জুমুআর নামাযের প্রচলিত ৭টি ভুল সংশোধন
(১) গোসল না করা: আবু সাঈদ খুদরী থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন:
غَسْلُ يَوْمِ الْجُمْعَةِ وَاجِبُّ عَلَى كُلِّ مُحْتَلَمٍ
'জুমু'আর দিন প্রত্যেক বালেগের গোসল করা ওয়াজিব।' (মোআত্তাসহ হাদীসের ৬টি বিশুদ্ধ কিতাব)
আবদুল্লাহ বিন-ওমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: "জুমআর দিন আসলে সেদিন তোমরা গোসল করবে।" (হাদীসের একাধিক বিশুদ্ধ কিতাব)
নবী করীম (সঃ) বলেছেন, তোমাদের কেউ জুমআ পড়তে চাইলে সে যেন গোসল করে।' (মুসলিম)
(২) মুসল্লীদের ঘাড় টপকিয়ে সামনের কাতারে শরীক হওয়া:
আবদুল্লাহ বিন বোসর থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) খোতবা প্রদানের সময় এক ব্যক্তি লোকদের ঘাড়ের উপর দিয়ে যাচ্ছিল। তিনি তাকে আদেশ দেন, বস, তুমি লোকদেরকে কষ্ট দিয়েছ।'
ইমাম তিরমিজী ঘাড় টপকিয়ে সামনে অগ্রসর হওয়াকে ওলামায়ে কেরামের মতে মাকরূহ বলে উল্লেখ করেছেন। ইমাম শাফেয়ীর মতে, এরূপ করা হারাম। ইমাম নওয়ী বলেছেন, সহীহ হাদীসের আলোকে তা হারাম। ইমাম আহমদের মতে, তা মাকরূহ।
আল্লামা এ'রাকী কা'ব আল-আহবার থেকে বর্ণনা করেছেন, আমি লোকদের ঘাড় টপকানোর চাইতে জুম'আ ত্যাগ করাকে পছন্দ করি। ইবনুল মোসাইয়ের বলেন: মুসল্লীর ঘাড় টপকানো অপেক্ষা আমার কাছে নিজ ঘরে জুম'আর নামায পড়া উত্তম বলে বিবেচিত। ইমাম ইবনে তাইমিয়ার মতে, তা হারাম।
(৩) জুমু'আর সময় দু'পা পেটের সাথে কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখা কিংবা হাত দিয়ে ধরে রাখা: মোআজ বিন আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। 'রসূলুল্লাহ (সঃ) জুম'আর সময় ইমামের খোতবা দানকালে পেটের সাথে দু'পা বেঁধে কিংবা হাত দিয়ে ধরে রাখতে নিষেধ করেছেন। (আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিজী, হাকেম)
ইবনুল আসীর তাঁর 'আন-নেহায়া' গ্রন্থে লিখেছেন, এভাবে বসলে ঘুম আসে এবং অযূ ছুটে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। এছাড়াও এর ফলে সতর খুলে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
(৪) জুমু'আর দিন ২য় আজানের সময় মসজিদে প্রবেশ করে আজানের জবাব দানের জন্য অপেক্ষা করা এবং খোতবার প্রারম্ভে তাহিয়্যাতুল মসজিদ নামায পড়া: এর ফলে প্রবেশকারী সুন্নতের সওয়াব লাভের জন্য ওয়াজিব লঙ্ঘন করে। আজানের জওয়াব দেয়া সুন্নত, আর খোতবা শুনা ওয়াজিব। আজানের সময় মসজিদে প্রবেশকারীকে খোতবা শোনার স্বার্থে দু'রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ সংক্ষেপে পড়তে হবে। এ মর্মে নবী করীম (সঃ) বলেছেন: 'ইমামের খোতবার সময় কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে সে যেন দু'রাকাত নামায পড়ে এবং তাড়াতাড়ি করে।' (মুসলিম, আহমদ, আবু দাউদ) যারা এ দু'রাকাত নামায পড়েনা, তারা হাদীসের বিরোধীতা করে।
(৫) জুমু'আর ফরজের পর কথা বা কাজ ব্যতীত অবিচ্ছিন্নভাবে সুন্নত পড়া: নিয়ম হল, ফরজের পর কোন দরকারী মথা বলবে বা কোন কাজ করবে। তারপর সুন্নত নামায পড়বে। এ মর্মে নামেরের বোনের ছেলে সায়েব থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি সাহাবী হযরত মোআওইয়ার সাথে মাকসুরায় নামায পড়েছি। ইমামের সালাম ফিরানোর পর একই স্থানে দাঁড়িয়ে আমি (সুন্নত) নামায পড়লাম। তিনি আমার কাছে লোক পাঠান এবং বলেন, তুমি যা করলে আর এরূপ করবে না, তুমি ফরজ পড়ার পর হয় কথা বলবে, আর না হয় বেরিয়ে যাবে। কেননা, রসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন যে, আমরা যেন কথা বলা কিংবা বের হওয়া ছাড়া পূর্ববর্তী নামাযের সাথে পরবর্তী নামায মিলিয়ে না পড়ি।' (মুসলিম)
ইমাম নওয়ী (রঃ) বলেছেন: আমাদের সাথীদের মতে, ফরজ নামাযের স্থান থেকে সরে গিয়ে সুন্নত ও নফল নামায পড়া মোস্তাহাব। উত্তম হল, মসজিদ থেকে ঘরে গিয়ে নফল ও সুন্নত পড়া। তা না হলে, মসজিদের অন্য স্থানে সরে গিয়ে নামায পড়া। এর ফলে সাজদার স্থান বাড়বে এবং ফরজের স্থান থেকে সুন্নত ও নফলের স্থানের মধ্যে পরিবর্তন হবে। কথার মাধ্যমে ও সংযোগহীনতা সৃষ্টি হয় তবে, স্থান পরিবর্তন উত্তম। (শরহে মুসলিম-ইমাম নওয়ী, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ১৭০-১৭১ পৃঃ
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রঃ) বলেছেন, জুম'আসহ অন্যান্য নামাযেও সুন্নত পদ্ধতি হল, ফরজ ও সুন্নতের মধ্যে সংযোগহীনতা সৃষ্টি করা। কেননা, 'নবী করীম (সঃ) দু'ধরনের নামাযকে এক সাথে মিলিয়ে পড়তে নিষেধ করেছেন, যে পর্যন্তনা দু'ধরনের নামাযের মধ্যে কেয়াম কিংবা কথা দ্বারা সংযোগহীনতা সৃষ্টি করা হয়।' অনেক লোক সালাম ফিরানোর পরপরই দু'রাকাত নামায পড়া শুরু করে। এটা ঠিক নয়। কেননা, এতে নবী করীম (সঃ)-এর নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করা হয়। এর লক্ষ্য হল ফরজ ও সুন্নত-নফলের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করা।
(৬) জুমু'আর খোতবার সময় কথা বলা: জুম'আর খোতবার সময় কথা বলা নিষেধ। এ মর্মে নবী করীম (সঃ) বলেছেন:
إِذَا قُلْتُ لِصَاحِبِكَ يَوْمَ الْجُمْعَةِ أَنْصِتُ وَالْإِمَامُ يَخْطُبُ فَقَدْ لَغَوْتَ
'তুমি যদি জুম'আর সময় ইমামের খোতবা চলাকালে তোমার সঙ্গীকে চুপ করতে বল, তাহলে তুমি لغو করলে।' (বোখারী) ৩ শব্দের বিভিন্ন অর্থ আছে। ১. ভুল করা, ২. সওয়াব থেকে বঞ্চিত হওয়া, ৩. জুম'আর ফজীলত বাতিল হওয়া ইত্যাদি।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী বলেছেন, খোতবার সময় কথা বললে তাকে চুপ থাকার নির্দেশ দেয়া সৎ কাজের আদেশের অন্তর্ভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও যদি সওয়াব বাতিল হয়ে যায় তাহলে, অন্য কোন শব্দ উচ্চারণের প্রশ্নই উঠে না। অর্থাৎ খোতবার সময় নিরিবিলি খোতবা শুনতে হবে। তাতে কোন কথা বলে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারবে না। তিনি আরো বলেন, এ হাদীস প্রমাণ করে যে, খোতবার সময় সকল প্রকার কথাবার্তা নিষিদ্ধ। (ফাতহুল বারী-শরহে বোখারী-ইবনে হাজার আসকালানী-২য় খণ্ড, ৪১৫ পৃঃ) এমনকি কংকর সরানোও নিষিদ্ধ।
এ মর্মে ইবনুল মোনজেরী আরেকটি হাদীস উল্লেখ করেছেন। আবু জার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। আমি জুম'আর সময় মসজিদে প্রবেশ করলাম। তখন নবী করীম (সঃ) খোতবা দিচ্ছিলেন। আমি উবাই বিন কা'বের পাশে বসা ছিলাম। নবী করীম (সঃ) সূরা তাওবা পড়লেন। আমি উবাইকে জিজ্ঞেস করলাম, কবে এ সূরাটি নাজিল হয়েছে? তিনি আমার দিকে চেহারার চামড়া কুঁচকে অসন্তোষের দৃষ্টিতে তাকালেন এবং কোন কথা বললেন না। কিছুক্ষণ পর আমি পুনরায় একই প্রশ্ন করলে তিনিও একই ভাবের পুনাবৃত্তি করলেন এবং কোন উত্তর দিলেন না। নবী করীম (সঃ) নামায শেষ করেন। আমি উবাইকে প্রশ্ন করলাম, আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন না কেন এবং চেহারার চামড়া কুঁচকালেন কেন? উবাই জবাব দেন, তুমি তো তোমার নামায বাতিল করেছ। আমি নবী করীম (সঃ)-এর কাছে এ ঘটনাটি খুলে বললে তিনি উত্তরে বলেন: উবাই সত্য বলেছে।' (ইবনু খোজাইমা)
উবাইর সাথে আবদুল্লাহ বিন মাসউদেরও অনুরূপ এক ঘটনা ঘটেছিল। তিনিও নবী করীম (সঃ)-এর কাছে গিয়ে উবাইর বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে নবী করীম (সঃ) বলেন, উবাই ঠিক বলেছে, উবাইকে অনুসরণ কর।' (আবু ইয়ালী, ইবনে হিব্বান)
জুম'আর খোতবা যে কত গুরুত্বপূর্ণ এবং তা শুনার প্রয়োজনীয়তা কতবেশি এটা উপরোক্ত হাদীসগুলো দ্বারা বুঝা যায়।
(৭) খোতবার আগে সুন্নত পড়ার সময় দেয়া: অনেক মসজিদে জুম'আর খোতবার আগে বক্তৃতা হয়। বক্তৃতা শুনার জন্য আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, এখন কেউ নামায পড়বেন না খোতবার আগে সুন্নাত পড়ার সময় দেয়া হবে। এর ফলে, মসজিদে ঢুকে প্রথমে তাহিয়্যাতুল মসজিদ দু' রাকাত সুন্নত নামায পড়ার ব্যাপারে নবী করীম (সঃ)-এর আদেশের বিরোধীতা করা হয়।
নবী (সঃ) বলেছেন: إِذَا دَخَلَ أَحَدَكُمُ الْمَسْجِدَ فَلَا يَجْلِسُ حَتَّى يُصَلَّى رَكْعَتَيْنِ
'তোমাদের কেউ মসজিদে ঢুকলে সে যেন দু' রাকাত নামায পড়ার আগে না বসে।' (বোখারী)
অথচ, বক্তৃতা শোনার জন্য তাকে সে আদেশ পালন করা থেকে বারণ করা হয়। রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আদেশ লংঘনের মধ্যে কি কোন কল্যাণ আছে?
এ সমস্যার মূল কারণ হল, স্থানীয় ভাষায় খোতবা না দেয়া। আরবি খোতবা লোকেরা বুঝে না বলে আগে বাংলায় বক্তৃতা করে এর ক্ষতিপূরণের চেষ্টা করা হয়। এর ফলে তিনবার খোতবা হতে হয়। নবী (সঃ) মাত্র দু'টো খোতবা দিয়েছেন। স্থানীয় ভাষায় খোতবা দেয়া সম্পূর্ণ জায়েয। এ মর্মে ওলামায়ে কেরামের ফতোয়া রয়েছে। দীনের মধ্যে কোন কিছু যোগ-বিয়োগ করা যায় না। ৩
0 comments:
Post a Comment
Thanks for your comments.