(৩৮) মুসল্লীর সামনে দিয়ে অতিক্রম করা: এটা বিরাট গুনাহ। আবুল জোহাইম থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: যদি মুসল্লীর সামনে দিয়ে অতিক্রমকারী জানত যে, তার কি গুনাহ, তাহলে তার জন্য মুসল্লীর সামনে দিয়ে অতিক্রম করা অপেক্ষা ৪০ পর্যন্ত অপেক্ষা করা উত্তম হত।' এ রসূল হাদীসের এক বর্ণনাকারী আবুন নাদ্র বলেন: আমি জানিনা, নবী করীম (সঃ) ৪০ দিন, মাস না বছর বলেছেন। (শরহে মুসলিম, ইমাম.নওয়ী)
আবু সালেহ সাম্মান থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: 'আমি আবু সাঈদ (রাঃ)-কে জুমার দিন লোকদেরকে আড়ালকারী একটি জিনিসের দিকে মুখ করে নামায পড়তে দেখেছি। আবু মুঈত গোত্রের এক যুবক তাঁর সামনে দিয়ে পার হওয়ার ইচ্ছা করল। আবু সাঈদ (রাঃ) তাঁকে নিজ বুক দিয়ে ঠেলা দেন। যুবকটি পারাপারের অন্য কোন পথ না দেখে আবারও তাঁর সামনে দিয়ে পার হওয়ার চেষ্টা করে। এবারও আবু সাঈদ পূর্বাপেক্ষা আরো জোরে ঠেলা দেন। যুবকটি আবু সাঈদের এ আচরণের বিরুদ্ধে শাসক মারওয়ানের কাছে অভিযোগ করে। আবু সাঈদও তাঁর পেছনে পেছনে মারওয়ানের কাছে যান। মারওয়ান জিজ্ঞেস করেনে, হে আবু সাঈদ, আপনার ও আপনার ভাতিজার ঘটনা কি? আবু সাঈদ বলেন: আমি নবী করীম (সঃ)-কে বলতে শুনেছি, তোমাদের কেউ মানুষ থেকে আড়াল সৃষ্টিকারী সুতরার দিকে নামায পড়ার সময় সামনে দিয়ে কেউ অতিক্রম করতে চাইলে তাকে ঠেলে সরিয়ে দেবে। সে সরতে না চাইলে তার সাথে যুদ্ধ-করবে। নিশ্চয়ই সে শয়তান।' (বোখারী)
ইমাম নওয়ী বলেছেন, ১ম হাদীসে নামাযের সামনে দিয়ে পার হওয়াকে হারাম করা হয়েছে। তাতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও হুমকীর উল্লেখ আছে।
আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী বলেছেন, হাদীসের মর্মানুযায়ী এটা কবীরা গুনাহর শামিল। তিনি আরো বলেন, প্রকাশ্য হাদীসের দাবী হল, মুসল্লীর সামনে দিয়ে মোটেও অতিক্রম করা যাবে না। জায়গা না থাকলে অপেক্ষা করতে হবে যে পর্যন্ত না মুসল্লী নামায থেকে অবসর হয়। আবু সাঈদের কাহিনী একথার সহায়ক।
আল্লামা শাওকানী বলেছেন, নামাযীর সামনে দিয়ে পার হওয়া জাহান্নাম ওয়াজিবকারী কবীরা গুনাহ। তাতে ফরজ ও নফল-সুন্নত সমান।
সৌদী আরবের প্রয়াত মুফতী জেনারেল শেখ আবদুল আযীয বিন বাজ (রঃ) বলেছেন: প্রকাশ্য হাদীসের দাবী হল, মুসল্লীর সামনে দিয়ে যাওয়া হারাম এবং মুসল্লীর তা প্রতিরোধ করার অধিকার আছে। তবে কেবলমাত্র একটি সময়ে মুসল্লীর সামনে দিয়ে যেতে পারবে যখন পার হতে বাধ্য হয় এবং এছাড়া আর কোন পথ না থাকে। তবে মুসল্লী থেকে দূর দিয়ে অতিক্রম করলে এবং তার সামনে সুতরাহ না থাকলেও গুনাহ হবে না। সেটা সুতরার সামনে দিয়ে অতিক্রম করারই সমান।
দূরত্বের পরিমাণ: এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, মুসল্লী থেকে কতটুকু দূর দিয়ে গেলে গুনাহ হবে না? এ প্রশ্নের জবাব হল, বহু সংখ্যক ওলামায়ে কেরামের মতে, সুতরাহ ছাড়া মুসল্লী যে জায়গায় দাঁড়াবে সে জায়গা থেকে তিন হাত পরিমাণ দূর দিয়ে গেলে গুনাহ হবে না। গুনাহ কেবল সে ব্যক্তির হবে যে ঐ তিন হাতের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করবে।
ইবনু হাজমের মতে, যে ব্যক্তি মুসল্লী থেকে তিন হাতের বেশি দূর দিয়ে অতিক্রম করবে, তার গুনাহ হবে না এবং মুসল্লীও অতিক্রমকারীকে বাধা দেবে না। কিন্তু যদি তিন হাত বা এর কম পরিমাণ দূর দিয়ে যায় তাহলে অতিক্রমকারী ব্যক্তি গুনাহগার হবে। সুতরাহ হলে, এর পেছন দিয়েই অতিক্রম করতে পারবে। তখন আর গুনাহ হবে না।
ইমামের সামনে সুতরাহ থাকলে মুসল্লীর সামনে দিয়ে অতিক্রম করলে কোন অসুবিধে নেই। ইমাম বোখারী 'ইমামের সুতরাহ পেছনের মোক্তাদীর সুতরাহ' এ শিরানামে আবদুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: 'আমি একটি গর্ধভীর উপর আরোহণ করা অবস্থায় মিনায় পৌঁছি। তখন আমি বালেগ ছিলাম। নবী করীম (সঃ) সেখানে সামনে দেয়ালবিহীন এক স্থানে লোকদেরকে নিয়ে নামায পড়ছিলেন। আমি একটি কাতারের সামনে দিয়ে অতিক্রম করি, তারপর সওয়ারী থেকে অবতরণ করি এবং গর্ধভীটিকে ঘাস খাওয়ার জন্য ছেড়ে দেই। তারপর জাম'আতে ঐ নামাযে শামিল হই। কেউ আমার প্রতি আপত্তি জানান নি।'
ইমাম ইবনে তাইমিয়া, ইবনে আব্বাসের এ হাদীসের ভিত্তিতে বলেছেন, ইমাম ও মোক্তাদী কারো সামনে ৩ হাতের মধ্য দিয়ে পার হওয়া ঠিক নয়।
সৌদী সুপ্রিম ওলামা কাউন্সিলের সদস্য শেখ আবদুল্লাহ জিবরীন বলেছেন, নামাযীর সামনে দিয়ে অতিক্রম না করার কারণ উভয়ক্ষেত্রেই বিদ্যমান। আর তা হল, নামায থেকে মুসল্লীর মন অন্য দিকে সরিয়ে নেয়া। পক্ষান্তরে, ইবনে আব্বাসের হাদীস দ্বারা একথা বুঝা জরুরী নয় যে, তিনি নামাযের কাতারের একেবারে সামনে দিয়ে অতিক্রম করেছেন। হাতে পারে, তিনি তিন হাত দূর দিয়ে অতিক্রম করে বলেছেন, আমি কাতারের সামনে দিয়েই অতিক্রম করেছি।
অনেকে দূর দিয়ে পর্যন্তও নামাযীর সামনে দিয়ে অতিক্রম করতে ইতস্ততঃ করে আসলে এ ইত্যস্ততার কোন দরকার নেই।
0 comments:
Post a Comment
Thanks for your comments.