়া কিংবা দ্রুততা নয়। এ সকল আয়াত দ্বারা উল্লেখিত প্রশ্নের সমাধান হয়েছে।
এছাড়াও হযরত ওমর বিন খাত্তাব (রাঃ) আয়াতটি নিম্নোক্তভাবে পড়েছেনঃ فَامُضُوا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ অর্থাৎ 'আল্লাহর জিকরের তথা নামাযের উদ্দেশ্যে রওনা কর।' ইবনে তাইমিয়ার জবাব এখানেই শেষ।
ইবনে হাজম তাঁর 'মোহাল্লা' গ্রন্থে আবু জার (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: কেউ নামাযের উদ্দেশ্যে রওনা হলে রাস্তায় থাকা অবস্থায় নামাযের একামত হলে সে যেন তাড়াহুড়া না করে এবং আগের চলার গতি অপেক্ষা যেন দ্রুত না চলে। বরং যতটুকু ইমামের সাথে পাবে ততটুকু পড়বে এবং যতটুকু না পাবে ততটুকু পূর্ণ করে নেবে।
সুফিয়ান বিন যিয়াদ থেকে বর্ণিত। যোবায়ের বিন আওয়াম তাকে রাস্তায় দ্রুত চলতে দেখে বলেন: পরিমিত গতিতে চল, তুমি নামাযের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত, প্রতিটা পদক্ষেপে আল্লাহ তোমার একটি মর্যাদা বাড়াবেন অথবা একটি গুনাহ মাফ করে দেবেন।
0 comments:
Post a Comment
Thanks for your comments.