Monday, August 10, 2026

সাজদায় ৭টি অঙ্গকে ঠিকমত না রাখা

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

() সাজদায় ৭টি অঙ্গকে ঠিকমত না রাখা: 

আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম (সঃ)-কে সাত অঙ্গে সাজদা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সময় যেন কেউ চুল কিংবা কাপড় ধরে না রাখে। সে সাত অঙ্গ হল কপাল, দু'হাত, দু'পা দু' হাঁটু।

ইবনে আব্বাস থেকে আরেক বর্ণনায় এসেছে। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন: 'আমাকে ৭টি অঙ্গে সাজদার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি হাত দিয়ে নিজ নাক, দু'হাত, দু'হাটু পায়ের আঙ্গুলের প্রতি ইশারা করে দেখান এবং বলেন, সময় যেন আমরা কাপড় চুল টানাটানি না করি।' (বোখারী)

হাদীস থেকে জানা গেল () যারা সাজদায় দু'পা জমীন থেকে সামান্য উপরে তোলে, কিংবা এক পা অন্য পায়ের উপর রাখে তাদের সাত অঙ্গে সাজদা হয় না। সাজদার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পা উপরে রাখলে তার নামায হবে না। কেননা, সে নামাযের একটি অঙ্গ ত্যাগ করেছে। পা একবার মাটিতে রেখে পরে তুললে নামায হবে, তবে এরূপ করা ঠিক নয়। (ফতোয়া সাদীয়াহ, ১৪৭ পৃঃ) () কারো কারো সাজদার সময় নাক মাটিতে লাগে, কপাল লাগে না। তাদের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য।

দুই সাজদার মাঝখানে আঙ্গুল না নাড়ানো এবং ইমাম সাজদায় থাকলে মাথা তোলা পর্যন্ত এবং বসা থাকলে দাঁড়ানো পর্যন্ত অপেক্ষা করা ভুল

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

() দুই সাজদার মাঝখানে আঙ্গুল না নাড়ানো: এটা ঠিক নয়। 'নবী করীম (সঃ) দুই সাজদার মাঝে শাহাদত আঙ্গুলী দিয়ে ইশারা করতেন বলে মোসনাদে আহমদের ৪র্থ খণ্ডের ২১০ পৃষ্ঠায় একটি হাদীস বর্ণিত আছে।' এটা হল দু' সাজদার মাঝের জলসা। (হেদায়াতুন নাবী, ৭৫ পৃঃ)

() ইমাম সাজদায় থাকলে মাথা তোলা পর্যন্ত এবং বসা থাকলে দাঁড়ানো পর্যন্ত অপেক্ষা করা ভুল: বিশুদ্ধ পদ্ধতি হল, ইমাম রুকু, সাজদা, দাঁড়ান কিংবা বসা যে অবস্থায়ই থাক না কেন সর্বাবস্থায় অনতিবিলম্বে নামাযে শামিল হওয়া এবং দেরী না করা। কাতাদাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: 'তোমরা নামাযের জন্য আসলে প্রশান্তিসহকারে আসবে, রাসুল (সঃ) বলেছেন: 'তোমরা নামাযের জন্য আসলে প্রশান্তিসহকারে আসবে, যতটুকু নামায পাবে ততটুকু পড়বে এবং যতটুকু পাওয়া যায়নি ততটুকু পরিপূর্ণ করবে।' (বোখারী)

ইবনে হাজার আসকালানী (রঃ) ফতহুল বারী গ্রন্থে লিখেছেন, উপরোক্ত

হাদীসের মাধ্যমে যা বুঝা যায়, তাহলো ইমামকে যে অবস্থাতেই পাওয়া যায় দেরী না করে সাথে সাথে সে অবস্থায় নামাযে শরীক হওয়া দরকার। আবদুল আযীয বিন রাফী এক আনসারী সাহাবী থেকে বর্ণনা করেছেন। নবী করীম (সঃ) বলেছেন: 'যে ব্যক্তি আমাকে রুকু, সাজদা বা দাঁড়ানো অবস্থায় পাবে সে যেন সে অবস্থায়ই আমার সাথে নামাযে শরীক হয়।' (ইবনু আবি শায়বা)

কেয়াম, রুকু, সাজদা ও বসার সময় পিঠ সোজা না করা

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

() কেয়াম বসার সময় পিঠ সোজা না করা

দেখা যায় কোন সময় ডানে বা বামে কিংবা বাঁকা হয়ে দাঁড়ায় বা বসে। এটা নিষিদ্ধ। পিঠ সোজা রাখতে হবে। নবী করীম (সঃ) বলেছেন: 'আল্লাহ সে বান্দাহর নামাযের দিকে তাকান না, যে রুকু সাজদায় পিঠ সোজা করে না।' (আহমদ, তাবরানী)

নবী করীম (সঃ) ভুল নামায আদায়কারীকে বলেছিলেন: 'তারপর তুমি মাথা তুলে এমনভাবে সোজা হয়ে দাঁড়াবে যেন হাড় তার নিজ নিজ অবস্থানে থাকে।' অন্য এক বর্ণনায় এসেছে 'তুমি মাথা তুলে এমনভাবে দাঁড়াবে যেন হাড়গলো নিজ নিজ জোড়ার দিকে ফিরে যায়। কেউ এরূপ না করলে তার নামায পরিপূর্ণ হবে না।'

() রুকু সাজদায় পিঠ সোজা না করা: 

একবার নবী করীম (সঃ) নামায পড়ার সময় আড় চোখে এক ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে দেখেন যে, সে রুকু সাজদায় নিজ পিঠ সোজা করে নি। নামায শেষ করে তিনি বলেন: 'হে মুসলমান সম্প্রদায়! যে ব্যক্তি রুকু সাজদায় পিঠ সোজা না করবে তার নামায হবে না।' (ইবনু আবি শায়বা, আহমদ, ইবনু মাজাহ)

নবী করীম (সঃ) আরো বলেছেন, নামায চুরি সর্বাধিক নিকৃষ্ট কাজ। লোকেরা প্রশ্ন করল, নামায কিভাবে চুরি করে? তিনি বলেন, ঠিকমত রুকু সাজদা না করার নাম নামায- চুরি।' (ইবনু আবি শায়বা, তাবরানী, হাকেম, আল্লামা জাহাবী একে সহীহ বলেছেন) এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পিঠ সোজা করার মানে কি? উত্তর, নবী করীম (সঃ) যখন রুকুতে যেতেন তখন পিঠ সমানভাবে বিছিয়ে দিতেন। (বায়হাকী সহীহ সনদ সহকারে বর্ণনা করেছে।)

রসূলুল্লাহ (সঃ) রুকুতে এমনভাবে পিঠ বিছিয়ে দিতেন যে, পিঠের উপর পানি ঢাললে তা স্থিতিশীল থাকত। (ইবনু মাজাহ, তাবরানী)

তিনি ভুল নামায আদায়কারীকে বলেছিলেন: রুকুতে গেলে দু'হাতের কজি দু'হাঁটুতে রাখবে, তোমার পিঠকে সম্প্রসারিত করবে এবং রুকুর জন্য অর্থাৎ ঝুঁকে যাওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করবে। (আহমদ, আবু দাউদ)

তিনি রুকুতে গেলে মাথাকে পিঠ থেকে উপরের দিকেও রাখতেন না এবং নিচের দিকেও বেশি ঝুঁকাতেন না।

একাধিক আয়াতকে একসাথে মিলিয়ে পড়া: সুন্নত পদ্ধতি

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

() একাধিক আয়াতকে একসাথে মিলিয়ে পড়া

সুন্নত পদ্ধতি হলএক এক আয়াত করে পড়া। উম্মে সালমা (রাঃ)-কে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কেরাত পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করায় তিনি উত্তরে বলেন: রসূলুল্লাহ (সঃ) এক এক আয়াত করে পড়তেন। তিনি এভাবে পড়েছেন: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন। আররাহমানির রাহীম। মালিকি ইয়াওমিদ্দীন। (আবু দাউদ, তিরমিজী, দারু কুতনী, তিনি হাদীসের সনদকে সহীহ নির্ভরযোগ্য হাদীস বলেছেন। হাকেম বলেছেন, বোখারী মুসলিমের শর্তানুযায়ী হওয়ায় এটি সহীহ। আল্লামা জাহাবীও একই মত পোষণ করেন। ইবনু খোজাইমা এবং ইমাম নওয়ীও একে সহীহ বলেছেন।)

আল্লামা ইবনুল কাইয়েম উপরোল্লিখিত হাদীসটি উল্লেখের পর বলেছেন, ইমাম যোহরী বলেছেন: রসূলুল্লাহ (সঃ) এক এক আয়াত করে পড়েছেন। আর পদ্ধতিই উত্তম। যদিও আগের আয়াত পরের আয়াতের সাথে সংশ্লিষ্ট। কোন কোন কারী উদ্দেশ্য লক্ষ্য পূরণের ভিত্তিতে আয়াতের শেষে ওয়াফ্ফের কথা বলেছেন। কিন্তু নবী করীম (সঃ)-এর অনুসরণই সর্বোত্তম হেদায়াত। ইমাম বায়হাকীও এই মত পোষণ করেন।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেন, প্রত্যেক আয়াতের শেষে ওয়াক্ত করা সুন্নত। যদিও পরবর্তী আয়াত আগের আয়াতের সাথে বাক্য গঠনের দিক থেকে কিংবা বিশেষ্য-বিশেষণ হওয়ার প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট।

Sunday, August 9, 2026

মসজিদে নামায পড়ার সময় মুসল্লীর জোরে কেরাত, জিকির ও দো'আ পাঠ করা এবং দেয়াল কিংবা খুঁটিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে নামায পড়া

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

() মসজিদে নামায পড়ার সময় মুসল্লীর জোরে কেরাত, জিকির দো' পাঠ করা

ইমাম শুধু জোরে কেরাত পড়বেন। মুসল্লীরা গোপনে পড়বেন। আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: তোমরা নামাযে আল্লাহর সাথে কানাঘুষা করে থাক। তাই জোরে কোরআন পড়বে না এবং মোমেনদেরকে কষ্ট দেবে না। (বাগওয়ী)

নবী করীম (সঃ) এক রাত্রে ঘর থেকে বের হন। তিনি হযরত আবু বকরকে নিম্নস্বরে এবং হযরত ওমর (রাঃ)-কে জোরে কেরাত পড়তে দেখেন। পরে তারা দু'জন নবী (সঃ)-এর সাথে মিলিত হন। তিনি বলেনঃ হে আবু বকর! আমি আপনার কাছ দিয়ে অতিক্রমের সময় আপনাকে নিম্নস্বরে কেরাত পড়তে দেখলাম। আবু বকর বলেনঃ হে আল্লাহর রসূল, আমি যাঁর সাথে গোপনে কাকুতি-মিনতি করেছি, তাঁকে তো শুনিয়েছি। তিনি ওমরকে বলেন, তুমি জোরে শব্দ করে নামায পড়ছিলে। ওমর বলেন: জোরে পড়ার উদ্দেশ্য হল তন্দ্রা দূর করা এবং শয়তান তাড়ানো। তখন নবী (সঃ) বলেনঃ হে আবু বকর, আপনি একটু শব্দ করে পড়বেন এবং ওমরকে বলেন, আপনি একটু ছোট আওয়াজে পড়বেন।

সৌদী আরবের পরলোকগত মুফতী জেনারেল শেখ আবদুল আযীয বিন বাজকে নামাযের জামা'আতে মুসল্লীদের শব্দ করে কেরাত দো'-জিকরের ব্যাপারে প্রশ্ন করায় তিনি উত্তর দেন, মোক্তাদীর জন্য সুন্নত পদ্ধতি হল গোপনে কেরাত, দো' জিকর করা। কেননা, তা প্রকাশ্যে পড়ার পক্ষে কোন প্রমাণ নেই বরং শব্দ করে পড়লে পাশের মুসল্লীদের অসুবিধে হবে।

(সাপ্তাহিক আদদাওয়া পত্রিকার প্রশ্নোত্তর)


() দেয়াল কিংবা খুঁটিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে নামায পড়া: 

শেখ আবদুল আযীয বিন বাজ বলেছেন, ফরজ নামাযে এরূপ করা জায়েয নেই। কেননা, সক্ষম ব্যক্তির সোজা হয়ে দাঁড়ান ফরজ। তবে নফল নামাযে তা করা জায়েয। কেননা, সক্ষম ব্যক্তির জন্য নফল নামায বসে বসে পড়াও জায়েয। তবে দাঁড়িয়ে হেলান দিয়ে পড়া বসে পড়া অপেক্ষা উত্তম।

নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা: নবী করীম (সঃ) তা করেন নি

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নামাযের আলোকে প্রচলিত ৭৬টি ভুল সংশোধন

() নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা: নবী করীম (সঃ) তা করেন নি। 

নিয়ত হচ্ছে মনের ব্যাপার, মন থেকেই তা করতে হয়। এটা মুখের বিষয় নয়। মুখে উচ্চারণ করলে সেটা আর নিয়ত থাকে না। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রঃ) বলেছেন, মুখে নিয়তের উচ্চারণ দ্বারা দ্বীনের ক্ষতি হয়। কেননা, এটা বেদআত। তাই অযু, গোসল, নামায, রোযা ইত্যাদি এবাদতে নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা যাবে না। কাজ যদি ভাল সওয়াব হত, তাহলে আমাদের পূর্বসূরীরা কাজ নিজেরা করতেন এবং অন্যদেরকে করার জন্য বলতেন। এটাকে যদি আমরা হেদায়েতের অংশ মনে করি, তাহলে নাউজুবিল্লাহ, তারা বিষয়ে হেদায়াত লাভ করেন নি, বরং গোমরাহ হয়েছেন। আর তারা যা করেছেন সেটা যদি হেদায়েত হয়, তাহলে হেদায়েতের পরে আর কি কথা? সেটা গোমরাহী বই কি। মহানবী (সঃ) সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈ তাবয়ে তাবেঈরা মুখে নিয়ত উচ্চারণ করেন নি। শুধু মনেই মনে নিয়ত করেছেন। তাঁরা শুধু হজ্জের এহরামের সময় মুখে নিয়ত উচ্চারণ করেছেন।

মানুষ কেন হাদীসের খেলাপ কাজ করে এবং নামাযসহ বিভিন্ন এবাদতে বহু ভুল-ত্রুটি করে?

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

এখন প্রশ্ন হল, মানুষ কেন হাদীসের খেলাপ কাজ করে এবং নামাযসহ বিভিন্ন এবাদতে বহু ভুল-ত্রুটি করে? উত্তরগুলো হচ্ছে নিম্নরূপ:

১। দুর্বল জাল হাদীস সম্পর্কে পার্থক্য করার ক্ষমতা না থাকার কারণে সহীহ হাদীস অনুযায়ী আমল করা সম্ভব হয়না। ফলে সকল ভুল-ত্রুটি হতে থাকে। ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত না হওয়াটাই বড় কারণ।

২। কিছু কিছু ফকীহ এজতেহাদ করে মাসলা ঠিকই বলেছেন, কিন্তু শরয়ী কোন প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেন নি। অথচ জনগণের কাছে তা গ্রহণযোগ্য হয়ে আছে।

৩। পূর্বসূরীদের মধ্যে পরবর্তীতে কিছু লোকের অন্ধ অনুসরণ এর অন্যতম কারণ।

৪। যাদের ফতোয়া দানের যোগ্যতা নেই তাদের ফতোয়ার ফলে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।

সকল কারণে লোকেরা সুন্নত ত্যাগ করেছে এবং ভুল জিনিস আঁকড়ে ধরে আছে।

মাজহাব কিংবা মাজহাবের ইমামদের কোন দোষ নেই। তারা সহীহ হাদীস গ্রহণের তাকিদ দিয়ে গেছেন এবং সহীহ হাদীস বিরোধী হলে নিজেদের প্রদত্ত মাসলাগুলো ত্যাগ করার আদেশ দিয়েছেন। এখন সকল দায়-দায়িত্ব মোকাল্লেদ বা অনুসারীদের।

আমি বইতে, হাদীসের আলোকে নামাযের ৭৬টি, জুমু'আর নামাযের ৭টি এবং অযু গোসলের ১৮টি প্রচলিত ভুলের সংশোধন উল্লেখ করেছি। বইটি প্রতিটি মুসলমানের জন্য খুবই মূল্যবান। আল্লাহর কাছে আমলের তওফীক কামনা করি। আমিন!

. এন. এম. সিরাজুল ইসলাম বাংলা বিভাগ, রেডিও জেদ্দা

সৌদী আরব। 

১৪//১৪২২ হিঃ

//২০০১ খ্রীঃ

মুখবন্ধ

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ 
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

মুখবন্ধ

রসূলুল্লাহ (সাঃ) কিভাবে নামায পড়েছেন বিষয়টি জানার পর তাঁর নামায এবং সহীহ হাদীসের আলোকে নামায এবং অযু-গোসলের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলোও আলোচনার দাবী রাখে। আমরা সচরাচর নামাযে অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখি যা জানলে তার পুনরাবৃত্তি হবে না। নামায সহীহ-শুদ্ধ হোক এটা সবারই কামনা। কেননা, বিশুদ্ধ নামাযই আল্লাহর দরবারে কবুল হয়, ত্রুটিপূর্ণ নামায কবুল হয় 'না। অনুরূপভাবে, অজু-গোসলের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলোও আলোচনা হওয়া দরকার।

ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো হাদীসের পরিপন্থী। যদি বিরাট সংখ্যক লোকও সে ভুল করে তাহলেও সেটা ভুল। আর একজনও যদি হক বা সত্যকে অবলম্বন করে তাহলে তা- সত্য এবং ব্যাপারে কোন সমস্যা নেই। আল্লামা ইবনুল কাইয়েম (রঃ) বলেন: হক বা সত্যের অনুসারী একজন আলেমও সংখ্যাগরিষ্ঠতা, দলীল-প্রমাণ এজমা' দাবী করতে পারেন, যদিও গোটা দুনিয়া তার বিরোধীতা করে।(মিম্ মোখালিফাত-আততাহারাহ ওয়াসসালাহ। আবদুল আযীয বিন মোহাম্মদ সাদহান, দারু তাইয়েবাহ প্রকাশনী। রিয়াদ, ১৪১২ হিঃ)

নাঈম বিন হাম্মাদ বলেন: কোন দল বা সমষ্টি নষ্ট হয়ে গেলে তুমি তাদের খারাপ হওয়ার পূর্বের অবস্থা অনুসরণ করবে যদিও তুমি একা। তখন তুমিই মূলতঃ সমষ্টি। (মিম্ মোখালিফাত-আততাহারাহ ওয়াসসালাহ। আবদুল আযীয বিন মোহাম্মদ সাদহান, দারু তাইয়েবাহ প্রকাশনী। রিয়াদ, ১৪১২ হিঃ)

ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের সময় তিনি ছাড়া অন্য সবাই যেমন, খলীফা, উজির-নাজির, আলেম-ওলামা, মুফতীরা 'কোরআন সৃষ্ট' মতবাদের অনুসারী হয়ে যান। একমাত্র ইমাম আহমদ এর বিরোধীতা করেন। সমষ্টির যুক্তি ছিল, আমরা সবাই নাহক এবং তিনি একাই হকের উপর আছেন, এটা হতে পারে না। তাই খলীফা তাঁকে গ্রেফতার করে বেত্রাঘাত পর্যন্ত করেন। তা সত্ত্বেও তিনি সত্য থেকে বিচ্যুত হননি। সত্যের জন্য অনেকে অকাতরে জীবন বিলিয়ে গেছেন। ভুল ত্রুটি-বিচ্যুতিকারীদের সংখ্যাই বিরাট। এক্ষেত্রে ভুল সংশোধনকারী হয়ত সংখ্যালঘু। তাই আল্লামা শাতেবী (রঃ) বলেছেন: 'অতীতের নেক লোকেরা হকের উপর আমলের জন্য উৎসাহিত করেছেন এবং সংখ্যালঘু হওয়ার ভয় করতে নিষেধ করেছেন।'(আল-'তেসাম, ২য় খণ্ড, ১১১ পৃঃ)

তিনি আরো বলেছেন: সাধারণ লোকের এজমা বা মতৈক্যের কোন মূল্য নেই, এমনকি তারা নেতৃত্ব বা ইমামতির দাবী করলেও না। (এরশাদ আস্-সারী ৩য় খণ্ড, ১০৭ পৃঃ)

রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর অনুসরণ, তাঁর আদেশ-নিষেধ মানা, তিনি যা করেছেন তা করা, সেগুলোর প্রচার প্রসার ঘটানো, তাঁর ভাল পসন্দনীয় কাজগুলোর প্রচলন করা এবং মুসলিম উম্মাহকে সেগুলো অনুসরণের জন্য উৎসাহিত করাই মূলতঃ সুন্নত। সুন্নতের উদাহরণ হল, হযরত নূহ (আঃ)-এর নৌকার মত। যে তাতে আরোহণ করবে সে মুক্তি পাবে।

হাদীস সহীহ হলে তা গ্রহণ করাই ঈমান যুক্তির দাবী। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রঃ) মর্মে ইমাম মালেকের সাথে ইমাম আবু ইউসুফের সা' এবং মোদ সম্পর্কিত প্রসিদ্ধ ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন। ইমাম আবু ইউসুফ মোদ-এর পরিবর্তে ইমাম মালেকের সা'-এর ভিত্তিতে সদকা-ফিতরা দানের যুক্তি গ্রহণ করে নিজ মত পরিবর্তন করেছেন। ইমাম মালেক মদীনার বিভিন্ন লোককে তাদের মাপযন্ত্র- সা' হাজির করার আহ্বান জানালে অনেকে তা হাজির করেন। তারা তাদের দাদা-দাদীর বরাত দিয়ে বলেন: এগুলো দিয়ে রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে ঈদুল ফিতরের সদকাহ দেয়া হত। ইমাম মালেক প্রশ্ন করেন, তারা কি মিথ্যা বলছে? আবু ইউসুফ বলেন, না, তারা মিথ্যা বলছে না। ইমাম মালেক ইরাকী জনগণের জন্য তাদের রতল এবং আরেক রতলের এক তৃতীয়াংশকে এক সা'-এর সমান ধার্য করেন। আবু ইউসুফ ইমাম মালেককে বলেন, হে আবু আবদুল্লাহ! আমার বন্ধু ইমাম আবু হানিফা আমি যা দেখলাম তা দেখলে তিনিও আমার মতো আপনার মতের প্রতি প্রত্যাবর্তন করতেন।

ইমাম বারাবহারী (রঃ) বলেনঃ তোমরা ছোট ছোট নতুন নতুন এবাদত তৈরির ব্যাপারে হুঁশিয়ার থাকবে। ছোট ছোট বেদআতগুলোর পুনরাবৃত্তি বড় বেদআতের জন্ম দেয়। উম্মাহর মধ্যে প্রথম যে বেদআতগুলো ঢুকে সেগুলো ছোট আকৃতির থাকে এবং তাকে হক মনে হয়। ফলে বহু লোক ধোঁকায় পড়ে যায় তাতে অংশ নেয়। তারপর আর তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। এটা ফুলে-ফেঁপে বড় হতে থাকে, দ্বীনের অংশে পরিণত হয় এবং সেরাতুল মোস্তাকীম তথা সরল পথ থেকে বিচ্যুতি ঘটায়।

এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত ঘটনাটি বড় চমকপ্রদ। আমর বিন সালামাহ বলেন: আমরা চাশতের নামাযের আগে আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ)-এর ঘরের দরজায় বসা ছিলাম। তিনি বের হলেন। আমরা তাঁর সাথে মসজিদে চললাম। আবু মূসা আশআরী (রাঃ) আসলেন। তিনি প্রশ্ন করেন, আবু আবদুর রহমান কি আপনাদের কাছে এসেছে? আমরা বললাম, 'না' তিনিও আমাদের কাছে বসলেন। এমন সময় আবু আবদুর রহমান অর্থাৎ আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) আসলেন। আমরা সকলে দাঁড়িয়ে গেলাম। হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) বলেন: হে আবু আবদুর রহমান! আমি প্রথমে মসজিদে ঢুকে কিছু অপসন্দনীয় কাজ দেখি। তবে আমি যা দেখেছি তা ভাল হবে বলে মনে করি। তিনি জিজ্ঞেস করেন, সেটা কি? তিনি জবাব দেন, আপনিও দেখতে পারবেন। আমি মসজিদে একদল লোককে গ্রুপে গ্রুপে বসে নামাযের জন্য অপেক্ষা করতে দেখলাম। প্রত্যেক গ্রুপের একজন লোকের হাতে ছিল কঙ্কর। তিনি দলের লোকদেরকে ১শ' বার তাকবীর, ১শ' বার লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং ১শ' বার তাসবীহ পড়তে (সোবহানাল্লাহ) বলেন। লোকেরা তাই করল। অর্থাৎ সে কঙ্কর দিয়ে তার হিসেব গুনতো। ইবনে মাসউদ জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি বলেছেন? তিনি বলেন, আমি আপনার মতের অপেক্ষায় কিছু বলিনি। ইবনে মাসউদ বলেন, আপনি তাদেরকে কেন তাদের গুনাহগুলোর গুনতির কথা বললেন না? আমি তাদের নেকসমূহ নষ্ট না হবার গ্যারান্টি দিচ্ছি। এরপর আমরা সবাই তাঁর সাথে একটি গ্রুপের কাছে যাই। তিনি সেখানে দাঁড়ান এবং জিজ্ঞেস করেন, আমি তোমাদের একি কাজ দেখছি? তারা বলল: হে আবু আবদুর রহমান, আমরা কঙ্কর দ্বারা তাকবীর, তাহলীল তাসবীহর হিসেব রাখি। তিনি বলেন: তোমরা তোমাদের গুনাহর হিসেব রাখ। আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি, তোমাদের নেক সামান্যও নষ্ট হবে না। হে উম্মতে মোহাম্মদ, তোমাদের জন্য আফসোস। তোমাদের ধ্বংস এত তাড়াতাড়ি আসন্ন! নবীর সকল সাহাবায়ে কেরাম বিদ্যমান আছেন, রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর এই তরতাজা শুকনো কাপড় এবং তাঁর তৈজসপত্রগুলো এখনও পর্যন্ত অক্ষত। আমার প্রাণ যার হাতে সে সত্ত্বার শপথ করে বলছি, তোমরা হয় উম্মতে মোহাম্মদীর সর্বাধিক হেদায়েত প্রাপ্ত কিংবা সর্বাধিক গোমরাহ লোক হবে। তাঁরা বলেন, হে আবু আবদুর রহমান! আল্লাহর কসম, আমাদের নেক উদ্দেশ্যই এর পেছনে কাজ করেছে। তিনি উত্তর দেন, বহু ভাল কাজের আকাঙ্খী লোক ঠিক পথে নেই। রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, একদল লোক কোরআন পড়বে কিন্তু তা তাদের গলার ভেতর প্রবেশ করবে না। আল্লাহর কসম, আমি জানিনা যে, তোমরাই সে দলের সংখ্যাধিক্য লোক কিনা?

আমর বিন সালামাহ বলেন: আমরা নাহরাওয়ান যুদ্ধে তাদের অধিকাংশকে খারেজী সম্প্রদায়ের সাথে আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে দেখেছি।

দ্বীনের মধ্যে নতুন আবিষ্কৃত এবাদত শেষ পর্যন্ত চরম গোমরাহীর দিকে ঠেলে দেয়। তাই যে কোন বেদআত থেকে মোমেনদেরকে দূরে থাকতে হবে।